এই লেখা তথ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনফাইল ছবি

বহুল আকাঙ্ক্ষিত ও আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দল বিএনপি গঠন করেছে নতুন সরকার। গত কয়েকটি সরকার গঠনের আগেই ভবিষ্যৎ তথ্যমন্ত্রী ও তথ্য উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাংলাদেশ টেলিভিশনকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রথম আলোতে কলাম লিখেছিলাম। এবার সরকারের নতুন তথ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে আমার এই লেখা।

সরকার পরিবর্তন হলেও গণমাধ্যমের, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রচার-প্রচারণা ও অনুষ্ঠানমালায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয় না। টেলিভিশন আমাদের আধুনিক জীবনের এক অপরিহার্য অঙ্গ। আর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের দায়িত্ব অনেক।

রাষ্ট্রীয় এই টেলিভিশনকে মেনে চলতে হয় তিনটি মূল বিষয়—শিক্ষা, তথ্য ও বিনোদন। তাই যেকোনো ব্যবসায়িক ইভেন্ট, প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে মাসের পর মাস টেলিভিশনের মূল্যবান সময়ক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই। বিজ্ঞাপন না পেলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এসব বিষয়কে নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করতে হয়। বিটিভির মাধ্যমেই দেশের সিংহভাগ দর্শক শিক্ষা, সংস্কৃতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষিসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পরামর্শ লাভ করেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের মাধ্যমেই প্রতিটি সরকার তার বিভিন্ন কার্যক্রম প্রচার করে থাকে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও খেলাধুলা সরাসরি সম্প্রচারও করা হয়।

দীর্ঘ ৩৮ বছর একনাগাড়ে বিটিভিতে কাজ করতে গিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়কে রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করতেই দেখেছি বেশি। যেহেতু আমার কোনো দলবল নেই এবং আমি রাজনীতিমুক্ত মানুষ, তাই চেষ্টা করেছি এদের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে। তবে অনুষ্ঠানের ওপর কালো আইন প্রয়োগ করে কোনো শিল্পীকে কালোতালিকাভুক্ত করলে কিংবা কোনো অসংগতি প্রদর্শনের ব্যাপারে আপত্তি জানালে কথা হতো, তবে তা প্রতিবাদের ভাষায়।

কারণ, অদ্যাবধি আমার জানামতে কোনো তথ্যমন্ত্রীই শিল্পীদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে তেমন কোনো শুভ উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। ওপরের নির্দেশে কর্তৃপক্ষ বেছে বেছে তাদের দলীয় শিল্পীদের নিয়েই মতবিনিময় করত এবং টিভি পর্দাকে বিভিন্নভাবে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করত। যে কারণে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর তাদের তৈলাক্ত কর্মকাণ্ড ইউটিউবের শর্টস কিংবা ফেসবুকের রিলসে ভেসে বেড়িয়েছে।

টেলিভিশনের উন্নতির জন্য দক্ষ জনশক্তি, আধুনিক কারিগরি সরঞ্জাম, শিল্পীদের সম্মানী—সেসবের প্রতি কোনো তথ্যমন্ত্রীই আন্তরিক ছিলেন না। এমনকি যুগোপযোগী অনুষ্ঠান নির্মাণের জন্য যে উদ্যোগ ও পরিকল্পনা প্রয়োজন, তারও অভাব রয়েছে। আর্থিক ও দক্ষ জনশক্তি-সংকট এর জন্য দায়ী।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এদের অনেকেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সমাদৃত হয়েছে। কেউ আবার নির্বাসিত হয়েছে। দীর্ঘকাল দলীয় সরকারের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভেবেছিলাম টিভিতে নিরপেক্ষভাবে সবকিছু প্রচার হবে। অথচ টিভি কর্তৃপক্ষ থাকা সত্ত্বেও এ সময়ও বহিরাগত কিছু ব্যক্তিকে দিয়ে প্রিভিউ করা হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। টেলিভিশনে কোন শিল্পীকে দেখানো যাবে, কাকে দেখানো যাবে না, সে বিষয়েও তারা সিদ্ধান্ত দিত।

