পুরো দেশটাকেই যদি গোলাপি করা যেত

নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতে প্রস্তুত বিআরটিসির গোলাপি রঙের বিশেষ ‘মহিলা বাস’।ছবি: বিআরটিসির সৌজন্যে

আবারও নারীদের জন্য চালু হয়েছে ‘মহিলা বাস সার্ভিস’। তিন জেলার ১৩টি পথে ১৪টি বাস নিয়ে সম্প্রতি চালু হয়েছে মহিলা বাস সার্ভিস; যাকে পিংক বাস সার্ভিসও বলা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে বাসের সংখ্যা আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি আছে সরকারের দিক থেকে। ১৮ আগস্ট সার্ভিসটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময় নারীরা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন, বাসের ভেতর অস্বস্তিকর পরিবেশের মুখোমুখি হন এবং বাস থেকে নামার পরও নিরাপত্তাঝুঁকিতে থাকেন।

তাঁর কথার সূত্র ধরেই প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়, যদি বাসে ওঠার আগে এবং বাস থেকে নামার পরও নারী যাত্রী নিরাপদ না থাকেন, তাহলে শুধু বাসের ভেতরের সময়টুকু নিরাপদ করে আমরা আসলে কতটা সমাধান করতে পারছি? নারীর নিরাপত্তা কোনো নির্দিষ্ট বাসের দরজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং একজন নারী যখন বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ান, বাসে ওঠেন, যাত্রা করেন, বাস থেকে নামেন এবং গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো পথ অতিক্রম করেন, নিরাপত্তার প্রশ্নটি সেই সমগ্র যাত্রাপথের।

ক্ষমতাসীন সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে ‘শুধুমাত্র নারী যাত্রী’ বাস চালুর কথা বলেছিল, যেখানে ড্রাইভার ও সহকারীও নারী হবেন—এমন প্রতিশ্রুতিও ছিল। সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় সরকার তার প্রতিশ্রুতি পূরণের সূচনা করেছে; বিষয়টি প্রশংসনীয়।

নারীর প্রতি হয়রানি প্রতিরোধে সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টিও প্রতিফলিত হয়েছে উদ্যোগটির মাধ্যমে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, গণপরিবহনে নারীর প্রতি হয়রানি প্রতিরোধে এ ধরনের বিচ্ছিন্ন ও অদূরদর্শী উদ্যোগ আপাত প্রশংসনীয় হলেও সমস্যা সমাধানে তা তেমন কোনো সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে না।

নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিসের কথা উঠলেই আমার মনে একটি অদ্ভুত ছবি ভেসে ওঠে। সেই ছবিতে আমি দেখতে পাই, ‘মহানগর’ নামক এক জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ছুটে চলছে ‘হরিণরূপী’ নারী বহনকারী একটি চলন্ত খাঁচা। খাঁচার বাইরে ‘সিংহরূপী’ পুরুষেরা অপেক্ষমাণ। খাঁচার দরজা সামান্য আলগা হলেই যেন তারা খাঁচার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

ভিড় ঠেলে গণপরিবহনে ওঠা রীতিমতো যুদ্ধ জয়ের মতো নারী যাত্রীদের কাছে।
ছবি: জুয়েল শীল

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যাঁরা নারীর পথচলায় সমস্যার সৃষ্টি করছেন, তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করার বদলে যাঁরা সমস্যার শিকার হচ্ছেন, তাঁদেরই বারবার আলাদা খাঁচায় বন্দী করার চেষ্টা করা হচ্ছে!

অবশ্যই নারীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা প্রয়োজন আছে। কিন্তু নিরাপত্তার নামে নারীকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার মাধ্যমে কি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান হতে পারে? যদি খাঁচার প্রয়োজন হয়, তবে সেটি কেন নারীদের জন্য হবে? খাঁচা তো সেই মানুষগুলোর জন্য প্রয়োজন, যাঁদের আচরণ নারীর চলাচলকে অনিরাপদ করে তোলে।

ঢাকায় নারী বাস সার্ভিস নতুন কোনো ধারণা নয়। বিআরটিসি এর আগেও ১৩টি রুটে ১৭টি নারী বাস চালু করেছিল। ২০১৮ সালের জুন মাসে র‍্যাংগস গ্রুপও রাজধানীতে নারীদের জন্য ‘দোলনচাঁপা’ নামে ১০টি বাস চালু করেছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকারি কিংবা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কেবল নারীদের পরিবহনের চাহিদা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। আবার উদ্যোগগুলো শুরুর সময় যে আয়োজন দেখা যায়, কিছুদিন পরই তা আবার ঝিমিয়ে পড়ে। তাহলে বারবার একই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে কেন আমরা সমস্যার সমাধান খুঁজছি?

