১৭ বছর আগে তারেক রহমান যখন দেশ ছাড়েন, আর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর যখন দেশে ফেরেন, এই দুই সময়ের মানুষ কি এক? অধিকাংশ মানুষের উত্তর সম্ভবত না। দীর্ঘ সময় তিনি অবস্থান করেছেন ইংল্যান্ডে, যা আধুনিক শিল্পসভ্যতার সূতিকাগার।
যে দেশে শিল্পবিপ্লবের সূচনা, রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথক্করণ এবং ম্যাগনা কার্টার মতো ঐতিহাসিক দলিলের জন্ম। ইতালিতে শুরু হওয়া রেনেসাঁস দ্রুতই সেখানে পৌঁছায়। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ওই দেশ হিসেবে এটি সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ইংল্যান্ডে অবস্থানের ফলে তারেক রহমান কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন এক ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সেখানে যুক্তিনির্ভর বক্তব্য, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং বাক্স্বাধীনতার চর্চা রাজনৈতিক জীবনের অপরিহার্য অংশ।
ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে তারেক রহমানের বিভিন্ন বক্তব্যেও আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট। যেমন ‘আমাকে দেশনায়ক বা রাষ্ট্রনায়ক বলা হবে না’, ‘জন্মদিন উদ্যাপন করা হবে না’, ‘প্রধানমন্ত্রী যেন স্বেচ্ছাচারী হতে না পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে’, ‘ভোটাধিকার নিশ্চিত থাকলে কোনো দল নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন পড়ে না’, ‘একই ব্যক্তি সরকারপ্রধান ও দলীয় প্রধান হবেন না’, ‘কেউ দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না’। এসব বক্তব্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের ধারণা প্রতিফলিত হয়।
আধুনিক রাষ্ট্র বলতে বোঝায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে শাসনব্যবস্থা মানুষের প্রণীত আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, কোনো ব্যক্তি বা ঐশী নির্দেশের ভিত্তিতে নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ ও বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়, ফলে আইনও পরিবর্তনশীল হওয়া প্রয়োজন। পরিবর্তনকে গ্রহণ করার মধ্যেই আধুনিকতার সারবত্তা নিহিত।
গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের কিছু নির্দেশনাও লক্ষণীয়। সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানো, ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিহিংসা পরিহারের আহ্বান তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দেয়। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতিও একই ধারার অংশ।
এক বক্তৃতায় তিনি শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। গান, বাদ্যযন্ত্র, অভিনয় ও খেলাধুলার মতো কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে বলে তিনি মত দেন। এতে নাগরিকের সামগ্রিক বিকাশের ধারণা প্রতিফলিত হয়।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘অবিশ্বাসী ও সংশয়বাদীদের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে’। এই বক্তব্য তাঁকে একটি ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যায়, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও বহুত্ববাদকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশই যথেষ্ট নয়। একটি আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শন, যা দলের নীতিমালা ও নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিফলিত হবে এবং দলের প্রতিটি স্তরে তা ধারণ করা হবে।
সংক্ষেপে আধুনিক রাষ্ট্র বলতে বোঝায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে শাসনব্যবস্থা মানুষের প্রণীত আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, কোনো ব্যক্তি বা ঐশী নির্দেশের ভিত্তিতে নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ ও বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়, ফলে আইনও পরিবর্তনশীল হওয়া প্রয়োজন। পরিবর্তনকে গ্রহণ করার মধ্যেই আধুনিকতার সারবত্তা নিহিত।
ফরাসি বিপ্লবের শিকড় প্রোথিত চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতকে ইউরোপে ঘটে যাওয়া রেনেসাঁসের গভীরে। রেনেসাঁস ছিল ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক, শৈল্পিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ। এটি ধ্রুপদি দর্শন, সাহিত্য ও শিল্পের পুনঃ আবিষ্কার। ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ইউরোপে যে অন্ধকার যুগ বিরাজমান ছিল, তা অতিক্রম করে এই পুনর্জাগরণ শুরু হয়।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের আলোকায়ন আন্দোলন পশ্চিমা বিশ্বে যে বিশ্বদৃষ্টি গড়ে তোলে, তার মূল ভিত্তি ছিল যুক্তি। এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকায়নের এই ধারায় বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তি, ভাববাদিতার পরিবর্তে বাস্তবতা এবং পরকালীনতার বদলে ইহজাগতিক জীবনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এই আলোকায়নই ফরাসি বিপ্লবের ভিত্তি নির্মাণ করে। ফলে আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা বুঝতে হলে আলোকায়নের কিছু মৌলিক উপাদান বিবেচনায় নিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তির প্রয়োগ ও তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, কুসংস্কার ও পূর্বধারণা থেকে মুক্তি, জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে মানবসমাজের উন্নয়ন এবং মানুষের স্বাধীনতা ও সুখ নিশ্চিত করার লক্ষ্য।
