এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর কয়েকটি শিরোনাম আমাদের বিবেককে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো: ‘আখ খাওয়ানোর কথা বলে ৫ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ’, ‘দশমিনায় ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক আটক’, ‘শিশু ধর্ষণের অভিযোগে বৃদ্ধের বিরুদ্ধে মামলা’, ‘স্কুলের তালাবদ্ধ রুমে মুখে টেপ, হাত-পা বাঁধা শিশু’। বছরজুড়েই এ ধরনের খবর যেন খুব স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এসব কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের সমাজের এক নির্মম ও অস্বস্তিকর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
শিশু যৌন নির্যাতন এক নীরব মহামারি। ইউনিসেফ জানাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি আটজন মেয়ে এবং নারীর একজন ১৮ বছর বয়সের আগেই ধর্ষণ অথবা যৌন হয়রানির শিকার হয়। বাংলাদেশে এর প্রকৃত চিত্র বোঝার উপায় নেই। কারণ, অধিকাংশ ঘটনা অজানা থেকে যায়। ভয়, লজ্জা, সামাজিক চাপ—এই নীরবতার সংস্কৃতি অপরাধীদের রক্ষা করে এবং শিশুদের আরও ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়।
গবেষণা ও অভিজ্ঞতা বলছে, ছেলে ও মেয়েশিশু উভয়ই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। নারী ও পুরুষ এই অপরাধে জড়িত থাকতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে বড় বয়সী শিশুরাও ছোটদের ওপর নির্যাতন চালায়। গ্রাম কিংবা শহরের যেকোনো সামাজিক অবস্থান এবং যেকোনো বয়সের শিশুরা নিপীড়নের শিকার হতে পারে। তবে প্রতিবন্ধী শিশু, কর্মজীবী শিশু, পথে বসবাসকারী শিশুসহ বেশ কিছু শিশু তাদের অবস্থার কারণে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়ন নানাভাবে ঘটতে পারে—অবাঞ্ছিত স্পর্শ থেকে শুরু করে ধর্ষণ পর্যন্ত।
শিশুদের জীবনে যৌন নির্যাতনের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী এবং বহুমাত্রিক, যা তার মানসিক ও সামাজিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর মধ্যে পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার এবং হতাশা, মাদকাসক্তি, আত্মহত্যার চিন্তা এবং চেষ্টা, অন্তরঙ্গ সম্পর্কে সমস্যা, আত্মবিধ্বংসী আচরণ, বিষণ্নতা, রাগ, সহিংসতা, লেখাপড়া এবং পেশাগত জীবনে অসফল হওয়া উল্লেখযোগ্য।
শিশু যৌন নির্যাতন কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় সংকট। আমরা যদি এখনই নীরবতা ভেঙে দৃঢ় অবস্থান না নিই, তবে প্রতিটি বিলম্ব আরেকটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেবে। শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার
বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, নানাভাবে শিশুরা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যেমন স্বর্ণের আংটি, চকলেট, টাকা, আম, বিস্কুট ইত্যাদির প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ; মিথ্যা সাহায্য করার আশা দিয়ে ধর্ষণ (পথে সামনে এগিয়ে দেওয়া, কোনো টাকা পাইয়ে দেওয়া, কাজের সুযোগ); প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ধর্ষণ (প্রেমিক কিংবা বখাটে দ্বারা ধর্ষণ)। বাড়িতে একা পেলেই ধর্ষণ, কোনো উৎসবের আমোদ–ফুর্তি করতে দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো ঘটনাও আছে।
যৌন নির্যাতনের অনেক ঘটনা ভুক্তভোগীর নিজের ঘরে, অপরাধীর বাসায়, নির্জন মাঠ, দোকান বা পরিত্যক্ত ভবনে ঘটেছে। এ ছাড়া স্কুল ও মাদ্রাসাতেও বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট কর্মীরা অপরাধে জড়িত ছিলেন। যখন ঘরে কেউ ছিল না কিংবা পথে–ঘাটে শিশুটি একা ছিল, তখন শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। মা-বাবা সাধারণত সন্তানদের অপরিচিতদের বিষয়ে সাবধান করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ অপরাধীই কোনো না কোনোভাবে শিশুর পূর্বপরিচিত। যেমন প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক, দোকানদার এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি অপরাধীদের তালিকায় প্রধান।
অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায় না। বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ, জটিল এবং শিশুসংবেদনশীল নয়। প্রভাবশালী অপরাধীরা ভুক্তভোগীর পরিবারের ওপর আপসের জন্য চাপ তৈরি করে। ফলে ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না। এটি কেবল বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা নয়, এটি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতা। শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন; এতে নিজস্ব অবস্থান থেকে সবার অংশগ্রহণ করা জরুরি।
পরিবারকে দায়িত্ব নিতে হবে। মা-বাবা এমনভাবে সন্তানদের তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা করবেন, যাতে তারা কোনো ঝুঁকির মুখোমুখি না হয়। তারা শিশুদের ভালো ও মন্দ স্পর্শের পার্থক্য শেখাবেন। পাশাপাশি এটাও শিশুকে বুঝিয়ে বলতে হবে যে কেউ যদি তার সঙ্গে এমন আচরণ করে, যাতে সে অস্বস্তিবোধ করে, তাহলে সে ‘না’ বলতে পারে—এমনকি সেই ব্যক্তি যদি শিশুর কাছের কেউ হয়, তবু। এটাও বলা প্রয়োজন যে এমন কিছু ঘটলে শিশুরা বড়দের জানাবে। শিশুটি কোনো ব্যক্তিকে এড়িয়ে চললে মা-বাবাকে তার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করতে হবে এবং কোনোভাবেই শিশুটিকে সেই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বাধ্য করা যাবে না। শিশুরা যখন নির্যাতিত হওয়ার কোনো ঘটনা জানাবে, তখন মা-বাবাকে মনোযোগ দিয়ে শুনে তার জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। তথাকথিত পারিবারিক সম্মানের কথা না ভেবে, বিষয়টিকে গোপন না করে দোষীর বিচারের ব্যবস্থা করা আবশ্যক।
বিচারব্যবস্থা দ্রুত, কার্যকর এবং শিশু সংবেদনশীল হতে হবে। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্যাতিত শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সহায়তা, আইনি সেবা এবং পুনর্বাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।
শিশু আইন, ২০১৩-এর আলোকে শিশু সুরক্ষাব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে পর্যাপ্ত বাজেট, দক্ষ জনবল এবং নারী ও শিশু, স্বাস্থ্য, সমাজসেবা, শিক্ষা, আইন ইত্যাদি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করা অপরিহার্য। ধর্ষণের সংজ্ঞায় ছেলেশিশুদের অন্তর্ভুক্ত করে তাদের জন্য আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের সঙ্গে কাজ করে এমন সব প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বিভিন্ন কেস শেষ পর্যন্ত ফলোআপ করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও জোরদার করা দরকার। শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে সমাজের সবার সচেতনতা বাড়াতেও গণমাধ্যমের ভূমিকা রাখা উচিত।
শিশুরা যাতে নিজেদের সুরক্ষায় করণীয় বিষয়ে জানে এবং প্রয়োজনে সহায়তা চাইতে পারে, তা নিয়ে তাদের সচেতন করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে পরীক্ষামূলকভাবে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীকে সচেতন করার উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। দ্রুত এই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
শিশু যৌন নির্যাতন কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় সংকট। আমরা যদি এখনই নীরবতা ভেঙে দৃঢ় অবস্থান না নিই, তবে প্রতিটি বিলম্ব আরেকটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেবে। শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করছেন কি?
লায়লা খন্দকার উন্নয়নকর্মী
