এই সংকটের সময় ক্যাম্পাস কেন উত্তপ্ত

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে ডাকসু নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকটে ভুগছে গোটা দেশ। সরকার তেলের দাম বাড়াতে না চাইলেও শেষ পর্যন্ত না বাড়িয়ে থাকতে পারেনি। জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহনের ভাড়াও বেড়ে গিয়ে জনজীবনে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। চড়া দ্রব্যমূল্য আরও বেড়ে গেছে।

পাম্পে পাম্পে তেলের জন্য গাড়ির লাইন এখনো। সেচের জন্য জ্বালানির অভাবে ধুঁকছেন কৃষক। জ্বালানির অভাবে শুরু হয়েছে লোডশেডিংও। এসএসসি পরীক্ষাদের অবস্থা নাকাল। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করতে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি সার কারখানা। অন্যদিকে হামের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত শিশু হাসপাতালগুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে। পর্যাপ্ত আইসিইউ–সুবিধা না পেয়ে একের পর এক শিশু মারা যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো যদি উত্তপ্ত হতে থাকে, তাতে কার লাভ? অর্থনৈতিক, জ্বালানি, স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নানা সংকট ও চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু এখন ছাত্রদল-শিবিরের সংঘর্ষ।

সংসদে সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদ, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ রহিত বা বাতিলের তর্কবিতর্ক নিয়ে মানুষ বিরক্ত। সংস্কার প্রশ্নে সরকারি দলের কার্যক্রম বা মনোভাব নিয়ে নাগরিক সমাজে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বসার জায়গা ও সরকারি গাড়ির দাবি তুলেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা, তা নিয়েও চলছে সমালোচনা।

জনজীবনে বিবিধ সংকট ছাত্র-যুবসমাজকে কতটা স্পর্শ করছে? সরকারি দল ও বিরোধী দলের ছাত্রসংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে শাহবাগ থানার ভেতরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ডাকসু নেতৃত্ববৃন্দ ও সাংবাদিক সমিতির সদস্যরা ছাত্রদলের হামলার শিকার হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মেয়েকে নিয়ে বিকৃত ও কুরুচিপূর্ণ এআই জেনারেটেড ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে এ হামলার ঘটনা ঘটে।

এমন কুরুচিপূর্ণ ছবি যে-ই তৈরি বা ছড়িয়ে থাকুক, ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান থাকলে কারও পক্ষেই এটি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। স্বাভাবিকভাবে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। এ কারণে গত বুধবার রাত থেকে ওই এআই জেনারেটেড ছবি নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে থাকে। ডাকসুর শিবির প্যানেলের এক নেতাই এ অশ্লীল ছবি ছড়িয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই শিবির নেতা শাহবাগ থানায় নিজের নিরাপত্তার জন্য ও নিজের নামে ভুয়া ছবি ছড়ানোর অভিযোগ দায়ের করতে যান। সেখানেই হামলার ঘটনা ঘটে।

ডাকসুর দুই নেতা এ বি জোবায়ের ও মোসাদ্দেক আলী বরাবরের মতোই ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে শাহবাগ থানায় ছুটে গিয়েছিলেন আক্রান্ত শিবির নেতার পাশে দাঁড়াতে। কিন্তু আগে সেখানে তাঁরা যেমন ক্ষমতাচর্চা, মব বা মাস্তানি করতেন, এবার তাঁরা নিজেরাই এর শিকার হলেন। এই দুই ছাত্রনেতা ক্যাম্পাসে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মবস্টার’ হিসেবে পরিচিত। তাঁরা নিজেরাও নিজেদের ‘মবস্টার’ বলে স্যাটেয়ার করতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না।

হামলায় আহত এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিক আলী। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৯টার দিকে
ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হকারদের উচ্ছেদ, মাদকবিরোধী অভিযানের নামে লাঠি হাতে জনতার ওপর চড়াও হওয়া, ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর কারণে এক ছাত্রী সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিকে হেনস্তা ইত্যাদির ঘটনায়ও তাঁরা সক্রিয় ছিলেন। এতে নাগরিক সমাজের অনেকে তাঁদের প্রতি ক্ষুব্ধ। ফলে তাঁরা যখন গতকাল হামলার শিকার হলেন, বিষয়টিকে অনেকে ‘ন্যায্য’ মনে করেছেন। নিউটনের তৃতীয় সূত্রের উত্তম প্রয়োগ হিসেবেও দেখলেন অনেকে।

সমস্যা হচ্ছে, এতে আরেকটি সংকট তৈরির পথ নির্মাণ হয়। থানার ভেতরে গিয়ে এভাবে হামলার ঘটনার ন্যায্যতা দেওয়াটা ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় অন্যায্যতার প্রেক্ষাপটই তৈরি করে। তা ছাড়া থানার ভেতরেও যদি এমন নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, তা দেশের আইনশৃঙ্খলা ও আইনের শাসনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকাও এখানে হতাশাজনক।

ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ এখনো শিবিরের হাতেই বলতে হবে। ফলে একটি কুরুচিপূর্ণ এআই ছবি ছাত্রদলকে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণে শক্তিপ্রয়োগের একটা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল বটে, কিন্তু এ কুরুচিপূর্ণ ছবি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার হামলার ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগেই ফ্যাক্টচেক করে দেখায় যে যার বিরুদ্ধে এ ছবি পোস্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সত্য নয়।

এই ফ্যাক্টচেকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরালও হয়। এরপরও হামলার ঘটনায় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছাত্রদল কেন ব্যর্থ হলো? নাকি তাঁরা ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতাচর্চার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি?

