ব্যবসার জন্য বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির বন্ধ দুয়ার দৃশ্যত আবার উন্মুক্ত হওয়ায় উৎসাহ দেখাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে অবস্থান পাল্টে চীনের ব্যবসাবান্ধব হওয়াটা নিশ্চিতভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য শুভ বার্তা। তবে চীনা অর্থনীতিকে সঠিক জায়গায় ফেরাতে সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে দরকার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রকৃত মত দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি। আমি আমার হাউ চায়না এসকেপড দ্য পোভার্টি ট্র্যাপ বইয়ে লিখেছি, এ ধরনের বৈশিষ্ট্য দেং জিয়াও পিংয়ের আমলে চীনের বিখ্যাত নমনীয় শাসনপদ্ধতির নির্ধারক হয়ে উঠেছিল।

প্রচলিত ভুল হলো ‘চীনা মডেল’ মানে বিশালাকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় প্রভাবশালী, কর্তৃত্ববাদী সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্য। আসলে মাও সে–তুংয়ের অধীন ৩০ বছরের দারিদ্র্য ও দুর্ভোগ এটাই প্রমাণ করে যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা, রাষ্ট্রীয় মালিকানা এবং রাজনৈতিক নিপীড়ন ছিল ব্যর্থতার রেসিপি। এ কারণে দেং জিয়াও পিং ভেতরে–ভেতরে একটি হাইব্রিড ব্যবস্থা চালু করেন, যাকে আমি বলি ‘নিয়ন্ত্রিত উদ্ভাবন’। এর মানে হলো সিপিসি ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকার চীনজুড়ে অসংখ্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে কর্তৃত্ব ছেড়ে দিয়েছে এবং একই সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত রেখেছে।

এ পদ্ধতিতে একনায়ক না হয়ে পরিচালকের ভূমিকায় বেইজিংভিত্তিক কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় লক্ষ্যগুলো ঠিক করার পাশাপাশি যথাযথ প্রণোদনা ও নিয়ম প্রবর্তন করেছে। অন্যদিকে অধস্তন বিভিন্ন সংস্থা ও বেসরকারি খাতের চালকের আসনে থাকা ব্যক্তিরা স্থানীয় সমস্যার স্থানীয় সমাধান বের করেছে। বাস্তবে অনেক ধরনের স্থানীয় চীনা মডেলের আবির্ভাব হয়, যার মধ্য দিয়ে প্রান্তিক পর্যায় থেকে প্রায়ই এমন রূপান্তরকারীর উদ্ভাবন হয়েছে, যা তাক লাগিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারকে। এর উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা যায় ডিজিটাল অর্থনীতির উত্থানকে।

দলকে সঙ্গে নিয়ে সি চিন পিং মহামারিকে পেছনে ফেলে ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থা ফেরাতে চাইছেন। অর্থনৈতিক কড়াকড়ির পাশাপাশি মহামারি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শিথিল করায় পুঁজিবাজার চাঙা হয়েছে। উপরন্তু করোনা সংক্রমণ চূড়ায় ওঠার মধ্য দিয়ে দেশি ভোক্তাদের ব্যয় বাড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে (চীনে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার পরপরই ফ্লাইট বুকিং কয়েক গুণ বেড়েছে)। একই সঙ্গে শিল্পোৎপাদন ও পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কেন্দ্রীয় সরকার অবকাঠামোয় বাড়তি ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে নতুন অর্থনৈতিক পথপরিক্রমায় দীর্ঘ মেয়াদে সুফল পেতে সির উচিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মত দেওয়ার পথগুলো ফের খুলে দেওয়া। এর অর্থ হলো ব্যক্তিগত নজির দেখিয়ে দল ও রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কাছে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া যে তিনি প্রকৃত অর্থেই তাঁদের কাছ থেকে তৃণমূলের বাস্তবতা জানতে চান। সত্যবাদীদের মুখ বন্ধ করে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো ব্যক্তিদের উচ্চাসন দিলে কার্যত সেটি সম্ভব হবে না।

সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমকে আরও জায়গা করে দেওয়া উচিত সরকারের। বাক্‌স্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরে সিপিসির ক্ষমতা পোক্ত করার চিন্তা অদূরদর্শী ও শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী। নীতিগত বিষয়ে মত দেওয়ার নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া শাসনব্যবস্থা ‍ধুঁকবে, যার মধ্য দিয়ে গত বছরের নভেম্বরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া গণবিক্ষোভের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

  • ইউয়েন ইউয়েন আং যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক ও লেখক