যে কারণে নতুন বন্ধু খুঁজছেন জার্মান চ্যান্সেলর

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। ফাইলছবি: রয়টার্স

তুষারময় শীতকে পেছনে ফেলে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস দুই দিনের সফরে ভারতে গেছেন। সফর শুরুর দিনেই তিনি জানিয়েছেন, জার্মানি ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। দুই দেশের লক্ষ্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও শক্তিশালী করা। তবে প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী ও একমুখী পররাষ্ট্রনীতিই কি তার পুরোনো মিত্রদের নতুন বন্ধু খুঁজতে বাধ্য করছে?

জার্মানির গণমাধ্যমগুলো এই সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে। ইউরোপের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে জার্মানি যখন একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় জার্মান চ্যান্সেলরের ভারত সফর স্পষ্টতই গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে।

এই সফরের কয়েক দিন আগেই, ৮ জানুয়ারি, জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার বার্লিনে তাঁর ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এক সিম্পোজিয়ামে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে পরিচালিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, বিশ্ব যেন ‘লুটেরাদের আড্ডায়’ পরিণত না হয়। বিশ্বব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান ভাঙনের দিকে নীরব দর্শক হয়ে না থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ব্রাজিল ও ভারতের মতো দেশগুলোকে বিশ্বব্যবস্থা রক্ষায় এগিয়ে আসতে রাজি করাতে হবে।

জার্মানির প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যের সুর ধরেই ভারত সফররত চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, ভারত যেন কৌশলগত ক্ষেত্রে কেবল রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, জার্মানি ভারতের সঙ্গে সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী।

জার্মানি সরকারের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এই সফরকে বার্লিন বিশেষ সম্মানের নিদর্শন হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে ভারত সরকারও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করেছে যে চ্যান্সেলর তাঁর প্রথম এশিয়া সফরে চীনকে অগ্রাধিকার না দিয়ে আগে ভারতে এসেছেন। যদিও আগামী ফেব্রুয়ারিতে তাঁর চীন সফরের কথা রয়েছে, তবু ভারত সফরের রাজনৈতিক তাৎপর্য দিল্লির কাছে পরিষ্কার বলে মনে করা হচ্ছে।

সফরের শুরুতে চ্যান্সেলর সরাসরি রাজধানী নয়াদিল্লিতে না গিয়ে গেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাটে। মোদির আমন্ত্রণে সেখানে তিনি একটি ঘুড়ি উৎসবে অংশ নেন এবং ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা মহাত্মা গান্ধীর একটি স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করেন। রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি এই সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী কর্মসূচিকে সম্পর্কের উষ্ণতা প্রকাশের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভারতবিষয়ক বিশেষজ্ঞ টোবিয়াস শলৎসের মতে, চ্যান্সেলরের এই সফরের সময়টি কৌশলগতভাবে অনুকূল। তাঁর ভাষায়, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা নতুন জোট ও অংশীদারত্ব গঠনের প্রয়োজন তৈরি করেছে, আর সেই প্রেক্ষাপটেই জার্মান সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে আগ্রহী। তিনি বলেন, ভারত ও জার্মানির মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে এই জায়গায় যে তারা এমন এক বিশ্ব পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে চীন একটি নির্দিষ্ট ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে সরে যাচ্ছে এবং রাশিয়া ক্রমেই আরও বেশি সমস্যাপূর্ণ হয়ে উঠছে।

দুই দিনের এই সফরে ভারত ও জার্মানি একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। বর্তমানে ভারতে দুই হাজারেরও বেশি জার্মান কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অল্প সময়ের মধ্যেই দ্বিগুণ হয়ে বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। যদিও চীনের সঙ্গে জার্মানির বাণিজ্য এখনো এর পাঁচ গুণ, তবু ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক দ্রুত, এবং সেই প্রবৃদ্ধিতে অংশ নিতে চায় জার্মানি।

তবে ভারতের সঙ্গে জার্মানির মতভেদও রয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন। ভারত এখনো বিপুল পরিমাণ জ্বালানি রাশিয়া থেকে আমদানি করে। কিন্তু টোবিয়াস শলৎসের মতে, রাশিয়া ভারতের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অংশীদার নয়।

জার্মানির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল এআরডি বলছে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জার্মানি মনে করছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের জন্যও জার্মানি ও ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোট অর্থনীতি, গবেষণা এবং বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ। চ্যান্সেলর মের্ৎস ভারতে অস্ত্রশিল্পে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করতে চান এবং দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।

বুন্দেসটাগে জার্মানি-ভারত সংসদীয় দলের দীর্ঘদিনের সদস্য ডির্ক ভিসে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা ক্রমে নানা সমস্যায় পড়ছেন, বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে হঠাৎ করে ভিসা বাতিলের ঘটনা বাড়ছে। তাঁর মতে, এসব শিক্ষার্থীকে আরও বেশি করে জার্মানির দিকে আকৃষ্ট করা উচিত। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে জার্মানি ও ভারতের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৬০ হাজার ভারতীয় শিক্ষার্থী রয়েছেন। এই সফরের সময় স্বাস্থ্যসেবা খাতে ভারতীয় বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সফরের দ্বিতীয় দিনে চ্যান্সেলর মের্ৎস জার্মানির শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে বেঙ্গালুরুতে শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন করবেন। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি এবং কাঁচামাল খাতে ভারত জার্মানির কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

দুই দিনের এই সফরে ভারত ও জার্মানি একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। বর্তমানে ভারতে দুই হাজারেরও বেশি জার্মান কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অল্প সময়ের মধ্যেই দ্বিগুণ হয়ে বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। যদিও চীনের সঙ্গে জার্মানির বাণিজ্য এখনো এর পাঁচ গুণ, তবু ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক দ্রুত, এবং সেই প্রবৃদ্ধিতে অংশ নিতে চায় জার্মানি।

চ্যান্সেলর মের্ৎস ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবেও ভারতে এসেছেন। দীর্ঘ কয়েক বছর আলোচনার পর জানুয়ারির শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জার্মানির পত্রিকা ডি সাইট লিখেছে, এই সফর ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থায় নতুন বন্ধু খোঁজার’ অংশ। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ এবং শীতল যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। জার্মানির সরকার এই নির্ভরতা কমাতে চায়। একই সঙ্গে ভারতকে চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা এবং সেই বিবেচনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করাও বার্লিনের কৌশলের অংশ।

সময়টি উভয় দেশের জন্যই অনুকূল বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ভারতের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে, যা জার্মানির ক্ষেত্রেও বিভিন্নভাবে প্রযোজ্য। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত রাশিয়া থেকে নির্বিঘ্নে তেল কিনছে। মাত্র এক মাস আগে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি যেভাবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন, প্রায় একই উষ্ণতায় স্বাগত জানানো হয়েছে জার্মান চ্যান্সেলর মের্ৎসকেও।

ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক থেকে জার্মানির সরকার ঠিক কী অর্জন করতে চায়, আর ভারত সত্যিই রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে কি না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে। তবে নতুন বিশ্বব্যবস্থায় জার্মানি যে নতুন মিত্র খুঁজছে, তা এই সফরের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

  • সরাফ আহমেদ প্রথম আলোর জার্মানি প্রতিনিধি। ই–মেইল: [email protected]

*মতামত লেখকের নিজস্ব