বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎকে বিদ্যুতের প্রধান উৎসে পরিণত করা এখন সময়ের দাবি। অথচ দেশে মাত্র ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে নবায়নযোগ্য উৎসগুলো থেকে, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশের কাছাকাছি।
অন্যদিকে পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের (বিশেষ করে রুফটপ) উৎপাদন ইতিমধ্যে ছয় হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ে সক্ষম হচ্ছে।
ভারতে নবায়নযোগ্য উৎসগুলো (সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎসহ) থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনসক্ষমতা ২ লাখ ৭৪ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে, যার মধ্যে কেবল সৌরবিদ্যুৎ থেকেই আসছে দেড় লাখ মেগাওয়াটের বেশি। এমনকি ভিয়েতনামও তাদের বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ মেটাচ্ছে নবায়নযোগ্য উৎসগুলো থেকে।
বাংলাদেশের ‘সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ (স্রেডা) তাদের ‘ন্যাশনাল সোলার এনার্জি রোডম্যাপ’ (২০২১-২০৪১)-এ ৩০ হাজার মেগাওয়াটের সোলার এনার্জির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে ১২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ছাদভিত্তিক সোলার প্যানেল থেকে আহরণের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু এই রোডম্যাপ ঘোষণার কয়েক বছর পার হলেও টার্গেট পূরণে উপযুক্ত কর্মসূচি গৃহীত হয়নি।
বড় নগর ও মফস্সল শহরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িগুলোর ছাদ ব্যবহারের মাধ্যমে সাত থেকে আট হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন মোটেই অসম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির ওপর ভর্তুকি প্রদান, যন্ত্রপাতির শুল্ক হ্রাস এবং যুগোপযোগী ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতি চালু করা।
২০২৪ সালে ভারতের সাধারণ নাগরিকদের বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের জন্য ‘পিএম সূর্য ঘর যোজনা’ (রুফটপ সোলার যোজনা) চালু করা হয়েছে। এই যোজনা অনুযায়ী, তিন কিলোওয়াট উৎপাদনক্ষমতার সোলার প্যানেল স্থাপনে প্রায় ১ লাখ ৪০ থেকে দেড় লাখ রুপি খরচ হয়। ভারত সরকার এতে সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার রুপি পর্যন্ত ভর্তুকি দেয় এবং বাকি ব্যয়ভার ভোক্তাকে বহন করতে হয়। মোট এক কোটি পরিবারকে পিএম সূর্য ঘর যোজনায় অন্তর্ভুক্ত করার বিশাল পরিকল্পনা নিয়েছে ভারত। যোজনার এই পূর্ণাঙ্গ মডেলটি সরাসরি বাংলাদেশেও প্রয়োগযোগ্য।
বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য শক্তি বা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বেসরকারি ভবনগুলোতে ভারতের ‘পিএম রুফটপ সোলার যোজনা’র আদলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গ্রহণ করেনি।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক যুদ্ধ-সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পর বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি চরম বিপর্যয়ে পতিত হয়েছে। এলএনজিচালিত বেশির ভাগ বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট বন্ধ থাকছে। দেশে প্রায় ২৭ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনসক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দৈনিক উৎপাদন এখন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটে সীমিত। এই সংকটের প্রধান কারণ আমদানিনির্ভর এলএনজিভিত্তিক জ্বালানিনীতি ও কয়লানির্ভর মেগা প্রকল্প। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, কয়েকজন প্রভাবশালী এলএনজি আমদানিকারককে সুবিধা দিতেই বিগত সরকারের সময় এই ক্ষতিকর নীতি গৃহীত হয়েছিল।
বিদ্যুৎ খাতের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে মুক্তি পেতে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের সোলার সাফল্যের মডেল কাজে লাগিয়ে আমাদের সৌরবিদ্যুৎ নীতি অবিলম্বে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। ভারতের সূর্য ঘর যোজনার মতো মডেল বাংলাদেশেও বাড়ির মালিকদের উৎসাহিত করবে। চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও জার্মানি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। সোলার প্যানেল, ব্যাটারিতে ভর্তুকি এবং ‘নেট মিটারিং’ এ ক্ষেত্রে চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে। ‘নেট মিটারিং’ প্রযুক্তি এখন চীন থেকে সুলভে আমদানি করা যায়, অথচ এ দেশে এর অগ্রগতি নগণ্য।
সৌরবিদ্যুৎ এখন সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি। চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে এক ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ইতিমধ্যে বাংলাদেশি টাকায় ১০ টাকার নিচে নেমেছে। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে ২০৩০ সালে ১ মেগাওয়াট-ঘণ্টা সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ হবে মাত্র ৪২ ডলার। বিপরীতে এলএনজিচালিত প্ল্যান্টে এর খরচ পড়বে ৯৪ ডলার এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে ১১৮ ডলার।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশাল জায়গা লাগে, তাই বাংলাদেশে তা ব্যাপকভাবে সম্ভব নয়, এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। আমার প্রস্তাব হলো বঙ্গোপসাগরের জেগে ওঠা চরাঞ্চলগুলো, বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকূল এবং নদ-নদীর দুই পাশে সোলার প্যানেল স্থাপনের মহাপরিকল্পনা করা হোক। বঙ্গোপসাগরে গড়ে ওঠা শত শত চরে মানববসতি না থাকায় ভূমি অধিগ্রহণের কোনো ঝামেলা নেই। অগ্রাধিকার দিয়ে এসব জায়গায় মেগা সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প করলে চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই সাশ্রয়ী উপায়ে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব।
সম্প্রতি জার্মানি বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য খাতে বিপুল আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। সমুদ্র উপকূলে সমন্বিতভাবে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনের কথা বলেছে তারা, যা জমির সীমাবদ্ধতার ভালো সমাধান। অন্যদিকে বাংলাদেশের উপকূলে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে ডেনমার্ক ৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের যে প্রস্তাব বিগত সরকারের কাছে দিয়েছিল, সেটিও দ্রুত গ্রহণ করা প্রয়োজন। নদ-নদীর তীর এবং জেগে ওঠা চরগুলোতে এ ধরনের মেগা প্রকল্প হাতে নিলে বিদ্যুতের বিশাল চাহিদা নবায়নযোগ্য সোর্স থেকে মেটানো সম্ভব এবং কয়লা ও এলএনজি–নির্ভরতার কবল থেকেও জাতি মুক্তি পাবে।
বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য শক্তি বা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বেসরকারি ভবনগুলোতে ভারতের ‘পিএম রুফটপ সোলার যোজনা’র আদলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গ্রহণ করেনি। এই অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশে ‘নেট মিটারিং’ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে কার্যকর ও বাস্তবমুখী ভর্তুকি নীতিমালা কেন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। দেশের জ্বালানিনিরাপত্তার স্বার্থেই এ বিষয়ে আমি অবিলম্বে সুস্পষ্ট সরকারি সিদ্ধান্তের জোর দাবি জানাচ্ছি।
ড. মইনুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক
