বাংলাদেশের প্রশাসন দলীয়করণ ও স্বজনতোষণে অভ্যস্ত। এ অবস্থায় দক্ষতা ও যোগ্যতার কী মূল্য আছে?

সালাহউদ্দীন এম আমিনুজ্জামান: একজন দক্ষ পেশাজীবী আমলা নৈতিকভাবে ও আইনগতভাবেও দলীয়করণের প্রক্রিয়ায় পা বাড়াতে পারেন না। তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মী, দলের কর্মী নন। তবে এটা মেনে নিতে হবে যে গণতান্ত্রিক সমাজে নির্বাচিত সরকারের অনুগত হয়ে তাঁদের কাজকর্ম করতে হয়। শুধু আইনি ব্যত্যয় হলে তাঁরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁদের দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ‘দলীয়করণ ও স্বজনতোষণের’ প্রক্রিয়া কোনোভাবেই সরকারের দক্ষতা বা ইমেজ বাড়ায় না। ইদানীং আমলাতন্ত্রের ‘ইমেজ-সংকট’-এর পেছনে ‘দলীয় পরিচয়’ একটা প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ‘দলীয় সহমর্মিতা’ কিংবা ‘আনুগত্য’ না থাকলে দক্ষতা ও যোগ্যতায় পদোন্নতি হবে, তা নিশ্চিত নয়। এতে সার্বিকভাবে প্রশাসনের ‘দক্ষতা’ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে—সামগ্রিকভাবে প্রশাসনের দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

আমাদের প্রশাসনের প্রধান সমস্যা দক্ষতার ঘাটতি না সততার অভাব?

সালাহউদ্দীন এম আমিনুজ্জামান: প্রশাসনে দক্ষতায় ঘাটতি আছে, তা মনে করা ঠিক হবে না। কেননা বাংলাদেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমে যেসব কর্মকর্তা জড়িত (বিশেষ করে ক্যাডারভিত্তিক কর্মকর্তা), তারা সবাই প্রাথমিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েই যোগদান করেন—কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মস্থলে যোগদান করে পরবর্তী সময়ে প্রশিক্ষিত হন। আর এই প্রশিক্ষণ তাঁর পদোন্নতির পূর্বশর্ত। সততায় ঘাটতি নিয়ে ইদানীং প্রশ্ন উঠেছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। সরকারের শুদ্ধাচারকৌশল আছে, কঠোর শৃঙ্খলা আইন আছে, কিন্তু তারপরও সততার প্রশ্ন উঠছে এবং দিন দিন তা বাড়ছে বলেই প্রতীয়মান। মোটাদাগে বলা যায়, আইনি ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ ও বিভাগীয় পর্যবেক্ষণব্যবস্থা দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে; তা প্রশাসনের ইমেজের সংকট তৈরি করছে।

গত বেতন বোর্ড চালুর সময় বলা হয়েছিল, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে। বেতন ছাড়াও তাঁদের অনেক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি কমেনি, এর কারণ কী?

সালাহউদ্দীন এম আমিনুজ্জামান: দুর্নীতির বিষয়টি পুরোপুরি বেতন বাড়া-কমার ওপর নির্ভর করে না। দুর্নীতির একটা বড় কারণ হয় সরকারি কর্মসেবায় পদ্ধতিগত অস্বচ্ছতা, কর্ম সম্পাদনের দিন বেঁধে দেওয়ার পর তা না হওয়া, সেবাগ্রহীতা যথাযোগ্য তথ্যাদি সরবরাহে গাফিলতি, অতি দ্রুত কাজ করিয়ে নেওয়ার প্রবণতা, দাপ্তরিক দালাল চক্রের ভূমিকা ইত্যাদি কাজ করে। যদিও ডিজিটাল সেবা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু অনেকেই, বিশেষ করে প্রান্তিক পেশার মানুষ তাঁর সেবা নিতে পারছেন না। এ ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাকে আরও এগিয়ে আসতে হবে আর একই সঙ্গে সরকারি কর্মব্যবস্থাকে আরও সরল ও সহজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সরকারি কর্মব্যবস্থা ও সেবাকে আরও স্বচ্ছ করার পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক ধাপ বা স্তর কমিয়ে আনতে হবে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কিছু কাজ হয়েছে, কিন্তু আরও জোরালো তৎপরতা নেওয়া যেতে পারে।

জনপ্রশাসনে এখনো নারীর অবস্থান আশানুরূপ নয়; যেখানে উচ্চশিক্ষায় নারীর অবস্থান প্রায় সমান সমান। আমরা কবে প্রশাসনেও তাঁদের সমান উপস্থিতি আশা করতে পারি?

