ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি যে যুদ্ধ সৃষ্টি হয়েছে, বিশ্বজুড়েই তার অভাবনীয় প্রভাব পড়েছে। জ্বালানি অবকাঠামোয় পাল্টাপাল্টি হামলা হওয়ায় এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম শুধু বাড়েইনি, প্রাপ্যতা নিয়েও বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এ বাস্তবতায় বিশ্বের অনেক দেশই জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। অনেক দেশ জ্বালানিতে রেশনিং চালু করেছে। বাংলাদেশের সরকার শুরুতে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও গত রোববার এক লাফে অকটেনে ২০ টাকা, পেট্রলে ১৯ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা এবং কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়েছে।
জ্বালানি তেল কৌশলগত পণ্য। এর দাম বাড়া মানে আলু, পটোল থেকে শুরু করে যাবতীয় পণ্য আর সেবার দাম বাড়া। মানে নতুন এক দফা মূল্যস্ফীতির সুনামি আছড়ে পড়া। তিন বছর ধরে লাগাতার উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে কায়দা করে বেঁচে থাকা মানুষের জন্য এই ধাক্কাটা সামাল দেওয়া কতটা সম্ভব?
মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির নীরব ঘাতক। মূল্যস্ফীতির তুলনায় আপনার মজুরি, বেতন না বাড়ার অর্থ হচ্ছে গত বছরের তুলনায় আপনার প্রকৃত আয় কমে যাওয়া। ফলে নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশ এমনিতেই পাত থেকে মাছ, ডিম, সবজি কমিয়ে, সন্তানের স্কুলের প্রাইভেট কিংবা কোচিংয়ে পড়ার খরচ বাঁচিয়ে, চিকিৎসার খরচ কোনোভাবে কমিয়ে, বাসাভাড়া নিম্ন আয়ের এলাকায় নিয়ে—এ রকমভাবে জুতার মাপে পা কেটে কেটে বেঁচেবর্তে থাকার কায়দা করে চলেছেন।
এবারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অভিঘাত কতটা গভীর হতে পারে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে টিসিবির লাইনের পেছনে ছুটতে ছুটতে রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া মানুষের ছবিই তা বলে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে দিয়েছে, ইরান যুদ্ধের অভিঘাতে বাংলাদেশে নতুন করে ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্য রেখার নিচে নেমে যেতে পারে। কোভিড মহামারি থেকে শুরু করে গরিব হওয়ার মিছিলটা বাড়তে বাড়তে গত বছরের অক্টোবর মাসে ২৭ শতাংশ পেরিয়েছে।
এটা অস্বীকার করা যাবে না যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোটা অবধারিত ছিল। তবে পরিবহনমালিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন গোষ্ঠী যেভাবে ভাড়া ও দাম বাড়ানোর ফর্দ ও দাবিনামা নিয়ে হাজির হয়েছে, তার আংশিক দাবিও যদি সরকার মেনে নেয় (কারণ, এবারের সংসদেও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ), তাহলে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর পকেট যে আরও নিঃস্ব হয়ে যাবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বিপুলসংখ্যক মানুষের এই নিঃস্বকরণের বিপরীতে রাতারাতি লাখপতি, কোটিপতি হওয়ার প্রতিযোগিতাও থেমে থাকবে না। দুর্যোগ, মহামারি, যুদ্ধ, দুর্বিপাক সব সময়ই কিছু মানুষের, কিছু গোষ্ঠীর জন্য সম্পদ বানানোর আলাদিনের চেরাগ হয়ে যায়। বাংলাদেশের স্বজনতোষী অর্থনীতির প্রতিটি পরতেই কোনো না কোনো গোষ্ঠীর জন্য সেই সুযোগ তৈরি করে দেওয়া আছে। ফলে সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের বাজারের একটি দেশে শতকোটি উৎপাদনের হারে প্রথম কাতারে থাকা দেশটাও বাংলাদেশ।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকারি সংস্থা বিপিসি তেলের সরবরাহ বাড়িয়েছে। এ সিদ্ধান্ত নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কি তাহলে নিজেদের মুনাফার স্বার্থেই তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল?
