গণতন্ত্রায়ণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই সাফল্যকে ম্লান করে দেয় গণতন্ত্রায়ণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের চরম ব্যর্থতা। অর্ধশতাব্দী পার হয়ে গেছে, অথচ আজও আমরা গণতন্ত্রের স্থায়ী ও সর্বজনস্বীকৃত কাঠামো দাঁড় করাতে পারিনি। গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৭২ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই। সে সময় পৃথিবীব্যাপী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ‘তৃতীয় ঢেউ’ চলছিল। পর্তুগাল বা স্পেনের মতো সেকালের অগণতান্ত্রিক ও একনায়কতান্ত্রিক দেশগুলো গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রক্রিয়া শুরু করলেও দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে তার যাত্রাপথ বেশি দূর এগোতে পারেনি। স্বাধীনতার দুই বছরের মধ্যে গণতন্ত্র সংকটে পড়ে।

১৯৭৫ সালে বহুদলীয় শাসনের বদলে একদলীয় শাসন (বাকশাল) করা হয়। তারপর দুই দফায় সামরিক অভ্যুত্থান (১৯৭৫ ও ১৯৮১ সালে), বিতর্কিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংস আন্দোলন এবং অসাংবিধানিক পথে ক্ষমতা রদবদলের সংস্কৃতি গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নিয়মতান্ত্রিক পথে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন, জাতীয় সংসদকে সক্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের সুস্থ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তার বদলে আমরা লক্ষ করছি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চরম তিক্ততা ও অসহিষ্ণুতা, যা কিনা জন্ম দিচ্ছে স্থায়ী সংঘাতের।

সবকিছু দলীয়করণের শিকার

সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চরম ব্যর্থতা দেখিয়েছে। এই ব্যর্থতার সঙ্গে কীভাবে এখানে ধনিক–অভিজাত শ্রেণির উদ্ভব হলো, সেটি সম্পর্কিত। পাকিস্তান আমলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে ক্ষুদ্র বাঙালি ধনিক গোষ্ঠীর জন্ম হয়। আইয়ুব খানের আমলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে শিল্পায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে কিছু বাঙালি মধ্যস্বত্বভোগী ঠিকাদারি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রাথমিক পুঁজি সঞ্চয় করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহায়তায় এখানে বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশ শুরু হয়। রাষ্ট্রের সহায়তা বলতে স্বাধীনতা–পরবর্তীকালে লুটপাট, বিদেশি সাহায্য ও ঋণের সিংহভাগ আত্মসাৎ, জাতীয়করণ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিঃশেষ করে এবং আমলাতন্ত্রের সহায়তায় রাষ্ট্রপ্রদত্ত বহুবিধ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে এক নব্য ধনিক শ্রেণির উত্থান ঘটে।

রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহায়তায় বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশের কারণে এখানে বিচার বিভাগ, পার্লামেন্ট ও আমলাতন্ত্র স্বাধীন ও পুরোমাত্রায় নিরপেক্ষভাবে তাদের কর্তব্য পালনে পারদর্শিতা দেখাতে পারেনি। বছরের পর বছর পার হলেও এ ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ এ সমস্যার প্রতি সরকারি নির্লিপ্ততার সম্ভাব্য কারণ হচ্ছে যারা এই লুটপাটের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত, তারা সরকারি দলের অথবা সরকারের আজ্ঞাভাজন। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সীমাহীন দুর্নীতিরও কোনো সমাধান হয়নি; ঠিক এই একই কারণে যদিও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।

সরকারের প্রতি মানুষের আস্থায় যে প্রচণ্ড ঘাটতি লক্ষ করা যায়, তার উৎস এখানে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও যেটি লক্ষণীয়, সেটি হচ্ছে সরকার ও জনগণের মধ্যবর্তী যে স্থান সুশীল সমাজের জন্য বরাদ্দ থাকে এবং যেখানে স্বাধীন চিন্তা ও সমালোচনার সুযোগ থাকে, সেই জায়গা প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি। নিপীড়নমূলক আইন প্রয়োগ করে সরকার এই সুশীল সমাজের কণ্ঠ রোধ করতে অনেকটা সক্ষম হয়েছে অথবা তাকে দলীয়করণ করে তার স্বাধীন সত্তার বিয়োগ ঘটিয়েছে। ফলে সরকার ও জনগণের মধ্যে মতবিনিময়ের মাধ্যমগুলো নিস্তেজ হয়ে জীবনীশক্তি হারিয়েছে। সমালোচনাকে নেতিবাচক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে তাকে অঙ্কুরে বিনাশ করার লক্ষ্যে ডিজিটাল আইনসহ নানা ধরনের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার অসীম দৌরাত্ম্যে জনগণ ও সরকারের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে যোজনব্যাপী দূরত্ব। সমালোচনার মাধ্যমগুলোকে অকেজো করে দেওয়া যেকোনো দিক থেকে অনভিপ্রেত।

রাজনৈতিক দলকে দায়িত্ব নিতে হবে

গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই ব্যর্থতা দীর্ঘকাল ধরে পুঞ্জীভূত হয়েছে। এর জন্য নিরঙ্কুশভাবে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো দায়ী। গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দেশ কতটুকু সফল হবে, সেটি নির্ভর করে রাজনৈতিক দলের ওপর। দলগুলোর অভ্যন্তরে যে সংস্কৃতি ও নিয়মনীতি চালু থাকে তার ওপর। ১৭৯৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকায় বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রচণ্ডভাবে সমালোচনা করেছিলেন। কারণ, তিনি উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছিলেন, আমেরিকায় রাজনৈতিক দলগুলো এমন সব সদস্য নিয়ে গড়ে উঠেছে, যারা অত্যন্ত ধূর্ত, নৈতিকতাহীন, লোভী ও উচ্চাভিলাষী। তারা গণমানুষের ক্ষমতাকে তোয়াক্কা করে না এবং দেশ ও জনস্বার্থের কথা ভুলে গিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থ নিয়ে ভাবে। প্রায় আড়াই শ বছর পার হলেও এই সতর্কবাণী আজ অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক আমাদের দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে।

রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য ক্ষমতা লাভ করা এবং এর প্রয়োগ করা। সংগঠিত গ্রুপ হিসেবে তারা নির্বাচনে অংশ নেয়, রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ করে, নির্বাচনে জয়ী হলে দেশ পরিচালনার ভার তাদের ওপর ন্যস্ত হয় অথবা তাকে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে হয়। এভাবে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়। সেই ক্ষমতাবলে তারা দেশের অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, সামাজিক, রাজনৈতিকসহ গণমানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত সবকিছুর দিকনির্দেশনা ও তার বাস্তবায়ন করার সুযোগ পায়। সে কারণে রাজনৈতিক দল ও আধুনিক গণতন্ত্র ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক দল ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না। রাজনৈতিক দল শক্তিশালী হয় যখন জনগণের আশা–আকাঙ্ক্ষাকে তারা রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রতিফলিত করতে পারে। আন্তসম্পর্কের ব্যাপারটা আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে স্থান পেলেও কখনো সঠিক ও ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হয় না।

এখানে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক খুবই ক্ষণস্থায়ী। জনগণকে রাজপথে নামিয়ে আন্দোলন সফল করা অথবা নির্বাচনে বহুবিধ আশ্বাস দিয়ে এবং অঙ্গীকার করে ব্যালটবাক্স পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এই দুই পক্ষের আন্তসম্পর্ক। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে ব্যবসায়িক শ্রেণির একচ্ছত্র আধিপত্য, অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন পাওয়ার সংস্কৃতি রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণ থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে এবং দুর্বল করছে। সেই সঙ্গে যোগ করতে পারি দলীয় আচরণবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতা এবং রাষ্ট্রের আইনভঙ্গকারী দলীয় সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত অনীহা। এসব অন্তর্নিহিত দুর্বলতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয় এবং অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানকে উৎসাহিত করে।

আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা একটি প্রধান ইস্যু। গণতন্ত্রের ভিতকে শক্তিশালী করতে হলে এই প্রতিষ্ঠানকে নিরপেক্ষ এবং আইনগত দিক থেকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা জরুরি। অন্যথায় সুস্থ নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্ত পূরণ করা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলের সহযোগিতা প্রয়োজন।

উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী একটি সংস্থা। এর কার্যকলাপের ওপর ক্ষমতাসীন দল বা রাজনৈতিক শক্তি কোনো প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা রাখে না। নিরপেক্ষ এ প্রতিষ্ঠান নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করে, নির্বাচন প্রার্থীর অর্থ ব্যয়ের ওপর তদারক করে, নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে ব্যালটবাক্সে সুস্থভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে। সুস্থ নির্বাচন পরিচালনার নীতিমালা ভঙ্গ করার শাস্তি কার্যকর হয় এই নির্বাচন কমিশনের হাতে। তার জবাবদিহি কেবল সরকারি এবং বিরোধী দল নিয়ে গঠিত সংসদীয় কমিটির কাছে।

আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা একটি প্রধান ইস্যু। গণতন্ত্রের ভিতকে শক্তিশালী করতে হলে এই প্রতিষ্ঠানকে নিরপেক্ষ এবং আইনগত দিক থেকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা জরুরি। অন্যথায় সুস্থ নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্ত পূরণ করা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলের সহযোগিতা প্রয়োজন। কীভাবে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত করা যায়, সেই দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে। আজকের সংঘাতময় রাজনীতি অবসানের ক্ষেত্রে এটিই হতে পারে অন্যতম বিকল্প।

  • বদরুল আলম খান অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন সিডনির অধ্যাপক।