বিশ্লেষণ
সহিংসতা-উত্তর রাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ইনসাফের প্রশ্ন
যে ধরনের সংঘাতময় ও স্বৈরাচারী শাসনের পর পৃথিবীতে ক্রান্তিকালীন ইনসাফের আলাপ সামনে আসে, বাংলাদেশ বর্তমানে ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সহিংসতা-উত্তর রাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ক্রান্তিকালীন ইনসাফ নিয়ে লিখেছেন সহুল আহমদ
ক্রান্তিকালীন ইনসাফ বা ‘ট্রানজিশনাল জাস্টিস’ ধারণাটি সমকালীন রাজনৈতিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ। যেসব সমাজ, দেশ বা রাষ্ট্র গৃহযুদ্ধ বা দীর্ঘদিন স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, সেখানে সাধারণত পদ্ধতিগতভাবে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। পদ্ধতিগত কায়দায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বহু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি জড়িয়ে পড়েন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেবল প্রচলিত আদালত বা বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ইনসাফ কায়েম করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। যে আদালতের বিচার করার কথা, দেখা যায় তারাই পূর্ববর্তী শাসনামলের যাবতীয় সহিংসতার আইনি সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল।
অন্যদিকে ব্যাপক হারে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ক্ষত সমাজে এমন গভীর দাগ ও চিড় রেখে যায়, যা কেবল আইন-আদালতের বিচার দিয়ে উতরানো যায় না। উল্টো অনেক ক্ষেত্রে প্রথাগত বিচারপ্রক্রিয়া ইনসাফের পরিবর্তে প্রতিহিংসায় রূপ নেয়।
তাই সহিংসতা-পরবর্তী সমাজে কীভাবে এমন এক পরিস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব, যেখানে অতীতের দুঃসহ যাতনা ও ট্রমার কেবল নিরাময়ই হবে না, বরং ভবিষ্যতে যাতে এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে তার গ্যারান্টি তৈরি হবে। এই ভাবনা থেকেই ক্রান্তিকালীন ইনসাফ ধারণার উদ্ভব। লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশগুলো, বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা ও চিলির অভিজ্ঞতা এই ধারণার বিদ্যায়তনিক ও প্রায়োগিক বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।
সহজ কথায়, অতীত সহিংসতার মুখোমুখি হওয়া, তা মোকাবিলা করা এবং ট্রমা থেকে নিরাময় লাভের জন্য জুডিশিয়াল ও নন-জুডিশিয়াল পদ্ধতির এক সমন্বিত প্রক্রিয়াই হলো ক্রান্তিকালীন ইনসাফ। এই প্রক্রিয়ার মূল নির্যাস হলো, সত্য উদ্ঘাটন ও তা স্বীকার করা; বড় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান; ভুক্তভোগীদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাই নয়, বরং সহিংসতার ফলে খণ্ডিত ও বিভাজিত সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে পারস্পরিক আস্থা ও সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা। অতীতের ক্ষত ও সামষ্টিক ট্রমার নিরাময় না করে যদি স্রেফ সামনে ‘এগিয়ে’ যাওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আবার সংঘাত ও সহিংসতার ঝুঁকি থেকেই যায়।
২.
ক্রান্তিকালীন ইনসাফ প্রক্রিয়ার অনেকগুলো পদক্ষেপ রয়েছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, ট্রুথ কমিশন গঠন, ক্ষতিপূরণ প্রদান, যৌথ ও অংশীদারত্বমূলক স্মৃতির জন্য জাদুঘর বা স্মৃতিস্মারক নির্মাণসহ আরও বহু খুঁটিনাটি পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তর আলাপ বিদ্যায়তনিক জগতে রয়েছে। তবে এই নিবন্ধে কেবল একটি দিকের ওপর আলোকপাত করব: প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ক্রান্তিকালীন ইনসাফের কর্মযজ্ঞের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো সমাজে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধ নিশ্চিত করা। সাধারণত দেখা যায়, স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে রাষ্ট্র যখন পদ্ধতিগতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তখন রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের ভূমিকা থাকে সবচেয়ে প্রকট। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ‘নীরবতা’ পালন করলেও এই দুই অঙ্গের প্রত্যক্ষ ‘সক্রিয়তা’ ব্যতিরেকে রাষ্ট্রপ্রণোদিত সহিংসতা সম্ভব হয় না।
এই প্রক্রিয়ায় নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এক ভয়াবহ দূরত্ব ও অনাস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়। যে প্রতিষ্ঠানের কাজ ছিল নাগরিকের জানমালের সুরক্ষা দেওয়া, সেটিই যখন ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন নাগরিক তাকে সন্দেহের চোখে দেখে। ফলে কেবল কয়েকজন ব্যক্তির গ্রেপ্তার বা বিচারের মাধ্যমে এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এই অনাস্থা দূর এবং পুনরাবৃত্তি রোধের লক্ষ্যেই ‘প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার’ ক্রান্তিকালীন ইনসাফের অনিবার্য পদক্ষেপ হিসেবে হাজির হয়। যেহেতু সহিংসতা ও মানবাধিকারের ইস্যুই এখানে মুখ্য থাকে, সেহেতু আইন-আদালত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংস্কারের দাবিটি সবার আগে আসে।
যেহেতু স্বৈরাচারী শাসনামলে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনী এবং বিচার বিভাগ দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেহেতু এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হয়, যেন তারা মানবাধিকার রক্ষায় দায়বদ্ধ থাকে। কেবল প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার ‘দোষী’ ব্যক্তিদের সাজা বা পদের অদল-বদল করে এটা করা সম্ভব হয় না, প্রয়োজন পড়ে প্রচলিত আইনি কাঠামোর পরিবর্তন। যে আইনি ও সাংগঠনিক কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে আগে যে ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল, সেগুলোকে সরিয়ে নতুন কাঠামো দাঁড় করানোই ক্রান্তিকালীন ইনসাফের অন্যতম লক্ষ্য।
৩.