সালাহউদ্দীন এম আমিনুজ্জামান: গত দেড়-দুই দশকে নারীদের মূলধারার প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াস জোরেশোরে চলেছে এবং এখনো সেই ধারা অব্যাহত আছে বলে মনে করি। এখানে একটা আশাবাদী দৃশ্য আমরা লক্ষ করছি। তুলনামূলকভাবে এখন প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাপক হারে নারী শিক্ষার্থী দেখতে পাচ্ছি। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা মেধাতালিকাতেও ভালো অবস্থান করে নিয়েছেন। আমার ধারণা, আগামী পাঁচ-ছয় বছরে নারীদের সরকারি চাকরিতে আসার কৌতূহল ও আগ্রহ এবং যোগ্যতা—সবই বাড়বে। এমনও সময় আসবে, যখন নারী কোটার প্রয়োজন থাকবে না। আমি অত্যন্ত আশাবাদী। সেদিন প্রায় আসন্ন।

শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন, অথচ সরকার পুরো কোটাব্যবস্থাই বাতিল করে দিয়েছে। এতে কি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি?

সালাহউদ্দীন এম আমিনুজ্জামান: মেধাভিত্তিক নিয়োগ আর কোটাব্যবস্থা একসঙ্গে চলতে পারে না। তবে এ ক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নারীদের কোটা নিয়ে মূল্যায়ন প্রয়োজন। যদিও নারী শিক্ষার হার, নারী প্রার্থীদের যোগ্যতা বেড়েছে, কিন্তু এখনো সংখ্যাভিত্তিক সমতা আসেনি। তাই ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠী’র কোটা অবশ্যই বিবেচিত হওয়া উচিত। নারী কোটার বিষয়টি বিশ্লেষণ ও বিবেচনা করা যেতে পারে।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি গ্রহণ করে, বাস্তবায়ন করে প্রশাসন। এ দুইয়ের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন বলে মনে করেন?

সালাহউদ্দীন এম আমিনুজ্জামান: জনপ্রশাসনব্যবস্থায় মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো প্রশাসনিক ডাইকোটমি বা দ্বৈততা অর্থাৎ নীতিমালার মূল কাঠামো চিন্তা এবং উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবেন জনপ্রতিনিধিরা আর তা বাস্তবায়ন করবেন পেশাজীবী সরকারি কর্মচারীরা। কিন্তু এটা মানতে হবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সামাজিক উন্নয়নের নানা ধরনের তাত্ত্বিক পরিবর্তন হয়েছে—নতুন নতুন চিন্তাভাবনার সৃষ্টি হয়েছে, যা পেশাজীবীরা জানেন। সে ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ইচ্ছাকে (Political will) বাস্তবায়নের বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক কলাকৌশল তৈরির কাজটি অবশ্যই পেশাজীবীদের দ্বারাই হতে হবে। আর এখানে রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে প্রাধান্য দিতে হবে। আর সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা দিয়ে নীতিমালা তৈরির দায়িত্ব আমলাতন্ত্রকে নিতে হবে এবং বাস্তবেও তা-ই হচ্ছে। কিন্তু কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতার ক্ষেত্রে এখনো আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

দেশে হাজার হাজার উচ্চশিক্ষিত বেকার, অথচ প্রশাসনের শূন্য পদগুলো পূরণ করা হচ্ছে না। এর কারণ কী?

সালাহউদ্দীন এম আমিনুজ্জামান: কোনো সন্দেহ নেই, গত দেড় দশকে ‘উচ্চশিক্ষিত’ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এর উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিয়ে। প্রশ্ন হলো, শিক্ষিত বেকার থাকলেই সব পদ একবারেই পূরণ করে দিতে হবে, এটা ঠিক যৌক্তিক অবস্থান নয়। প্রথমত, এতে ভবিষ্যতে যাঁরা কর্মজগতে আসবেন, তখন তাঁদের জন্য কোনো শূন্য পদই থাকবে না। এখানে সরকারকে তাই বিবেচনা করতে হবে শূন্য পদ কতটুকু পূরণ করা বাঞ্ছনীয়। ভবিষ্যতে কত পদ শূন্য হচ্ছে, তার ওপরও নতুন নিয়োগ নির্ভরশীল। ঢালাওভাবে নিয়োগ হলে জোগান চাহিদার ভারসাম্য নষ্ট হবে।

সরকারি চাকরি আইনে ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এটা কি বৈষম্যমূলক নয়?