নারীকে আলাদা করে নয়, বরং নারী ও পুরুষ উভয়কে বিবেচনায় নিয়েই আমাদের সমাধান খুঁজতে হবে। যে দেশে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীরা হয়রানির ঝুঁকির মুখোমুখি হন, সেখানে সব বাসকে গোলাপি রঙে রাঙালেও হয়রানি থামবে না। এমনকি পুরো বাংলাদেশকে গোলাপি রঙে রাঙিয়ে দিলেও নয়।

যেহেতু নারীর জন্য পৃথক পরিবহনের চাহিদা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব, তাই নারী ও পুরুষের পাশাপাশি চলাচলের মধ্যেই সমাধান খুঁজতে হবে। পৃথিবীর বহু দেশে নারী-পুরুষ একই গণপরিবহনে পাশাপাশি যাতায়াত করেন। তুরস্কে জনাকীর্ণ বাসে নারী-পুরুষকে পাশাপাশি, কখনো ঠাসাঠাসি করে যাতায়াত করতে দেখেছি। সেই সহযাত্রায় হয়রানির ঘটনা চোখে পড়েনি কিংবা বিন্দুমাত্র নিরাপত্তার অভাব অনুভব করিনি। নারীর নিরাপত্তা কখনোই তাঁকে আলাদা করার মাধ্যমে আসে না; বরং সামাজিক আচরণ, আইন, জবাবদিহি এবং নাগরিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে তৈরি হয়।

২০১৭ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছিল, বাংলাদেশে প্রায় ৯৪ শতাংশ নারী গণপরিবহনে কখনো না কখনো যৌন হয়রানির শিকার হন। অন্যদিকে, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ঢাকার প্রায় ২১ শতাংশ নারী প্রতিদিন গণপরিবহন ব্যবহার করেন। এত প্রতিকূলতাকে রোজ পায়ে ঠেলে এগিয়ে যাওয়া দৃঢ়চেতা নারীদের জন্য আলাদা ‘খাঁচা’ তৈরির চেয়ে প্রয়োজন এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে নারী-পুরুষ সবাই নিরাপদে চলতে পারেন। এর জন্য নতুন নতুন গোলাপি বাসের পরিবর্তে প্রয়োজন চলমান বাসগুলোর ব্যবস্থাপনা উন্নত করা। বাসে পর্যাপ্ত আলো, নিরাপদ ওঠানামার ব্যবস্থা, সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বৃদ্ধি, চালক ও সহকারীদের আচরণবিধি ও প্রশিক্ষণ, কার্যকর নজরদারি।

আরও পড়ুন

একই সঙ্গে বাসস্ট্যান্ড ও যাত্রী ওঠানামার স্থানগুলোও নিরাপদ করতে হবে। প্রয়োজন বাস অবকাঠামোর সংশোধন করা, যেন তা অধিকতর নারীবান্ধব হয়ে উঠতে পারে। অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রেও দরকার সরলতা। অসংখ্য হেল্পলাইন নম্বরের ভিড়ে ভুক্তভোগীকে বিভ্রান্ত না করে গণপরিবহনে হয়রানির জন্য একটি সহজে মনে রাখার মতো, কার্যকর ও দ্রুত সাড়া দেয় এমন একটি জাতীয় হেল্পলাইন থাকা জরুরি।

তবে আইন ও অবকাঠামো যতই উন্নত করা হোক না কেন, সমস্যার মূল জায়গাটি অধরাই রয়ে যাবে যদি পুরুষের মানসিকতা না বদলায়। আর সমাজকেও নীরব দর্শকের ভূমিকা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নীরবতা অনেক সময় অপরাধীর সবচেয়ে বড় সহায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। মনে রাখতে হবে, নারীর চলার পথ নিরাপদ রাখা কারও দয়ার দান নয়, বরং এটি নারীর অধিকার।

তাই নারীকে আলাদা করে নয়, বরং নারী ও পুরুষ উভয়কে বিবেচনায় নিয়েই আমাদের সমাধান খুঁজতে হবে। যে দেশে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীরা হয়রানির ঝুঁকির মুখোমুখি হন, সেখানে সব বাসকে গোলাপি রঙে রাঙালেও হয়রানি থামবে না। এমনকি পুরো বাংলাদেশকে গোলাপি রঙে রাঙিয়ে দিলেও নয়।

তাই যদি ধরেও নিই, ‘গোলাপি’ নিরাপত্তা ও নারীবান্ধবতার প্রতীক; তাহলে বাস নয়, সেই রঙে রাঙাতে হবে পুরুষের মন ও মস্তিষ্ককে। একমাত্র সেই মস্তিষ্ক থেকে উৎসারিত চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণই পারে এমন এক সমাজ নির্মাণ করতে, যেখানে নারী নির্ভয়ে পথ চলবেন, কাজ করবেন, ভ্রমণ করবেন। গোলাপি খাঁচায় বন্দী হয়ে নয়, বরং তাঁরা পথ চলবেন সবার সঙ্গে মর্যাদায় ও সমতায়। তাই নারীর নিরাপদ পথচলা নিশ্চিত করতে গোলাপি বাসের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন সুন্দরের আলোয় উদ্ভাসিত রঙিন সুন্দর মন।

  • নিশাত সুলতানা লেখক ও উন্নয়নকর্মী