মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিগর্ভ বাস্তবতা থেকে বাংলাদেশের জন্ম। এই সত্যকে অস্বীকার করা বা এর ইতিহাসকে বিকৃত করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে জনগণ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিজয়ও দেখিয়ে দিল, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ এখনো জাতির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে একটি নির্ণায়ক ফ্যাক্টর।
গত দেড় বছরে বিএনপির চাঁদাবাজি, জমি দখল, মিথ্যা মামলা, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা ও বাড়িঘর পোড়ানোর মতো ঘটনাগুলোর পরও আওয়ামী লীগের বহু ভোট বিএনপির ব্যালটে পড়েছে।
শুধু আওয়ামী লীগ নয়, আমার পরিচিত অনেকেই, যাঁরা কোনো দলীয় রাজনীতির সমর্থক নন, তাঁরাও এবার ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। কারণ একটাই, যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হয়ে গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল এবং আজও সেই দায় স্বীকার করার নৈতিক সাহস দেখাতে পারেনি, তাদের ওপর জনগণের আস্থা নেই।
নারীর অধিকার, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এবং সামগ্রিক মানবাধিকার প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান বহু ভোটারের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তাদের সমর্থকদের মব সন্ত্রাস, মাজার ধ্বংস, পত্রিকা অফিস ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পোড়ানো, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাসভবন বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও তাদের প্রতি জনসমর্থন কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অনেকেই বিএনপিকে “মন্দের ভালো” হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
কিন্তু “মন্দের ভালো” বেছে নেওয়া কখনোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। দেশকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং একটি কল্যাণরাষ্ট্রের পথে এগোতে হলে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারকে সর্বপ্রথম দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে এবং সেই যাত্রা শুরু করতে হবে নিজেদের ঘর থেকেই। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিলে যত বড় সংস্কারই করা হোক, তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সবই সম্ভব।
যাঁরা মনে করেন ক্ষমতাই শেষ লক্ষ্য এবং জবাবদিহি অপ্রয়োজনীয়, তাঁরা যেন ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ভুলে না যান। ক্ষমতার স্থায়িত্ব পদ্মপাতার ওপর টলোমলো শিশিরবিন্দুর মতোই অনিশ্চিত।
ষাটের দশকে সদ্য স্বাধীন সিঙ্গাপুর ছিল দারিদ্র্যপীড়িত ও দুর্নীতিগ্রস্ত একটি অনুন্নত রাষ্ট্র। আধুনিক সিঙ্গাপুরের পিতা রূপে স্বীকৃত ও সেই রাষ্ট্রের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তিনটি নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন—
১. সততা;
২. মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসনিক নিয়োগ;
৩. দেশের স্বার্থে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ, তা যে মতাদর্শ থেকেই আসুক।
লি কুয়ান ইউর নেতৃত্বে সিঙ্গাপুর আজ বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র; তাদের পাসপোর্ট বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালীগুলোর একটি। বাংলাদেশও শিক্ষা, শান্তি, সমৃদ্ধি ও মানবিকতার একটি মডেল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, যদি ক্ষমতাসীনেরা আন্তরিক হন।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর স্কুলের ছাত্ররা হাসপাতাল ও জরুরি সেবার জন্য ব্যস্ত রাস্তায় যে ইমার্জেন্সি রুট তৈরি করেছিল, তা শৃঙ্খলার সঙ্গে চলেছিল। প্রথম কয়েক সপ্তাহ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমে গিয়েছিল, কারণ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটরা তখন পালিয়ে ছিল। পরে নতুন সিন্ডিকেট বা পুরোনো সিন্ডিকেট নতুন মুখোশ পরে ফিরে আসে। এই প্রভাবশালী মাফিয়া সিন্ডিকেটরাই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
আইনশৃঙ্খলা দ্রুত ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি এই সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনা—এটাই হওয়া উচিত নতুন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
সবশেষে একটি কথা—যাঁরা মনে করেন ক্ষমতাই শেষ লক্ষ্য এবং জবাবদিহি অপ্রয়োজনীয়, তাঁরা যেন ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ভুলে না যান। ক্ষমতার স্থায়িত্ব পদ্মপাতার ওপর টলোমলো শিশিরবিন্দুর মতোই অনিশ্চিত।
শারমিন আহমেদ লেখক ও তাজউদ্দীন আহমদের বড় মেয়ে
*মতামত লেখকের নিজস্ব