এর আগে গত কয়েক দিনে তিনটি কলেজে দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার সূত্রপাত চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে। প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখানে ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’ লেখা একটি দেয়ালিকায় ‘ছাত্ররাজনীতি’ শব্দ থেকে ‘ছাত্র’ বাদ দিয়ে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখার কারণে ছাত্রদল ও শিবির সংঘর্ষে জড়ায়। এ ঘটনার জেরে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

‘গুপ্ত’ শব্দের কারণে শিবির কেন ক্ষুব্ধ হলো? ক্যাম্পাসগুলোয় ছাত্রলীগের ভেতরে শিবিরের নেতা-কর্মীদের আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি জুলাই অভ্যুত্থানের পর সামনে আসে। শিবিরের দাবি, সে সময় নিরাপত্তার কারণেই এই কৌশল বেছে নিতে হয়েছিল তাদের। এতে এ প্রশ্নও ওঠে, ছাত্রলীগের ভেতরে থেকে ছাত্রলীগের অপকর্মের ভাগীদারও কেন তারা হবে না?

চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ঘটনায় কিরিচ হাতে ছাত্রদল নেতা। লাঠি হাতে জামায়াতের সমর্থক।
ছবি: প্রথম আলো

চব্বিশের পর গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিসর উন্মুক্ত হওয়ার পরও ক্যাম্পাসে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’র ব্যানারে শিবিরের গুপ্ত রাজনীতির কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ, অনেক ক্যাম্পাসে বা হলে হলে সরাসরি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও গুপ্ত রাজনীতির কারণে ঠিকই রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে শিবির।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদে সাফল্যের পেছনে অনেকগুলো কারণের মধ্যে শিবিরের গুপ্ত রাজনীতির কৌশল কাজ করেছে বলে অনেকে মনে করে থাকেন। কিন্তু এতে সাধারণ অনেক শিক্ষার্থীও গুপ্ত হিসেবে সন্দেহের মুখে পড়ছেন। পাশাপাশি ছাত্রদলের বিভিন্ন কমিটিতে গুপ্তভাবে শিবিরের নেতা-কর্মী থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যার ফলে ছাত্রদলের ভেতরে নিজেদের দলের নেতা-কর্মীদের ‘গুপ্ত’ ট্যাগ দেওয়ার নমুনাও দেখা গেছে।

ছাত্রশিবির যখন সহিংস কার্যক্রমে জড়ায়, তখন তাদের ‘ভালোমানুষি’র রাজনৈতিক চেহারার আড়ালে অতীতের ক্যাম্পাস রাজনীতির রক্তাক্ত ইতিহাসই সামনে চলে আসে। আর ছাত্রদলের মধ্যে তখন অনেকে দেখতে পায় ছাত্রলীগের ছায়া। ক্যাম্পাসের একক নিয়ন্ত্রণ ছাত্রদলের হাতে গেলে তাদের ছাত্রলীগের মতো কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারার আশঙ্কাও কিন্তু ছাত্র সংসদগুলোয় শিবিরের জয়ের পেছনে একটি কারণ ছিল।

আরেকটি আলোচনা তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে, শিবির গুপ্ত রাজনীতি চালিয়ে গেলে তাদের মোকাবিলায় পাল্টা গুপ্ত রাজনীতিও তৈরি হবে। মানে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা মিশে যেতে থাকবেন ছাত্রদলের মধ্যে। এতে ছাত্রদলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এ ছাড়া ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম গতকালের ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমে যে বক্তব্য দেন, তাতে এ–ও স্পষ্ট, শিবিরের গুপ্ত রাজনীতি অব্যাহত থাকলে এ ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি আরও ঘটতে থাকবে। তাঁর দাবি, শিবিরকে গুপ্ত রাজনীতি পরিহার করে প্রকাশ্য রাজনীতিতেই মনোযোগ দিতে হবে।

কেউ কেউ মনে করতে পারেন, দেশের ক্যাম্পাসগুলো উত্তপ্ত হলে জনজীবনের বিপর্যস্ততা থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে রাখতে পারলে তো সরকার বা আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের সুবিধাই হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এমন মনোভাব থাকলে তারা জনপ্রিয়তা হারাতে থাকবে, আর বিরোধী দলের প্রতি সমর্থন কমবে বৈ বাড়বে না। সবচেয়ে বড় কথা, গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি হিসেবে উভয় ছাত্রসংগঠন যখন ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণে সংঘর্ষে জড়ায়, তাতে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাই সবার আগে ধাক্কা খায়।

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের ফটকে
ছবি: সংগৃহীত

দেরিতে হলেও জ্বালানিসংকট নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে যৌথ কমিটি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে সংসদে। পাশাপাশি সংসদে পানিসম্পদমন্ত্রী ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, জ্বালানিসংকটের মতোই ছাত্ররাজনীতি নিয়েও সংসদে আলোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘দেশের যে ছাত্ররাজনীতি চলছে, তা নিয়ে সংসদে গভীর আলোচনা তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ, এখনো যে ছাত্ররাজনীতি; দু-তিন দিন যাবৎ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এ প্রজন্ম তা পছন্দ করে না। ফ্যাসিস্টের ধারাবাহিকতায় চাপাতি, অস্ত্র, রামদা, হকিস্টিক নিয়ে...৫ আগস্টের পর সেই ছাত্ররাজনীতি থাকবে, ছাত্ররাজনীতির ময়দানটাকে কলুষিত করা হবে...।’

একসময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা হিসেবে সংসদে সঠিক সময়ে যথার্থ বক্তব্য ও প্রস্তাব দিয়েছেন শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। সংসদে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আলোচনা হোক। সব দল তাদের নিজ নিজ ছাত্রসংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখুক। আমাদের ক্যাম্পাসগুলো শান্তিপূর্ণ ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় থাকুক, যাতে আমরা জনজীবনের প্রকৃত সংকটগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে পারি।

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই–মেইল: [email protected]

মতামত লেখকের নিজস্ব