বাংলাদেশের সমাজে যখন জ্ঞান, বিজ্ঞান ও দর্শনচর্চায় খরা চলছে, তখন ফরাসি বিপ্লবের পূর্বক্ষণে জনগণের প্রস্তুতির পর্বটি খেয়াল করা জরুরি। ভলতেয়ার, রুশোসহ অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে কালের অগ্রবর্তী চিন্তাবিদ ও লেখকদের একটি দল ব্যাপকভাবে লেখালিখি শুরু করেন।
তাঁদের রচনার বিষয় ছিল রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ, মহাবিশ্ব, মানুষ ও ঈশ্বর-সম্পর্কিত দার্শনিক চিন্তা। এই দর্শনে মানবিক যুক্তির ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও প্রচলিত রাজনৈতিক অনুশীলনের সমালোচনাও ছিল স্পষ্ট। ফ্রান্সের জনগণ তাঁদের এই দর্শন ব্যাপকভাবে পাঠ করে, গ্রহণ করে এবং গভীর পরিবর্তন সাধনের লক্ষ্যে সর্বাত্মক বিপ্লবের প্রস্তুতি নেয়।
ফরাসি বিপ্লবের শিকড় প্রোথিত চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতকে ইউরোপে ঘটে যাওয়া রেনেসাঁসের গভীরে। রেনেসাঁস ছিল ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক, শৈল্পিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ। এটি ধ্রুপদি দর্শন, সাহিত্য ও শিল্পের পুনঃ আবিষ্কার। ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ইউরোপে যে অন্ধকার যুগ বিরাজমান ছিল, তা অতিক্রম করে এই পুনর্জাগরণ শুরু হয়।
এই পুনঃ আবিষ্কারের মূল কথা ছিল মানুষকে কেন্দ্র করে চিন্তা করা। মহাবিশ্বের কেন্দ্রে মানুষ এবং মানুষের সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রেও মানুষ। জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্যের অর্জন মানুষের জন্য, এই পৃথিবীতে মানুষের জীবনমান উন্নত করার জন্য।
ইউরোপের দেশ ইংল্যান্ডেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন সেখানে শিল্পবিপ্লবের সূচনা করে। এই বিপ্লব পরে ইউরোপের অন্যান্য দেশ এবং আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নগরায়ণ ঘটে, যাতায়াত ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয় এবং শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটে।
এরপর নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। রাজার ওপর পার্লামেন্টের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, রাষ্ট্র ও ধর্মকে পৃথক করার ধারণা শক্তিশালী হয়। ১৬৮৯ সালে বিল অব রাইটস পাস হয় এবং ১৬৮৮-৮৯ সালে গ্লোরিয়াস রেভল্যুশন সংঘটিত হয়।
ইংলিশ বিল অব রাইটসের অনুপ্রেরণায় যুক্তরাষ্ট্রেও ১৭৮৯ সালে বিল অব রাইটস পাস হয়। এতে বাক্স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সমাবেশের অধিকার, ধর্মচর্চার স্বাধীনতা, ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া এবং অস্ত্র বহনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি যে ক্ষমতা ফেডারেল সরকারের কাছে অর্পিত নয়, তা রাজ্য ও জনগণের জন্য সংরক্ষিত থাকে।
১৭৮২ সালে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ফরাসি বিপ্লব পূর্ণতা লাভ করে। এর মাধ্যমে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়ে ধর্মের ভূমিকা বিলুপ্ত করা হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় তিনটি মূল আদর্শ—সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ব। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী একটি নতুন যুগের সূচনা হয়। ফরাসি বিপ্লবের অনুপ্রেরণায় বিভিন্ন দেশে মানুষ স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে।
তবে এই বিপ্লবগুলোর সঙ্গে রুশ বিপ্লবের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। অন্যান্য বিপ্লব মানুষের মধ্যে প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিজীবনের স্বাধীনতার পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা যায়নি। রুশ বিপ্লব এই জায়গায় ভিন্নতা সৃষ্টি করে। শ্রমিক ও নারীর মুক্তি ছাড়া প্রকৃত মানবমুক্তি সম্ভব নয়।
এই মুক্তি সাম্যবাদী আদর্শ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্ভব বলে ধরা হয়। কারণ, সাম্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকে শ্রমজীবী মানুষ। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে এর উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
বর্তমান সময়ে আধুনিক সমাজের একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন হার্ভি ম্যান্সফিল্ড তাঁর দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অব র্যাশনাল কন্ট্রোল গ্রন্থে। তিনি বলেন, পূর্বধারণা, কুসংস্কার ও পুরোনো রীতিনীতির পরিবর্তে যুক্তির ভিত্তিতে জীবন পরিচালনাই আধুনিক সমাজের লক্ষণ। কুসংস্কার ও পুরোনো ধারণা মানুষকে সীমাবদ্ধ করে, আর যুক্তি মানুষকে বিচক্ষণ ও আত্মনিয়ন্ত্রিত করে তোলে। সমাজের অন্তর্নিহিত প্রবণতা মানুষকে পুরোনো রীতির দিকে টানে। কিন্তু আধুনিকতার দিকে অগ্রসর হতে হলে যুক্তিনির্ভর জীবনযাপন অপরিহার্য।
আমরা উন্নয়নশীল দেশের মানুষ উন্নত দেশে যেতে চাই, আবার অনেকে স্বপ্ন দেখি আমাদের দেশও একদিন উন্নত হবে। কিন্তু একটি দেশ উন্নত হতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। এই পথচলায় প্রয়োজন দুটি প্রস্তুতি—অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ। শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির উন্নতি মানে মননের উন্নয়ন। এই মনন গঠনের বৃহৎ কর্মযজ্ঞ যদি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আয়োজন করতে পারে, তবে আমাদের উচিত তাতে অংশ নেওয়া এবং সহযোগিতা করা।
এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। ই-মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব
