ভোটের লাইন, সেদিনের–এদিনের

ঢাকা-৯ আসনের ভোটকেন্দ্র। সামনে ছোট্ট একটি লাইন—জনা পঁচিশেক মানুষ। নিঃশব্দ। সংযত। স্থির।ছবি: সারফুদ্দিন আহমেদ

সকাল সাড়ে সাতটা। শহর জেগে উঠেছে। সবুজবাগের মায়াকানন এলাকায় কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ঢাকা-৯ আসনের ভোটকেন্দ্র। সামনে ছোট্ট একটি লাইন—জনা পঁচিশেক মানুষ। নিঃশব্দ। সংযত। স্থির।

লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে দেখলে মনে হয় না তাঁরা কোনো নাটকের চরিত্র। তাঁরা খুব সাধারণ—কারও হাতে মোবাইল, কারও কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, কারও চোখে সকালের অন্যমনস্কতা। কেউ তরুণ, কেউ যুবক, কেউ মাঝবয়সী।

কারও মুখে উত্তেজনার রং নেই। বরং আছে এক ধরনের প্রশান্তি—যেন তাঁরা জানেন, আজকের কাজটি খুব বড় নয়, অথচ খুব গভীর।

কেন্দ্রের সামনে দিয়ে সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি ধীর গতিতে চলে গেল। গাড়ির শব্দও যেন চাপা। চারপাশে কোনো হাউকাউ নেই। ভোটের সকাল যেন এক ধরনের ধ্যানমগ্নতা ধারণ করেছে।

আজকের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মুখগুলোতে সেই প্রাণ আছে। এখানে কেউ ‘লাইন রক্ষা’ করতে আসেননি; প্রত্যেকে নিজের একটি চিহ্ন রাখতে এসেছেন।
ছবি: সারফুদ্দিন আহমেদ

এই লাইনটির দিকে আমার দৃষ্টি আটকে ছিল অন্য কারণে। কারণ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি, প্রায় একই সময়ে, একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি আরেকটি লাইন দেখেছিলাম। দৈর্ঘ্যে প্রায় একই। বাহ্যিকভাবে একই রকম সুশৃঙ্খল। কিন্তু ভেতরে-ভেতরে সম্পূর্ণ আলাদা।

সেদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মুখগুলো ছিল বেশির ভাগই তরুণ। চেহারায় ছিল এক ধরনের প্রস্তুতি, কিন্তু তা ভোটারের নয়—ডিউটির। যেন তাঁরা এসেছেন উপস্থিত থাকার দায়িত্ব নিয়ে। লাইন থাকবে, লাইন শেষ হবে না—এই দায়বদ্ধতা নিয়ে।

সেদিন লাইনের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক পরিচিতজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ভোট দিবেন?’
তিনি বলেছিলেন, ‘হ, দিমু।’
বলেছিলাম, ‘ভোটার তো বেশি দেখছি না।’
তিনি একটু হেসে বলেছিলেন, ‘অহনও আসে নাই, তয় আইসা পড়ব।’

আরও পড়ুন

আমি সরে যাচ্ছিলাম। তিনি কানে কানে বলেছিলেন, ‘ভোটার তো আসবে না, বোঝেন না! আমরা আছি কয়জন, কারণ আমাগো থাকতে অইবো। লাইন থাকব। লাইন শেষ হইবো না।’

সেদিন লাইন ছিল, কিন্তু ভোটার ছিল না। উপস্থিতি ছিল, কিন্তু অংশগ্রহণ ছিল না। এক ধরনের অনুকরণ ছিল, অথচ তার ভেতরে প্রাণ ছিল না।

আজকের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মুখগুলোতে প্রাণ আছে। এখানে কেউ ‘লাইন রক্ষা’ করতে আসেননি; প্রত্যেকে নিজের একটি চিহ্ন রাখতে এসেছেন।

মানুষ যখন ভোটকেন্দ্রে দাঁড়ায়, তখন সে কেবল একটি প্রতীকে সিল দেয় না; সে নিজের অস্তিত্বে সিল দেয়।

আরও পড়ুন

কদমতলা পূর্ব বাসাবো স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র, খিলগাঁওয়ের তালতলা প্রাইম স্কুল অ্যান্ড কলেজ—একই ছবি। ছোট ছোট লাইন, স্বল্প সময়ের অপেক্ষা, কোনো উত্তেজনা নেই। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এজেন্টরা পাশাপাশি বসে আছেন। চোখে সন্দেহের আগুন নয়, বরং সতর্কতার সংযম।

পাশের ঢাকা-৮ আসনকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হচ্ছিল। মির্জা আব্বাস ও নাসির উদ্দিন পাটোয়ারির তীব্র ভাষণের রেশ তখনো তাজা। কিন্তু শাহজাহানপুরের কয়েকটি কেন্দ্রে গিয়ে দেখি, ধানের শিষ ও অন্য প্রতীকের অফিস পাশাপাশি। যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, শত্রুতা নেই।

একজন মাঝবয়সী রিকশাওয়ালা আমাকে কেন্দ্রগুলো ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার ভোট কোথায়?’
বললেন, ‘ঢাকায়। বেলা বারোটার পর দিমু।’
বললাম, ‘পরিবেশ কেমন লাগছে?’
তিনি হেসে বললেন, ‘খুব আনন্দ হচ্ছে মামা। বহুতদিন পর ভোট দিবার পারতাছি। মারাত্মক আনন্দ হচ্ছে।’

খলিল ভাইকে বললাম, ‘কোনো ক্যান্ডিডেটের লোক নাই যে ভোটাররে ফাউ চা খাওয়াবে?’ খলিল ভাই হেসে বললেন, ‘না, সে চান্স নাই। আসেন, আমি আপনারে মাগনা চা খাওয়াই।’
ছবি: সারফুদ্দিন আহমেদ

এই ‘আনন্দ’ শব্দটির ভেতরেই রাজনীতির গভীরতম দর্শন লুকিয়ে আছে। মানুষ যখন বলে, ‘আমি ভোট দিতে পারছি’—তখন সে কেবল নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করছে না; সে নিজের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিচ্ছে।

মানুষ মাত্রই রাজনীতিবিদ—এই কথাটি আমরা প্রায়শই তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলি। কিন্তু এর ভেতরে এক গভীর সত্য আছে। মানুষ যখন বাজারে দাম নিয়ে দর-কষাকষি করে, যখন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে, যখন রাস্তার নিরাপত্তা নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়—তখন সে রাজনীতির ভেতরেই থাকে। আসলে রাজনীতি কেবল সংসদ ভবনের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার ভাষা।

ভোটার মাত্রই রাজনীতিবিদ—কারণ ভোট দেওয়ার মুহূর্তে সে রাষ্ট্রের সহ-নির্মাতা হয়ে ওঠে। সে সিদ্ধান্ত নেয়, কোন পথে তার সমাজ হাঁটবে। সে তার নীরবতার মধ্যেও একটি উচ্চারণ রেখে যেতে চায়।

সবুজ কানন এলাকার বিখ্যাত খলিল মিয়ার চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। খলিল ভাইকে বললাম, ‘কোনো ক্যান্ডিডেটের লোক নাই যে ভোটাররে ফাউ চা খাওয়াবে?’

খলিল ভাই হেসে বললেন, ‘না, সে চান্স নাই। আসেন, আমি আপনারে মাগনা চা খাওয়াই।’

গণতন্ত্র কখনো হঠাৎ করে জন্ম নেয় না; এটি ধীরে ধীরে মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়। আর সেই অভ্যাসের সূচনা হয় এমনই এক সকালে—যখন মানুষ নিঃশব্দে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, উত্তেজনা ছাড়া, ভয় ছাড়া, অভিনয় ছাড়া।

চায়ের কাপে ভাসছিল ভোটের সকালের স্বপ্ন। স্থানীয় ভোটার ইলিয়াস হোসেন বললেন, ‘এখন পর্যন্ত যেভাবে ভোট হচ্ছে, তাকে সুষ্ঠু ভোট বলা যায়। আমি কোনো হইচই ছাড়াই ভোট দিতে পেরেছি—এটা আমাকে আনন্দ দিয়েছে।’

‘আনন্দ’—আবারও সেই শব্দ।

রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে মানুষের চাওয়ার তালিকা দীর্ঘ হতে পারে। কিন্তু অন্তত একটি জিনিস সে চায়—তার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া হোক। তার উপস্থিতি যেন কৃত্রিম না হয়।

সেদিনের লাইন ছিল একটি প্রহসনের প্রতীক। আজকের লাইনটি, ছোট হলেও, এক ধরনের প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত।

গণতন্ত্র কখনো হঠাৎ করে জন্ম নেয় না; এটি ধীরে ধীরে মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়। আর সেই অভ্যাসের সূচনা হয় এমনই এক সকালে—যখন মানুষ নিঃশব্দে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, উত্তেজনা ছাড়া, ভয় ছাড়া, অভিনয় ছাড়া।

সকালের সেই ছোট্ট লাইনটি তাই কেবল ভোটের লাইন নয়। এটি মানুষের নিজের কাছে ফিরে আসার লাইন।

  • সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক।
    ইমেইল: [email protected]