যে কারণে এআইয়েরও বিশ্বাসযোগ্য সাংবাদিকতা দরকার

আস্থা বজায় রাখতে এআই–ব্যবস্থা সাংবাদিকের যাচাই করা প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করেছবি: রয়টার্স

১৯৬৭ সালে ‘ট্রুথ অ্যান্ড পলিটিকস’ প্রবন্ধে রাজনৈতিক দার্শনিক হান্না আরেন্ট লিখেছিলেন, ‘তথ্যভিত্তিক তথ্যের নিশ্চয়তা না থাকলে এবং তথ্যগুলো নিজেরাই বিতর্কিত হয়ে উঠলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি প্রহসন হয়ে দাঁড়ায়।’ গণতান্ত্রিক সমাজে বিশ্বাসযোগ্য সাংবাদিকতার গুরুত্ব এখানেই। কিন্তু মানুষ সংবাদ জানার জন্য ক্রমেই এআই চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করছে। এতে অল্প অর্থে পরিচালিত সংবাদমাধ্যমগুলো পাঠক ও আয় হারাচ্ছে।

ফলে ভালো সাংবাদিকতার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ছে। অথচ এআইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যমই অপরিহার্য। এআই প্রতিষ্ঠানগুলো এই নির্ভরতা স্বীকার না করলে সাংবাদিকতা খাতের সংকট আরও গভীর হবে। একই সময়ে গণতন্ত্রও যখন নানা দেশে দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন এর পরিণতি আরও গুরুতর হতে পারে।

জুনে ওয়ার্ল্ড নিউজ মিডিয়া কংগ্রেসে ইউনেসকোর যোগাযোগ ও তথ্যবিষয়ক সহকারী মহাপরিচালক মারিয়া গ্যাব্রিয়েল যথার্থই বলেছেন, ‘সাংবাদিকতার জন্য সহায়তা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি গণতন্ত্রের অবকাঠামো।’ একই সময়ে ইউনেসকো ন্যায্যভাবে সংবাদমাধ্যমকে অর্থ দেওয়ার বিষয়ে একটি খসড়া নির্দেশনা প্রকাশ করেছে। এর চূড়ান্ত সংস্করণ এ বছরের শেষ দিকে প্রকাশিত হওয়ার কথা।

আরও পড়ুন

এআইয়ের প্রতিটি উত্তরের পেছনে এমন জ্ঞান রয়েছে, যা প্রথমে কাউকে খুঁজে বের করতে, যাচাই করতে, প্রতিবেদন তৈরি করতে, সম্পাদনা করতে ও প্রকাশ করতে হয়েছে। তাই এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব রয়েছে সেই সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করার, যাদের তৈরি তথ্য দিয়ে তাদের মডেল প্রশিক্ষিত হয়।

জনপ্রিয় এআই চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি, ক্লড ও জেমিনাইয়ের ৬৮ কোটির বেশি উদ্ধৃতি বিশ্লেষণ করে এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২৭ শতাংশ উদ্ধৃতি এসেছে সাংবাদিকতা থেকে। সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে প্রশ্নের ক্ষেত্রে এই হার ৪৯ শতাংশ। যাচাই করা বাইরের তথ্যের উৎস দুর্বল হলে এআই শুধু ভুল বা পুরোনো তথ্য দেবে না, তার মানও নেমে যাবে। এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মানুষের আস্থা অর্জনের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বজুড়ে মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ চ্যাটবটের উত্তরে আস্থা রাখে। ২০২৫ সালে ইউরোপিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন ও বিবিসির এক গবেষণায় শীর্ষস্থানীয় এআই সহকারীদের ৩ হাজারের বেশি উত্তর পরীক্ষা করা হয়। এতে ৪৫ শতাংশ উত্তরে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা এবং ৩১ শতাংশ উত্তরে সূত্র ব্যবহারের গুরুতর ত্রুটি পাওয়া যায়।

এআই ও সাংবাদিকতা—দুই খাতের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংবাদমাধ্যম, নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর। ইউনেসকো সেই ভবিষ্যতের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর নির্দেশনা বিশ্বজুড়ে সমর্থন পাওয়া উচিত।

ইউনেসকোর প্রস্তাব এই সমস্যার সমাধানে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার একটি কাঠামো তৈরি করতে চায়। একই সঙ্গে এতে মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। সাংবাদিকতাকে এখানে শুধু একটি শিল্প হিসেবে নয়, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পদ হিসেবে দেখা হয়েছে। কারণ, টেকসই সাংবাদিকতা ছাড়া নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রবাহও টেকসই হবে না।

এ প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি বিতর্ককে শুধু কপিরাইটের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের উৎস টিকিয়ে রাখার বৃহত্তর জনস্বার্থকে সামনে এনেছে। আমি যে ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব নিউজ পাবলিশার্স বা ওয়ান-ইফরার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সেই সংগঠন এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করে। দুই দশক ধরে ইন্টারনেটের একটি কার্যকর সমঝোতা ছিল—সংবাদমাধ্যম সাংবাদিকতায় বিনিয়োগ করবে, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম পাঠককে সেই সংবাদ খুঁজে পেতে সাহায্য করবে। এআই চ্যাটবট সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ায় সেই সমঝোতা ভেঙে গেছে। এখন পাঠককে আর সেই সংবাদমাধ্যমের কাছে যেতে হচ্ছে না, যারা উত্তরটি খুঁজে বের করতে বিনিয়োগ করেছে।

আরও পড়ুন

তাই প্রয়োজন নতুন মূল্য বিনিময়ের ব্যবস্থা। জুনে ওয়ার্ল্ড নিউজ মিডিয়া কংগ্রেসে নিউইয়র্ক টাইমস–এর প্রকাশক এজি সুলজবার্গার বলেছিলেন, এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তাদের প্রযুক্তিকে চালিত করা তথ্য, ধারণা ও সৃজনশীলতার ‘সুস্থ ও টেকসই প্রবাহ’ নিশ্চিত করতে সহায়তা করা। এটি দান নয়; এআইয়ের নিজেদের স্বার্থেই প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ। কারণ, ভুল তথ্যের একটি বড় সংকটই দেখিয়ে দিতে পারে, নষ্ট হয়ে যাওয়া আস্থা পুনর্গঠন কত কঠিন। অ্যালগরিদম স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের কঠোর তথ্য যাচাই ও পেশাদার সম্পাদকীয় বিচারবোধের বিকল্প নয়।

এআই ও সাংবাদিকতা—দুই খাতের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংবাদমাধ্যম, নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর। ইউনেসকো সেই ভবিষ্যতের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর নির্দেশনা বিশ্বজুড়ে সমর্থন পাওয়া উচিত। এআইয়ের সাফল্য শুধু অ্যালগরিদমের উৎকর্ষে নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে বিশ্বাসযোগ্য, বৈচিত্র্যময় ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই সংবাদমাধ্যম টিকে থাকার ওপরও।

  • স্টিগ অরস্কভ ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব নিউজ পাবলিশার্স বা ওয়ান-ইফরার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত।