যুক্তরাষ্ট্র-ইরান: টেকসই শান্তির পথ যেভাবে বের হতে পারে

এ ইলাস্ট্রেশনে প্রতীকী অর্থে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার সামনে দাবার ঘুঁটি রাখা হয়েছেরয়টার্স ফাইল ছবি

ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হওয়াটা খুব অপ্রত্যাশিত ছিল না। কারণ, দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান ছিল গভীর ও মৌলিক। একদিকে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফার প্রস্তাব, অন্যদিকে ইরানের ১০ দফার পাল্টা প্রস্তাব। এত বড় ফারাক নিয়ে অল্প সময়ের আলোচনায় সমঝোতায় পৌঁছানো যে কঠিন, তা আগেই অনুমান করা যাচ্ছিল।

এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি, অর্থাৎ যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি হতে লেগেছিল দুই বছরের বেশি সময়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে ছিলেন মাত্র এক দিনের কম সময়। আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যুর পাশাপাশি আরও বেশ কিছু বিষয় ছিল। সেগুলো নিয়ে এত অল্প সময়ে সমঝোতা আশা করা কঠিনই ছিল।

তবে এখনো কোনো পক্ষই ভবিষ্যৎ আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি; বরং পাকিস্তান ও মিসর পর্দার আড়ালে মধ্যস্থতার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা চেষ্টা করছে দুই পক্ষের অবস্থানের দূরত্ব কমাতে। তবে সমস্যা হলো, এ সংঘাত দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

এখনো একটি কার্যকর সমঝোতা কাঠামো তৈরি করা সম্ভব। এটি যদিও সহজ নয় এবং এর জন্য সব পক্ষকে ছাড় দিতে হবে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রকে স্বীকার করতে হবে যে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার আছে। কারণ, তারা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির সদস্য। তবে এ অধিকার ব্যবহৃত হবে শুধু শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কঠোর নজরদারির অধীন। 

২০১৮ সালে ট্রাম্প যখন আগের চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন, তখন ইরানও আর নিজেকে বাধ্য মনে করেনি। ফলে তারা সমৃদ্ধকরণের সীমা লঙ্ঘন করে। বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কিলোগ্রাম ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, এটি সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হোক।

দ্বিতীয়ত, ইরানকে লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এ অবস্থান ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের আগের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবি করা হয়। ইরান সাধারণত এ নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে থাকে। তবে বর্তমান নেতৃত্ব পরিবর্তনের পরও এই নীতি বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই এ প্রতিশ্রুতিকে আরও শক্ত ভিত্তি দিতে হবে। অন্যদিকে ইসরায়েলকেও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে তারা কখনো ইরানের ওপর পারমাণবিক হামলা করবে না। এ প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের দ্বারা নিশ্চিত করতে হবে। 

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন দরকার। ইরানকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের দাবি থেকে সরে আসতে হবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র তা কখনোই মেনে নেবে না। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করতে হবে।

এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নির্দিষ্ট টোল ধার্য করার প্রস্তাব রয়েছে। প্রতি জাহাজে প্রায় দুই মিলিয়ন ডলার টোল নেওয়া হবে। তবে শর্ত থাকবে, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী নিরপেক্ষ জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। এটি একটি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে, যেখানে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিও যুক্ত থাকবে। এমনকি রাশিয়া ও চীনও এতে অংশ নিতে পারে।

এ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঘিরে একটি যুক্তিও রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো অতীতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। ফলে পুনর্গঠনের ব্যয় নিয়ে ইরানের দাবি অযৌক্তিক নয়। তবে এ টোল ব্যবস্থা স্থায়ী করা যাবে না। নিরপেক্ষ সংস্থা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলে এবং পুনর্গঠনের খরচ পূরণ হলে এই টোল আবার তুলে দিতে হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এ আয়ের একটি অংশ ওমানের সঙ্গে ভাগ করা হবে।

চতুর্থত, দুই দেশের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক অনাক্রমণ চুক্তি করা উচিত। এটি উভয় দেশের আইনসভায় অনুমোদিত হবে এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে। ইরান যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রত্যাহারের দাবি থেকে সরে আসতে পারে, তবু অনাক্রমণ চুক্তি সেই ক্ষতিপূরণ হিসেবে কাজ করবে। একই ধরনের চুক্তি ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও করা যেতে পারে।

এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তিনটি বিষয় অপরিহার্য। প্রথমত, সমঝোতা হতে হবে দুই পক্ষেরই, শুধু ইরানের একতরফা ছাড়ে নয়। দ্বিতীয়ত, ট্রাম্পকে তাঁর নির্ধারিত সময়সীমা বাড়াতে হবে এবং বুঝতে হবে যে এমন জটিল আলোচনায় সময় লাগে। তৃতীয়ত, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলা, যা পুরো প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিতে পারে।

রজন মেনন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইমেরিটাস অধ্যাপক, পাওয়েল স্কুল, সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক

দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, সংক্ষেপিত অনুবাদ