এ প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ নিয়ে জনমনে আস্থার সংকটও দেখা দিয়েছে। সরকারের মন্ত্রীরা শুরু থেকেই বলে আসছেন, দেশে জ্বালানির মজুত নিয়ে ঘাটতি নেই। মার্চ মাসের তথ্য বলছে, গত বছরের মার্চ মাসের তুলনায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ কিছুটা কম হলেও সেটা বড় কোনো ঘাটতি নয়। সরকারের সবচেয়ে প্রশংসীয় উদ্যোগ হচ্ছে, বিকল্প নানা উৎস খুঁজে জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া।
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বন্দরে তেলবাহী জাহাজ এসে ভিড়ছে, সরকারি–বেসরকারি ডিপোগুলোতে তেল উপচে পড়ছে, অথচ তেল নিয়ে দেশজুড়ে হাহাকার শেষ হচ্ছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, সোনার মতো দামি ডলার (বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যে সোনার চেয়ে দামি হতে পারে, সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদের অর্থনীতি গেছে) দিয়ে কিনে আনা জ্বালানি তেল আসলে যাচ্ছে কোথায়?
যুদ্ধের একেবারে শুরুর কয়েক দিন জ্বালানি পাওয়া নিয়ে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, তাতে ‘প্যানিক বায়িংটা’ অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু দেড় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও পেট্রলপাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহের বিষয়টি মোটেই স্বাভাবিক নয়। জ্বালানি না পাওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে কর্মসংস্থান না থাকায় ভাড়ায় মোটরসাইকেলচালকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
শহরগুলোতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও মফস্সল শহর ও গ্রামগুলোতে ৮–১০ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এর ধাক্কা লাগছে উৎপাদন ও মানুষের আয়ে। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শস্য বোরো ধান উৎপাদনের সেচ পেতে কৃষকেরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। ডিজেল পেতে দীর্ঘ লাইনে তাঁদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ঠিকমতো সেচ দিতে না পারায় বোরোর উৎপাদন যদি কমে যায়, তাহলে শুধু কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, ভুগতে হবে সবাইকে।
২০০৮ আর ২০১৭ সালের অভিজ্ঞতা বলছে ধানের উৎপাদন কম হলে কীভাবে গুণিতক হারে বাজারে চালের দাম বাড়ে। ইরান যুদ্ধ শুধু তেলের বাজার অস্থিতিশীল করেনি, বিশ্বে খাদ্যসংকট ডেকে আনতে পারে, সেই সতর্কতা কিন্তু শুরু থেকেই বিভিন্ন সংস্থা করে চলেছে।
জ্বালানিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বারবার বলে আসছেন, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী তেল মজুত করছেন, কালোবাজারি করছেন। তাঁদের বক্তব্যের সত্যতাও মিলছে—দেশের বিভিন্ন জায়গায় খাটের নিচে, মাটির নিচে তেলের মজুত পাওয়া গেছে। পাম্পগুলো সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছে যে জ্বালানি তেল নেই, অথচ অভিযানে হাজার লিটার তেল পাওয়া গেছে।
এই কালোবাজারিদের সিন্ডিকেট যে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে, সেটা বলাটাই বাহুল্য। এই কালোবাজারি যারা মানুষের জীবন–জীবিকা বিপন্ন করে তুলেছে, তাদের সীমাহীন মুনাফার লোভে, তাদের কজনের জেল–জরিমানা বা শাস্তি হয়েছে; বরং দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত তাদের জন্য বিশাল এক পুরস্কার।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকারি সংস্থা বিপিসি তেলের সরবরাহ বাড়িয়েছে। এ সিদ্ধান্ত নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কি তাহলে নিজেদের মুনাফার স্বার্থেই তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল? জ্বালানি বিক্রি করে সরকার মুনাফা করতে পারে কি না, এই প্রশ্ন বহু পুরোনো। দৈনিক সমকাল–এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এ দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিপিসির বাড়তি আয় হবে ৭৮০ কোটি টাকা।
গত ১১ বছরে বিপিসি তেলের বিক্রি থেকে মুনাফা করেছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে গত দুই মাসে লোকসান হয়েছে চার হাজার কোটি টাকা। বিপিসির বিপুল অঙ্কের মুনাফার টাকা যুদ্ধ, মহামারির মতো আপৎকালীন সময়ে যদি জনগণের কাজে না লাগে, তাহলে সেই মুনাফার অর্থ কী? অথচ এই মুনাফার টাকায় বিপিসির কর্মীদের বছরে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রফিট বোনাস দেওয়া হয়েছে।
মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
মতামত লেখকের নিজস্ব