আমেরিকার রাজনীতিতে গত এক মাসে যা ঘটে গেছে, তা নিয়ে নিশ্চিতভাবেই বইপত্র লেখা হবে। মাত্র চার সপ্তাহের ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে নতুন নতুন মোচড়, নতুন বাঁক ও প্রবাহের পরিবর্তন দেখা গেছে। নির্বাচনের মাত্র এক শ দিন বাকি আছে। এ অবস্থায় এখন ভোটাররা দৌড়ের শেষ মুহূর্তের উত্তেজনা অনুভব করছেন।
নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বয়স ইস্যুটি ভোটারদের উদ্বেগের শীর্ষে ছিল। বাইডেন ইতিমধ্যেই ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়েছেন। তিনি যদি দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হতেন তাহলে মেয়াদ শেষে তাঁর বয়স দাঁড়াত ৮৬ বছর।
জরিপে দেখা গেছে, দেশ পরিচালনার জন্য যে বিচক্ষণতা থাকা দরকার, বয়সের কারণে বাইডেনের সে শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা আছে কি না, তা নিয়ে বেশির ভাগ ভোটার গুরুতরভাবে সন্দিহান।
বাইডেন, তাঁর পরিবারের সদস্যরা এবং তাঁর নিজস্ব বলয়ের লোকজন যখন তাঁর নির্বাচনে দাঁড়ানো উচিত হবে কি না—এই প্রশ্ন নিয়ে রশি–টানাটানি করছিলেন; ঠিক সেই সময়ে ট্রাম্পকে খোশ মেজাজে মাঠে দেখা গেছে। তিনি এতটাই নির্ভার ও নিশ্চিন্ত মনে ছিলেন যে এ সময়টাতে তিনি প্রচারের মাঠের চেয়ে গলফ খেলার মাঠে বেশি সময় দিয়েছেন।
এরপর ১৩ জুলাই পেনসিলভানিয়ায় সবচেয়ে বড় নাটকীয় ঘটনা ঘটে গেল। এই দিন ট্রাম্প যখন প্রচার সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, একটি গুলি ফুটল এবং বন্দুকধারীর বুলেট তাঁর কান ভেদ করে বেরিয়ে গেল।
গুলি খাওয়ার পরের মুহূর্তটিকেও ধূর্ত ট্রাম্প সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে ভুল করেননি। তাঁকে যখন ভিড়ের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তাঁর গাল পর্যন্ত রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল এবং সেই অবস্থায় তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ‘ফাইট! ফাইট!’ বলে স্লোগান দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও ট্রাম্পের সমর্থন খুব একটা বাড়েনি।
অনেকগুলো নাটকীয় ঘটনা নিরপেক্ষ ও দোদুল্যমান ভোটারদের কিংবা ট্রাম্পবিরোধী রিপাবলিকানদের ট্রাম্পের প্রতি সহানুভূতিশীল করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? এর সোজা জবাব হলো, বেশির ভাগ আমেরিকানের কাছে বাইডেন বা ট্রাম্পের কাউকেই গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।
বাইডেন তো বৃদ্ধ বটেই, অন্যদিকে ৭৮ বছর বয়সী ট্রাম্পও খুব কম বয়সী নন। এর বাইরে ট্রাম্প একজন উচ্ছৃঙ্খল, দুর্নীতিগ্রস্ত, খামখেয়ালি একজন লোক। তিনি নির্বাচিত হলে এমন সব নীতি বাস্তবায়ন করতে পারেন, যেগুলো তাঁর সংকীর্ণ নিজস্ব বলয় ও চরমপন্থী শিবিরের বাইরে সামান্য সংখ্যক লোকের সমর্থন পাবে।
শিগগিরই আরেকটি ‘প্রথম’ আমরা পেতে পারি: কমলা যদি নভেম্বরে জয়ী হন, তবে তিনি হবেন আমেরিকার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। সেই সম্ভাবনা বেশ জোরালো হতে দেখা যাচ্ছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় চাঁদাদাতারা কমলার প্রচারাভিযানের জন্য রেকর্ড ভেঙে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চাঁদা দিয়েছেন। নির্বাচনী সমাবেশে তাঁর প্রথম উপস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক উল্লসিত মানুষ দেখা গেছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারা থেকে শুরু করে চাঁদাদাতারা কমলার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরাও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ভুল করেছেন। বাইডেন নির্বাচনী দৌড়ে থাকবেন কি না, তা নিয়ে যখন আলোচনা চলছিল, সে সময় বাইডেনের প্রচারশিবিরসহ সমগ্র ডেমোক্রেটিক প্রতিষ্ঠানের উচিত ছিল ট্রাম্প ও তাঁর সদ্য ঘোষিত ক্রেমলিন-সমর্থিত রানিংমেট জেডি ভ্যান্সের বিরুদ্ধে সমানতালে প্রচার চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু তার বদলে ডেমোক্র্যাটরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগপর্যন্ত একধরনের স্থাণু অবস্থায় আটকে রইলেন। এই ব্যাপারটি যে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে প্রথমবার ঘটেছে, তা নয়।
প্রকৃতপক্ষে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতাদের সঙ্গে প্রায় পাঁচ বছর ধরে কাজ করার সময় আমি নিজে দেখেছি, কীভাবে দ্রুত এবং সিদ্ধান্তমূলকভাবে কাজ করার অনিচ্ছা বা অক্ষমতা দলটিকে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করার সময় অনর্থক কারণের ওপর নিজেকে নির্ভরশীল করে ফেলে। সেই দিক থেকে বাইডেনের সরে দাঁড়ানো এবং তাঁর জায়গায় কমলা হ্যারিসের প্রতি সমর্থন দিতে দলটির প্রায় এক মাস লেগে যাওয়া আমাদের মোটেও অবাক করেনি।
তবে দৃশ্যপটে কমলার আগমন শেষ পর্যন্ত আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে আগের চেয়ে চিত্তাকর্ষক প্রতিযোগিতায় পরিণত করেছে। একবিংশ শতাব্দী আমেরিকান রাজনীতিতে অনেকগুলো ‘প্রথম’ নিয়ে এসেছে: আমরা পেয়েছি প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, তারপর পেয়েছি প্রথম কর্তৃত্ববাদী প্রেসিডেন্ট, একটি বিশ্বব্যাপী মহামারির মধ্যে হওয়া প্রথম নির্বাচন।
শিগগিরই আরেকটি ‘প্রথম’ আমরা পেতে পারি: কমলা যদি নভেম্বরে জয়ী হন, তবে তিনি হবেন আমেরিকার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। সেই সম্ভাবনা বেশ জোরালো হতে দেখা যাচ্ছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় চাঁদাদাতারা কমলার প্রচারাভিযানের জন্য রেকর্ড ভেঙে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চাঁদা দিয়েছেন। নির্বাচনী সমাবেশে তাঁর প্রথম উপস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক উল্লসিত মানুষ দেখা গেছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারা থেকে শুরু করে চাঁদাদাতারা কমলার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন প্রকাশ করেছেন।
পরবর্তী ১০০ দিনে দুই প্রার্থীর মধ্যে লড়াই তীব্র হতে থাকবে। তরুণ ও উদ্যমী কমলার পাশে দাঁড়ানো প্রায় ৮০ বছর বয়সী ট্রাম্পকে আরও জীর্ণ–শীর্ণ দেখাবে। যেখানে কমলার জনপ্রিয়তার পালে তীব্র হাওয়া বইছে, সেখানে ট্রাম্পের ভাবমূর্তি ও চেহারায় আবেদনের অভাব তাঁকে নিচে টেনে নামাতে থাকবে। কমলা একটি যৌবনদীপ্ত, স্পষ্ট ও তেজি ভাবমূর্তি নিয়ে যত উত্সাহী প্রজন্মের কাছে ফুটে উঠবেন; ট্রাম্প ততই তাঁর পশ্চাৎমুখী, কুৎসিত বক্তব্য এবং ভীতি–কৌশলের দিকে ঝুঁকতে থাকবেন।
প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ বলেছিলেন, রাজনীতিতে ‘বিগ মো’ (বিগ মোমেন্টাম) বা ‘মোক্ষম মুহূর্ত’ বলে একটি ব্যাপার আছে এবং রাজনৈতিক দলকে সেই ‘বিগ মো’ লাগসইভাবে ব্যবহার করতে হয়। এই মুহূর্তে সেই ‘বিগ মো’ ‘টিম হ্যারিসের’ অনুকূলে। যদি তিনি সেটিকে কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে তিনি হয়তো ট্রাম্পের বিধ্বংসী পরাজয় ঘটাতে পারবেন।
রিড গ্যালেন আমেরিকান গণতন্ত্র রক্ষা এবং কর্তৃত্ববাদী প্রার্থীদের পরাজিত করার জন্য নিবেদিত গণতন্ত্রপন্থী জোট জয়েনদ্যইউনিয়ন ডট আস-এর প্রেসিডেন্ট
স্বত্ত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