যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের পুরোনো নিরাপত্তাকাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এই অঞ্চলের দেশগুলো বিকল্প পথ খুঁজছে। কিন্তু আলোচনায় বারবার উঠে আসছে সামরিক কৌশল, কূটনৈতিক সমীকরণ বা বাইরের শক্তিগুলোর ভূমিকা। এতে অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি—অর্থনীতি।
সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার কথা বলছে। ওমান ও ইরান বাণিজ্য বাড়াতে চাইছে। আবার তুরস্ক থেকে সৌদি আরব পর্যন্ত হিজাজ রেলপথ চালুর উদ্যোগও আছে। এগুলো দেখায়, আগে যেসব অর্থনৈতিক সহযোগিতা অসম্ভব মনে হতো, এখন তা সম্ভব হতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করবে না। বরং এমন অর্থনৈতিক সম্পর্ক দরকার, যাতে সংঘাত করলে সবারই বড় ক্ষতি হয়।
২০১৫ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ এবং স্ট্যানফোর্ডের সমাজবিজ্ঞানী গ্যারি কক্স ও ব্যারি ওয়েইনগাস্ট ‘সহিংসতার ফাঁদ’ নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁদের মতে, যখন বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও উৎপাদন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন সহিংসতার খরচ বেড়ে যায়। তখন যুদ্ধের বদলে সংযমই যুক্তিসংগত হয়ে ওঠে। কারণ, সবাই কিছু না কিছু হারানোর ঝুঁকিতে থাকে। যদি অর্থনৈতিকভাবে একীকরণ বাড়ে, তাহলে এই হিসাব বদলাবে। ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক এমন বাধ্যবাধকতা তৈরি করে, যেখানে অস্থিরতা সৃষ্টি করা ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। তখন নিরাপত্তা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া লাগে না, বরং অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকেই তৈরি হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি বড় প্রশ্নের উত্তর দেয়—এত ধনী অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে কেন এখানে স্থায়ী শান্তি নেই। ইরান ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই অঞ্চলকে ভাগ করে রেখেছে। অথচ ভৌগোলিক অবস্থান, জ্বালানি সম্পদ ও বাজারের দিক থেকে তারা স্বাভাবিকভাবেই একে অপরের পরিপূরক।
দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে বাইরের নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায়। এতে নিরাপত্তা একধরনের পণ্যে পরিণত হয়েছে। তেল ও পুঁজির বিনিময়ে সামরিক সুরক্ষা কেনা হয়েছে। দেশগুলো সামরিক খাতে বেশি বিনিয়োগ করেছে, কিন্তু আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতিতে ততটা করেনি। এখন এই মডেলের দুর্বলতা স্পষ্ট। উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকীকৃত অঞ্চলের একটি। তবু এটি খুব ঝুঁকিপূর্ণ। ড্রোন যুদ্ধ পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে।
অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, পুরোনো নিরাপত্তাকাঠামো ভেঙে পড়ছে। কিন্তু বিকল্প হিসেবে যে প্রস্তাবগুলো আসছে—আরও অস্ত্র কেনা, নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খোঁজা বা নিজস্ব সামরিক শক্তি বাড়ানো—এসব টেকসই সমাধান নয়। বেশি অস্ত্র কিনলে অসম আক্রমণের ঝুঁকি কমে না। নিজস্ব শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়াও সহজ নয়। ছোট দেশগুলোর জনসংখ্যা কম। বড় দেশগুলোর ক্ষেত্রে, যেমন সৌদি আরব, শক্তিশালী সেনাবাহিনী রাজনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
তাই শুধু অস্ত্র নয়, সংঘাতকে টিকিয়ে রাখে যে অর্থনৈতিক কাঠামো, সেটি বদলাতে হবে। অনেকেই বলবেন, ইরান ও আরব দেশগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস এত বেশি যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আগে বিশ্বাস না এলেও সহযোগিতা শুরু হতে পারে। বরং সহযোগিতাই ধীরে ধীরে বিশ্বাস তৈরি করে।
ইতিহাসে এর উদাহরণ আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ অর্থনৈতিক সংহতির মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাটিয়ে উঠেছে। শিল্প ও বাজার একীভূত হওয়ায় যুদ্ধ অযৌক্তিক হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও অর্থনৈতিক নির্ভরতা আচরণ বদলে দেয়।
উপসাগরীয় অঞ্চলের ইতিহাসেও এমন উদাহরণ আছে। বহুদিন ধরে ইরান ও আরব উপকূলের বন্দরগুলো বাণিজ্য, অভিবাসন, অর্থায়ন ও পারিবারিক সম্পর্কের মাধ্যমে যুক্ত ছিল। দুবাইয়ের উত্থানও এই সংযোগের ফল। বর্তমানের বৈরিতা তুলনামূলক নতুন।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি তুলনামূলক ছোট এবং বাণিজ্য ও পুঁজিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। তাই কঠোর ভূরাজনৈতিক জোটে আটকে থাকা তাদের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নয়।
যেমন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দেন, তেমনই আরব দেশগুলোকেও তাদের নিরাপত্তার ভিত্তি বৈচিত্র্যময় করতে হবে। শুরুটা ছোটভাবে করা যেতে পারে। যেমন সমুদ্র নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও অবকাঠামো সুরক্ষা নিয়ে সহযোগিতা।
পরবর্তী ধাপে কিছু নির্দিষ্ট খাতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। যেমন লজিস্টিকস, কৃষি, ওষুধশিল্প এবং যৌথ জ্বালানি অবকাঠামো। এতে বড় রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই সংঘাতের খরচ বাড়বে।
সময় গেলে এসব উদ্যোগ একটি স্থায়ী আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে। সেখানে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা একসঙ্গে এগোবে। বড় সংকট হওয়ার আগেই তা সামাল দেওয়া যাবে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বাইরের দেশগুলোও এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করতে পারে।
এটি বাস্তবসম্মত কৌশল। এমন এক সময়ে, যখন শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তখন অর্থনৈতিক সম্পর্কই ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতার ভিত্তি হতে পারে।
আদিল মালিক অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক
জামাল ইব্রাহিম হায়দার লেবানিজ আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