সালাহউদ্দীন এম আমিনুজ্জামান: আমার বিবেচনায় এটাকে বৈষম্যমূলক বলব না, এ ধরনের ব্যবস্থা না থাকলে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বা নীতিমালাই বাস্তবায়ন করা যেত না। যেকোনো একজন একটি ফৌজদারি মামলা দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন। বিড়ম্বনায় ফেলতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ওই কর্মচারীকে কোর্টে ছোটাছুটি করেই দীর্ঘদিন সময় কাটাতে হবে। কোনো বিশেষ অভিযোগ থাকলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার প্রক্রিয়া আছে। সে ক্ষেত্রে বিভাগীয় তদন্ত হয়ে থাকে। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট ‘অপরাধ’ করলে সে ক্ষেত্রে মামলা করা যায় এবং হচ্ছেও।

সংবিধানে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনতে ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার কথা বলা আছে। অথচ কোনো সরকারই তা বাস্তবায়ন করেনি। একবার কর ন্যায়পাল আইন করেও বাতিল করা হয়েছে। আপনার মন্তব্য জানতে চাই।

সালাহউদ্দীন এম আমিনুজ্জামান: নীতিগতভাবে আমি মনে করি, ‘ন্যায়পাল’-এর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কর ন্যায়পাল বাতিল হলেও এর বিকল্প ব্যবস্থা কিন্তু রয়েছে। সে ব্যবস্থাটাকে আরও কার্যকর করে তোলার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে বৈষম্য আছে। বিশেষ করে অন্যান্য ক্যাডারের চেয়ে প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তারা দ্রুত পদোন্নতিসহ নানা রকম সুবিধা পাচ্ছেন। এর প্রতিকার কী?

সালাহউদ্দীন এম আমিনুজ্জামান: এ দুটি ক্যাডারের পদের সংখ্যা অনেক বেশি, কাজের পরিধিও ব্যাপক। এ দুই ক্যাডারের দ্রুত পদোন্নতি অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের কর্মস্পৃহা স্বাভাবিকভাবেই পীড়িত করে। সব ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির একটা অভিন্ন নীতিমালা তৈরি করা যায় কি না, তা-ও এখন বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে আন্তক্যাডার সম্প্রীতি, সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং সার্বিকভাবে ব্যাহত হবে।

সাধারণত প্রশাসনের অর্গানোগ্রাম হয় পিরামিড আকৃতির। কিন্তু আমাদের এখানে উল্টোটা হচ্ছে। এ ধরনের মাথাভারী প্রশাসন আদৌ জনমুখী হতে পারে কি?

সালাহউদ্দীন এম আমিনুজ্জামান: পিরামিড আকৃতির প্রশাসনব্যবস্থার একটা ধ্রুপদি তাত্ত্বিক ভিত্তি আছে। যদিও অনেকেই বর্তমান বাস্তবতার আলোকে ওই তাত্ত্বিক ভিত্তি কতটুকু প্রয়োজনীয় ও কার্যকর, তা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছেন। সম্প্রতি ওই প্রথা ভেঙে উচ্চ পদে পদোন্নতি হচ্ছে। সমালোচকেরা একে ‘মাথাভারী’ প্রশাসন বলে নিন্দা করছেন। যে উচ্চতর পর্যায়ে পদ খালি না থাকায় দীর্ঘদিন যোগ্যতা ও অন্য শর্তাবলি থাকা নিম্নস্থ কর্মকর্তার পদোন্নয়ন হচ্ছে না। এটাও একধরনের হতাশা সৃষ্টি করে ভুক্তভোগীদের। সে ক্ষেত্রে পদ না থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না—এতে খুব একটা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন না, কিন্তু তিনি মানসিক ও সামাজিকভাবে সন্তুষ্ট থাকছেন। এ ব্যাপারটি আমাদের মতো সমাজব্যবস্থায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং কাঙ্ক্ষিত। আগামী দিনগুলোতে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো এই সমতল কাঠামো ব্যবস্থাকে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর করে তোলা যায়, তার একটা রূপরেখা এখন থেকে তৈরির কাজ শুরু করা উচিত।

আপনাকে ধন্যবাদ।

সালাহউদ্দীন এম আমিনুজ্জামান: আপনাদেরও ধন্যবাদ।