যে ধরনের সংঘাতময় ও স্বৈরাচারী শাসনের পর পৃথিবীতে ক্রান্তিকালীন ইনসাফের আলাপ সামনে আসে, বাংলাদেশ বর্তমানে ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস সহিংসতাপ্রবণ; প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক পক্ষেরই নানা মাত্রায় ‘নিপীড়িত’ হওয়ার ‘ক্ষত’ রয়েছে। আবার রাষ্ট্রের দানবীয় রূপও আমরা বারবার দেখেছি। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক থেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এই প্রাণঘাতী চেহারা সুস্পষ্ট হতে শুরু করে, যা গত দেড় দশকের স্বৈরাচারী আমলে চরম কদর্য রূপ ধারণ করে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে। ২০০০ সালের পর বিএনপি শাসনামলে ‘ক্রসফায়ার’–এর নামে র্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছিল; আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থা তখন র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশও করেছিল। ২০০৮ সালের পর আওয়ামী শাসন সেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ধারাকে কেবল জারিই রাখেনি, বরং সেটিকে আরও সুসংগঠিত ও ব্যাপক আকার দান করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় গুম।
রাজপথে আন্দোলনকারীদের গুলি করে হত্যা করাও ছিল গত শাসনামলের আরেক বৈশিষ্ট্য। ২০১৩ সালে হেফাজতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত রাষ্ট্রীয় সহিংসতাসহ বিভিন্ন আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রতিক্রিয়াকে আমলে নিলেই এই জুলুমের পরিধি ঠাওর করা যাবে। বিচার দূরে থাকুক, উল্টো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করার নজিরও রয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং তার দায়মুক্তিই যেন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান চরিত্রে পরিণত হয়েছিল। লক্ষণীয়, এই ধরনের সহিংসতার বিচারের উদ্যোগ যদি কখনো নেওয়াও হয়, তা প্রায়ই প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে ওঠে, যা সমাজে আবার সহিংসতার নতুন এক চক্র তৈরি করে।
রাষ্ট্রপ্রণোদিত সহিংসতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে চব্বিশের জুলাই-আগস্ট মাসে। মাত্র ২০ দিনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো আট শর বেশি নাগরিককে হত্যা করে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রতিক্রিয়াতেই তৎকালীন আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর যে ‘সংস্কার’ আলাপ শুরু হয়েছে, তাকে এই ক্রান্তিকালীন ইনসাফের জায়গা থেকেই পাঠ করা জরুরি। এখানকার রাজনৈতিক ইতিহাসে সহিংসতার প্রেক্ষাপট আমলে নিলে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টত ধরা পড়ে।
৫ আগস্টের পর পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে নবনিযুক্ত পুলিশপ্রধানের (আইজিপি) দুঃখপ্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। এ ধরনের আত্মস্বীকৃতি বা অ্যাকনলেজমেন্ট জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল পুলিশসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে যেভাবে ব্যবহার করেছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম অনুশোচনা বা অ্যাকনলেজমেন্টের নজির দেখা যায় না। সব পক্ষই নিজেদের আমলের ‘সহিংসতা’কে ‘জায়েজ’ বলে মনে করে। ফলে নিজের বিরোধী পক্ষের অপরাধমূলক কাজের সমালোচনা করে নিজেদের পূর্বতন অপরাধমূলক কাজকে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টাই এখানকার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রবণতা।
৪.