অন্তর্বর্তী সরকারের স্বল্প মেয়াদে মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড বুঝে ওঠার আগেই তিন-তিনবার উপদেষ্টা বদল হয়েছে। ফলে এসব ব্যাপারে তথ্য উপদেষ্টার খুব একটা ভূমিকা ছিল বলে মনে হয় না। তা ছাড়া আগে মন্ত্রীরাই সরকারের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করতেন, কিন্তু এই সময়ে একজন প্রেস সচিব সেই দায়িত্ব পালন করেছেন।

আরও পড়ুন

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের আয়োজন করে। নির্বাচনী প্রচারও ছিল জমজমাট। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার ছিল সব দলেই। সুরকার ও গীতিকার হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ভূমিকা ছিল বলিষ্ঠ। তবে প্রচার-প্রচারণায় অশ্রাব্য-অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ ছিল শ্রুতিকটু। নতুন সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি অনুরোধ থাকবে এসব অশ্লীল শব্দ বা গালি যেন কোনো মাধ্যমেই দেখা না যায়। কারণ, এর কারণে শিশুরাও প্রভাবিত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তাই অনতিবিলম্বে এসব অশ্লীলতা দমনে কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

এবারের নির্বাচনে ঈদের ছুটির মতোই লঞ্চ-ট্রেন বোঝাই মানুষ ছুটেছে নিজ নিজ এলাকায়। উদ্দেশ্য, তার মূল্যবান ভোটটি দেওয়া। আমরা আশা করি, সমস্যা সমাধানের জন্য বিজয়ী ও বিজিত দল একাত্ম হয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, চাঁদাবাজি, অশিক্ষা, চিকিৎসা। এসব সমস্যা সমাধান করতে হলে প্রয়োজন যোগ্য জায়গায় যোগ্য লোক। সরকারের দায়িত্বশীল পদে দুর্নীতিবাজ, অসৎ ও অযোগ্য লোক যেন নির্বাচন করা না হয়। নতুন পদে হয়তো অনেকের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকবে না। তবে কর্মক্ষেত্রে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা থাকাটাই যথেষ্ট।

আমাদের এই ক্রান্তিকালে প্রয়োজন ন্যায় ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা। জ্ঞানের চেয়ে এখন পেশিশক্তি, অসততা ও কালোটাকার দাপট অনেক বেশি। সমাজের সর্বস্তরেই জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি। আমাদের দলীয় চাটুকারদের নয় বরং সমাজের জ্ঞানী, গুণী, সৎ ও মেধাবীদের সমাজের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একদল অযোগ্যের চেয়ে একজন যোগ্য মানুষ অনেক বড়। যত মত তত পথ—এটি একটি সুবচন। সেই বচনে পচন ধরলে মূল অর্থের চেয়ে ভুল অর্থের সম্ভাবনাই বেশি।

এই প্রতিযোগিতার বাজারে বাণিজ্যিক চ্যানেলগুলোর সঙ্গে টেক্কা দিতে হলে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রয়োজন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অনিয়ম–অসংগতি তুলে ধরা এবং যৌক্তিক সমালোচনা করার সুযোগ দেওয়া। গঠনমূলক সমালোচনা আত্মশুদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

টেলিভিশনের উন্নতির জন্য দক্ষ জনশক্তি, আধুনিক কারিগরি সরঞ্জাম, শিল্পীদের সম্মানী—সেসবের প্রতি কোনো তথ্যমন্ত্রীই আন্তরিক ছিলেন না। এমনকি যুগোপযোগী অনুষ্ঠান নির্মাণের জন্য যে উদ্যোগ ও পরিকল্পনা প্রয়োজন, তারও অভাব রয়েছে। আর্থিক ও দক্ষ জনশক্তি-সংকট এর জন্য দায়ী।

আশা করি, নতুন তথ্যমন্ত্রী এসব সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হবেন। সরকারি নির্দেশ পালন করাই যেন এই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনটির প্রধান কাজ না হয়। এই প্রচারযন্ত্রটিকে সব ধরনের কালো আইনমুক্ত রাখতে হবে। থাকবে অসত্য তথ্যবর্জিত বস্তুনিষ্ঠ সাদা সংবাদ। শুধু দলীয় শিল্পী বা বুদ্ধিজীবী নয়, দলমত-নির্বিশেষে সবার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রযন্ত্র বাংলাদেশ টেলিভিশন—এই প্রত্যাশা সবার।

  • হানিফ সংকেত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব

    মতামত লেখকের নিজস্ব