এমপির ছেলেকে পুলিশ ছাড়ল কোন আইনে

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলামের ছেলে খাইরুল ইসলাম সজীবফাইল ছবি

নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রতিক এ ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, সেখানে একজন সংসদ সদস্যের ছেলেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক করার পর জিজ্ঞাসাবাদ করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা রাষ্ট্রের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা, পুলিশের ক্ষমতার প্রয়োগ এবং আইনের শাসনের বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তুলেছে।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলামের ছেলে খাইরুল ইসলাম সজীবের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁ ও কাঁচপুর শিল্পাঞ্চলে একাধিক কারখানা ও পণ্যবাহী যানবাহন থেকে চাঁদা তোলা, ট্রাক আটকে অর্থ আদায় এবং ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, সজীবের দাবিমতো অর্থ না দিলে পণ্যবাহী যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হতো, যা কিনা সরাসরি শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাকে ব্যাহত করে। পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে হেফাজতে নেয় এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল তাঁকে বহিষ্কার করে, যা ঘটনার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে চাঁদাবাজি দণ্ডবিধির অধীনে একটি আমলযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ, যেখানে পুলিশ অভিযোগ পেলে মামলা নিতে বাধ্য। আর তদন্তের স্বার্থে পুলিশ প্রয়োজনে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করবে এটাই স্বাভাবিক পুলিশিং; তবে একবার আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তার কার্যকর হলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা এবং জামিন বা রিমান্ডের সিদ্ধান্ত বিচারিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হওয়া বাধ্যতামূলক। এটাই স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি।

এই কাঠামোর মধ্যে পুলিশের ভূমিকা তদন্ত ও প্রাথমিক আইন প্রয়োগে সীমিত, আর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আদালতের হাতে থাকার কথা। কিন্তু এই ঘটনায় ‘মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া’র প্রক্রিয়া সেই ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কারণ, এটি যদি আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারের পর ঘটে থাকে তাহলে তা বিচারিক তদারকি এড়িয়ে একটি সমান্তরাল নিষ্পত্তির আশঙ্কা তৈরি করে।

আর যদি এটি কেবল জিজ্ঞাসাবাদ বা অনানুষ্ঠানিক আটক হয়, তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায়—কেন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রশাসনিকভাবে একটি গুরুতর আমলযোগ্য অপরাধের সমাধান করা হলো।

অভিযোগ প্রমাণের আগপর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না, কিন্তু একইভাবে আইনের প্রক্রিয়া এড়িয়ে কোনো ‘সমঝোতামূলক মুক্তি’ও আইনের শাসনের বিকল্প হতে পারে না। কারণ, আইনের শাসনের আসল শক্তি কতিপয়ের প্রতি সিলেকটিভ নমনীয়তায় নয়, বরং সবার জন্য সমান ও বিচারিকভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তায়।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি বিচারব্যবস্থার কয়েকটি নীতিগত রেফারেন্স গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বেইল বা জামিনের মৌলিক নীতি সুপ্রিম কোর্টের একাধিক সিদ্ধান্তে স্পষ্ট করা হয়েছে যে জামিনের মূল উদ্দেশ্য হলো বিচারাধীন অবস্থায় ব্যক্তিকে আদালতের তত্ত্বাবধানে মুক্ত রাখা; অর্থাৎ জামিন কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিচারিক নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রক্রিয়া।

দ্বিতীয়ত, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী গ্রেপ্তারের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা বাধ্যতামূলক, এবং আদালতই নির্ধারণ করেন জামিন, রিমান্ড বা আটক অব্যাহত থাকবে কি না। এই কাঠামো বিচারিক তদারকির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তৃতীয়ত, সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে বলা হয়েছে, বিচারিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া দীর্ঘ বা অনির্ধারিত হেফাজত বা প্রশাসনিকভাবে ‘মুক্তি’ দেওয়া হলে তা আরবিট্রারি এক্সারসাইজ অব পাওয়ার (ক্ষমতার স্বেচ্ছাচারী ব্যবহার) হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

বাংলাদেশের বিচারিক বাস্তবতায় রাজনৈতিক বা হাই প্রোফাইল মামলায় বেইল ও তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়ে বহু বিতর্ক দেখা গেছে। যেমন ২০০৭ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উচ্চপর্যায়ের একাধিক চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির মামলায় আদালতের বেইল-রিভিউ এবং স্থগিতাদেশ আমাদের দেখিয়েছে, গুরুতর অভিযোগে বিচারিক নজরদারি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

এসব নজিরের মূল বার্তা একটাই—গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগে সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব আদালতের, পুলিশের নয়।

এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক প্রশ্ন হলো—পুলিশি ক্ষমতা বিচারিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে ‘রাজনৈতিক সমাধান’ তৈরি করছে কি না। আধুনিক ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় পুলিশের ভূমিকা তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আদালতে উপস্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ; কিন্তু যখন ‘মুচলেকা’, ‘অনানুষ্ঠানিক মুক্তি’ বা ‘রাজনৈতিক-প্রশাসনিক নিষ্পত্তি’র মতো পদ্ধতি একটি আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, তখন তা যথাযথ প্রক্রিয়ার ধারণাকে দুর্বল করে দেয়।

অন্যদিকে, পুলিশের পক্ষ থেকে অনেক সময় যুক্তি হিসেবে বলা হয় যে অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, তথ্য যাচাই বা সংঘাত এড়ানোর জন্য পুলিশ কিছু নমনীয় পদ্ধতি গ্রহণ করে। কিন্তু এই নমনীয়তা যদি বিচারিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে একটি বিকল্প বিচারব্যবস্থা তৈরি করে, তাহলে তা আইনের শাসনের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, তখন আইন আর সবার জন্য সমান প্রক্রিয়া থাকে না, বরং পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

সবশেষে, এ ঘটনাটি আবারও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে। তা হলো—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ কি প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতার (প্রসিডিউরাল ফেয়ারনেস) মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি প্রশাসনিক সুবিধার ভিত্তিতে পরিবর্তনশীল?

অভিযোগ প্রমাণের আগপর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না, কিন্তু একইভাবে আইনের প্রক্রিয়া এড়িয়ে কোনো ‘সমঝোতামূলক মুক্তি’ও আইনের শাসনের বিকল্প হতে পারে না। কারণ, আইনের শাসনের আসল শক্তি কতিপয়ের প্রতি সিলেকটিভ নমনীয়তায় নয়, বরং সবার জন্য সমান ও বিচারিকভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তায়।

  • শামস নাজিব প্রথম আলোর সিনিয়র লিগ্যাল অফিসার
    মতামত লেখকের নিজস্ব