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর সংস্কারের দাবি জোরেশোরে ওঠে। চব্বিশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপর জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশনের প্রতিবেদনেও আইনি সংস্কারের ওপর প্রচুর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ, ঔপনিবেশিক আইন পরিবর্তন, র্যাব বিলুপ্তি এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের কার্যক্রমকে সীমিত করার সুপারিশ সেখানে ছিল। পুলিশ, র্যাবের পাশাপাশি অনেকগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুপারিশও সেখানে ছিল।
পুলিশ সংস্কার কমিশন তৈরি করা হয়েছিল। এই ধরনের কমিশন তৈরি নিঃসন্দেহে ক্রান্তিকালীন ইনসাফ প্রক্রিয়ার জন্য জরুরি পদক্ষেপ ছিল। সংস্কার কমিশনের অধিকাংশ প্রতিবেদন যেমন করে আড়ালে পড়ে গেছে, পুলিশ সংস্কার কমিশনের ক্ষেত্রেও তা–ই ঘটেছে। ‘পুলিশ বাহিনীর প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য’ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে একটি ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ’ও জারি করা হয়েছিল।
কিন্তু টিআইবি তখন জানিয়েছিল, এই কমিশন অধ্যাদেশ ‘গণ-আকাঙ্ক্ষার প্রতি উপহাস, অর্থহীন ও আত্মঘাতী’। তাদের মতে, ‘এ অধ্যাদেশ পুলিশের পেশাদারত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে পুলিশ বাহিনীর ওপর প্রশাসনিক ও পুলিশি আমলাতন্ত্র, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ আরও গভীরতর করবে।’ (প্রথম আলো, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫)
ভালো-মন্দ মিলিয়ে যে কমিশনের অধ্যাদেশ হয়েছিল, সেটাও আলোর মুখ দেখেনি। নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার এই অধ্যাদেশকে সংসদে উত্থাপনই করেনি, ফলে অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা লোপ পেয়েছে।
একইভাবে দেখা যাচ্ছে, যে ধরনের উদ্যোগ বা সংস্কার রাষ্ট্রপ্রণোদিত সহিংসতা রোধ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহির অধীনে নিয়ে আসার জন্য দরকার ছিল, তার কোনোটাই সংসদে পাস করা হয়নি। যেমন গুম, মানবাধিকার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা–সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলোর কোনোটাই সংসদে পাস করা হয়নি; বরং গুম ও মানবাধিকার কমিশন নিয়ে যে ধরনের যুক্তি ও ভাষ্য সংসদ ও সংসদের বাইরে সরকারি দলের নেতারা দিয়েছেন, সেটা দুঃখজনকই বটে।
৫.
বাংলাদেশের মতো সহিংসতাপ্রবণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার না করার বিপদ বহুমুখী।
প্রথমত, সহিংসতা-উত্তর পরিস্থিতিতে ক্রান্তিকালীন ইনসাফের আলাপ তোলা হয় এই কারণে যে এমন সহিংসতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেন নাগরিকদের আর কখনো যেতে না হয়। একদিকে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়বদ্ধ করার জন্য কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। এই সংস্কারে ব্যর্থ হওয়ার অর্থ হলো, প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ করে দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক যাত্রা টেকসই করতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নাগরিকের আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। সহিংসতার স্মৃতি ও রাষ্ট্র কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি নাগরিকের তীব্র অনাস্থা তৈরি করে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যে ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহিংসতা নাগরিকের জীবনের ওপর চাপিয়ে দেয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগ যেভাবে অতীতে ব্যবহৃত হয়েছে, তাতে এগুলোর প্রতি সাধারণ নাগরিকের আস্থা ন্যূনতম। নাগরিকের সঙ্গে যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে না পারে, তাহলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর সুষ্ঠু হবে না, তেমনি নাগরিকের ক্ষোভ ও ট্রমা নানাবিধ ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক’ কায়দায় বিস্ফোরিত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাবে; যার আলামত ইতিমধ্যে সমাজে স্পষ্ট।
এককালে যেমন সাম্রাজ্যবিরোধিতা ছিল বিপ্লবের হাতিয়ার, একালে সেটা হয়ে গেছে মানবাধিকার ও ইনসাফের ধারণা। গত ২০ বছরে দুনিয়াজুড়ে সংগঠিত অভ্যুত্থানের দিকে নজর দিলে টের পাওয়া যায়, রাষ্ট্র কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাই অভ্যুত্থানগুলোর বীজ পুঁতে দিচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রের দানবীয় চেহারার বিপরীতে প্রাণাধিকারই হয়ে উঠছে লড়াইয়ের অন্যতম স্লোগান। মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রতিক্রিয়াতেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছিল। নাগরিকের মৃত্যুই রাজপথে টেনে এনেছিল সহনাগরিকদের।
আমরা এখনো ইনসাফ বলতে কেবল আইন-আদালতের দ্বারস্থ হওয়াকেই বোঝাচ্ছি। কিন্তু যে রক্তাক্ত প্রান্তর পার হয়ে এসেছি, তার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করে টেকসই গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য যে ধরনের গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার ছিল, অন্তত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে, তার কোনো কিছুই হয়নি; হয়েছে কেবল সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ‘চেহারা’র বদল। পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করা হয়েছিল, তখন সমালোচনা করে বলা হয়েছিল, শুধু পোশাকি পরিবর্তন দিয়ে কী হবে? সম্প্রতি সেই পোশাকও আবারও বদলে যাচ্ছে।
এই পোশাকি পরিবর্তনটাও যে করা হলো না, আবার আগের জায়গায় ফিরে নিয়ে যাওয়া হলো, এটাকে রূপকার্থেও পাঠ করা যেতে পারে। এহেন পরিস্থিতিতে ‘প্রতিশোধ’মূলক পদক্ষেপকেই বিচারের নামে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। আলামত সে ধারণাই দিচ্ছে। নাগরিকদের জন্য অশনিসংকেতই বটে!
সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব