গবেষণাভিত্তিক নীতি প্রণয়নে দলগুলোর অবস্থান কী

বিশেষজ্ঞরা উন্নয়নসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর জন্য গবেষণাভিত্তিক পলিসি বা নীতি প্রণয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বৈশ্বিক পরিসরে উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন গবেষকের কাজ থেকে আমরা জানতে পারি যে গবেষণাভিত্তিক নীতি তৈরি করতে পারলে তার সম্ভাব্য কার্যকারিতা ও প্রভাব পরিমাপও সহজ হয়।

যদিও আমরা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নীতিনির্ধারণে গবেষণা তথা প্রমাণভিত্তিক বা তথ্য-উপাত্তভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রচলন খুব একটা দেখতে পাই না। নীতি প্রণয়নে গবেষণাহীনতার সংস্কৃতিতে আমাদের রাজনৈতিক পরিসরে একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক তথা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানের চিন্তাভাবনাই যেন অধিক গুরুত্ব পায়, যা আমরা বিগত সময়জুড়ে দেখে এসেছি।

এমন একটি প্রেক্ষাপটে, নির্বাচনের ঠিক আগে আমরা দেখি যে বড় রাজনৈতিক দলগুলো পলিসি নিয়ে জাতীয় পরিসরে আলাপ–আলোচনা শুরু করেছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের দুটি বড় দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশ গঠনে তাদের পলিসি জনসমক্ষে তুলে ধরেছে।

এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের পলিসি ভাবনা আসলে জামায়াতে ইসলামীর পলিসি ভাবনার সঙ্গেই আত্তীকরণ হতে পারে। তবে এনসিপি তাদের পলিসি ভাবনা কতটা জামায়াতে ইসলামীর পলিসির সঙ্গে সমন্বয় করতে পারবে, সেটি এখনো নিশ্চিত করে বোঝা যাচ্ছে না।

এই দলগুলো ছাড়া অন্য দলগুলো কী ধরনের পলিসি নিয়ে আসছে, তা নিয়ে খুব একটা আলোচনা না হলেও বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক ধারায় পলিসি নিয়ে আলাপের যে নতুন সংস্কৃতি শুরু হলো, সেটি প্রশংসার দাবিদার। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাষ্ট্রীয় পরিসরে পলিসি নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।

এই চর্চা বাংলাদেশে একদমই দেখা যায় না। তবে কিছু ক্ষেত্রে আমরা দেখি, বিভিন্ন এনজিও নানা সময় বিশেষ করে জাতীয় বাজেট প্রণয়নের আগে বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পরামর্শমূলক সংলাপ ও সভা করে থাকে। তবে তাদের সেই আলোচনার কতটা সত্যিকার অর্থে জাতীয় পলিসিতে যুক্ত হয় তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে নির্বাচনের আগে পলিসি নির্ধারণে জনগণের অংশগ্রহণ, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ইতিবাচক বদল নিয়ে আসতে পারে, ঠিক তেমনি একটি প্রচেষ্টা আমরা বিএনপির সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণায় দেখতে পাই।

বাংলাদেশকে গড়ে তোলার সেই সুযোগ এখন রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে রয়েছে। আমরা আশা করব, পলিসিভিত্তিক রাজনীতির প্রচলনের মধ্য দিয়ে সেই সুযোগের যথাযথ বাস্তবায়ন তারা করবে

‘চিঠি লিখুন তারেক রহমানকে’, ‘তারেক রহমানকে পরামর্শ দিন’, ‘ম্যাচ মাই পলিসি’ নামক পলিসি প্রচারণা তারা শুরু করেছে, যেখানে চিঠি থেকে শুরু করে ওয়েব কিংবা মোবাইল অ্যাপের ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া তরুণদের সঙ্গে তারেক রহমানের পলিসি নিয়ে পরামর্শমূলক আলোচনা ‘দ্য প্ল্যান: ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’–এর মধ্য দিয়ে তরুণদের পলিসি ভাবনাও বিএনপির সমন্বিত পলিসিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করবে।

এভাবে দেশের জনগণ নির্বাচনের আগে পলিসি নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে জাতীয় পলিসিতে ভূমিকা রাখতে পারবে। জনগণের দেওয়া এসব পরামর্শ যদি কর্তাব্যক্তিরা যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করে তাঁদের পলিসির সঙ্গে সমন্বয় ঘটান, সেটি হবে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

এভাবে অংশীদারত্বের মাধ্যমে রচিত ও গৃহীত পলিসিগুলোর টেকসই হওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে অনেক গুণ। তবে এটি যেন তাদের রাজনৈতিক কৌশলজনিত চমকের অংশ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থেকে জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে হবে। আর তা করা যাবে কেবল তাঁদের প্রতিশ্রুত পলিসির বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

বিএনপির পলিসি নিয়ে এ ধরনের প্রচেষ্টার ফলেই আমরা দেখি, তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনের দিন তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ‘আই/উই হ্যাভ আ প্ল্যান।’ দলের ভেতরের ও বাইরের বিশেষজ্ঞ দলের প্রণীত বিস্তারিত পলিসির কারণেই একজন রাজনৈতিক দলের প্রধান এতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এমন বক্তব্য দিতে পারেন। তবে আমাদের এমন একটা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো জবাবদিহির আওতায় থাকে।

ফলে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুত পলিসি সত্যিকার অর্থেই বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা হাতে নেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বিগত সময়ের ইশতেহারগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেশির ভাগই নির্বাচনের পর অবাস্তবায়িত থেকে যায়, যা আদতে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে না।

নির্বাচনী ইশতেহারে নানা চটকদার উন্নয়নের বয়ান থেকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে, যেন জনবান্ধব উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা আর কখনো উপেক্ষিত না হয়। কেবল একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাই যেন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য না হয়। আমরা বিগত সময়ে দেখেছি, শোষণমূলক একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার কারণে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া দেখি নানা মেগা প্রকল্পের পাহাড়সম দুর্নীতির মাধ্যমে। তাই এ ধরনের শোষণমূলক ব্যবস্থা যেন ভবিষ্যতে তৈরি না হয়, সেদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে নজর রাখতে হবে।

আমরা দেখেছি, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না করার কারণে জনগণের সঙ্গে সরকারের বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মধ্যকার আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব গড়ে ওঠে। আমরা চাইব না, এবারও সেটি হোক। একটি জ্ঞানভিত্তিক মহাপরিকল্পনার রূপরেখা যদি কোনো দল আমাদের সামনে তুলে ধরতে পারে, তাহলে জনগণও কিছুটা হলে আশ্বস্ত হবে।

কেননা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের একটি দীর্ঘ আস্থাহীনতা গড়ে উঠেছে শোষণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে, যেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয় আনুগত্যই ছিল সেবা ও সুবিধা পাওয়ার প্রধান মানদণ্ড। তাই জনগণকে আশ্বস্ত করার একমাত্র উপায় হলো বাস্তব ও গণমুখী উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি, যা দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকবে। এতে দেশের উন্নয়নের সম্ভাবনা বেড়ে যায় অনেক গুণে।

বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে তাদের কৌশলগত পলিসির মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন করা, যেন বাংলাদেশকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, মানবিক ও ন্যায়ের রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা যায়। বাংলাদেশকে গড়ে তোলার সেই সুযোগ এখন রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে রয়েছে। আমরা আশা করব, পলিসিভিত্তিক রাজনীতির প্রচলনের মধ্য দিয়ে সেই সুযোগের যথাযথ বাস্তবায়ন তারা করবে।

  • বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

    মতামত লেখকের নিজস্ব