বিশ্লেষণ
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বিরোধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও বন সুরক্ষার বাধা
বন সুরক্ষার জন্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সম্পদ প্রয়োজন। কিন্তু তাদের ভূমির আনুষ্ঠানিক অধিকার না থাকলে, বন সুরক্ষার বৈশ্বিক তহবিল এসব জনগোষ্ঠী পাবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বিরোধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও বন সুরক্ষার বাধা—এসবের আন্তসম্পর্ক নিয়ে লিখেছেন খলিলউল্লাহ্
পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর ভয়ানক বিপদ সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। এর মোকাবিলায় বনের সুরক্ষাও যে জরুরি, সে কথাও সবার জানা। কিন্তু এ লক্ষ্যে আন্তরিক কাজ খুব কমই হয়। যেটুকু হয়, তার বেশির ভাগই নানা ধরনের এনজিওভিত্তিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
কিন্তু এখনো এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা কোনো রকম স্বীকৃতির আশা না করে বনের সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর এসব মানুষ রাজনীতি আর করপোরেট মুনাফার শিকার হয়ে ওঠা বনজঙ্গলের সুরক্ষায় নীরবে কাজ করে চলেছেন। কিন্তু বনের সুরক্ষায় আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানুষের ভূমির অধিকারের গুরুত্ব নিয়ে খুব একটা আলোচনা চোখে পড়ে না।
গত ১৪ মে দৈনিক প্রথম আলোয় ‘পাহাড়ে সংরক্ষিত বন উজাড়, অথচ সজীব মৌজা বন’ শিরোনামে একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যায় কীভাবে এসব বন স্থানীয় মানুষের প্রজ্ঞা আর পরিচর্যায় শত শত বছর ধরে টিকে আছে। অন্যদিকে সরকারের অধীনে থাকা সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনের অবস্থা বেহাল। তবে এসব মৌজা বনের মালিকানার সঙ্গে বনের কার্যকর সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার সম্পর্ক রয়েছে।
ভূমির অধিকার কেন দরকার
ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইকোলজি অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্ট জার্নালে প্রকাশিত ‘ইম্পর্ট্যান্স অব ইন্ডিজেনাস পিপলস ল্যান্ডস ফর দ্য কনজারভেশন অব ইন্ট্যাক্ট ফরেস্ট ল্যান্ডস্কেপস’ শিরোনামের এক নিবন্ধে দেখা যায়, আদিবাসী, আফ্রো-বংশোদ্ভূত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অক্ষত বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে চলেছে। অবাক করা বিষয় হলো, নিউইয়র্কভিত্তিক রেইনফরেস্ট ফাউন্ডেশনের হিসাবে দেখা যায়, এসব এলাকায় বন উজাড়ের হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কম।
রাইটস অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনিশিয়েটিভ ২০২৩ সালে ‘হু ওনস দ্য ওয়ার্ল্ডস ল্যান্ড?’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদনে বিশ্বের ৭৩টি দেশের বন নিয়ে করা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ ভূমি ও বনভূমি আনুষ্ঠানিকভাবে এসব জনগোষ্ঠীর নিজেদের বলে স্বীকৃত। কিন্তু তাদের অন্তত ১ দশমিক ৩৭৫ বিলিয়ন হেক্টর ভূমি এখনো বিভিন্ন দেশের সরকার আইনি স্বীকৃতি দেয়নি।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ১৮টি পরীক্ষামূলক গবেষণার একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা করেছে। সেখানে দেখা যায়, আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার প্রদানের ফলে অনেক জায়গায় বন বিনাশ কমেছে। সরকারি বনও এখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে। কমিউনিটিকে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত না করলে বন টিকিয়ে রাখা কঠিন। রাষ্ট্রের পক্ষে সারাক্ষণ নজরদারি সম্ভব নয়। তা ছাড়া দুর্গম এসব এলাকায় চাইলেও রাষ্ট্র খুব বেশি তদারক করতে পারবে না। তাই কমিউনিটির প্রয়োজন। এসব বনের স্বীকৃতি দিলে আন্তর্জাতিক অর্থায়নও পেতে পারে এখানকার জনগোষ্ঠী। ফলে বন সুরক্ষায় তারা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রশ্ন হলো, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার বা মালিকানা কেন দরকার? বিশিষ্ট ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দার্শনিক পিয়েরে–জোসেফ প্রুধনের বরাত দিয়ে যে কেউ বলতে পারে ‘প্রপার্টি ইজ থেফট’। অর্থাৎ মালিকানা বিষয়টাই আসলে চৌর্যবৃত্তি। ১৮৪০ সালে প্রুধন তাঁর হোয়াট ইজ প্রপার্টি গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলেছেন। কারও নির্দিষ্ট মালিকানা আরোপ করা মানেই সেটা কোনো না কোনোভাবে অন্যকে বঞ্চিত করে দখল করা হয়েছে।
তবে দার্শনিক কার্ল মার্ক্স আবার ১৮৪৭ সালে পভার্টি অব ফিলোসফি গ্রন্থে প্রুধনের এ ধারণার সমালোচনা করেছেন। মার্ক্সের কথা হলো সম্পত্তি চুরি করতে হলে সম্পত্তির অস্তিত্ব তো আগে স্বীকার করতে হবে। তার মানে যে সম্পত্তির সমালোচনা আপনি করছেন, তার নিয়মই আপনি অনুসরণ করছেন।
কার্ল মার্ক্স এটাকে চুরি না বলে বরং উৎপাদনের উপকরণের ব্যক্তিগত মালিকানা বাতিল করার কথা বলেছেন। অর্থাৎ তিনি আসলে কমিউনিটির ধারণার কথাই বলেছিলেন, যেটা আমাদের পাহাড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী চর্চা করে আসছে বহুকাল ধরে। তারা মৌজা বনগুলোর ব্যবস্থাপনাও করছে সে নিয়মেই। কিন্তু আমরা এখন যে সমাজে বসবাস করি, সেখানে মালিকানার ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির মালিকানাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
এদিকে আনুষ্ঠানিক ভূমির অধিকার ছাড়া এসব জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ জলবায়ু ও বনবিষয়ক আন্তর্জাতিক অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ, এসব অর্থ সাধারণত রাষ্ট্রের কাছে যায়। রাইটস অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনিশিয়েটিভ এবং রেইনফরেস্ট ফাউন্ডেশন নরওয়ের ২০২৫ সালের এক যৌথ প্রকাশনায় দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের ১ শতাংশের কম গেছে আদিবাসী ও কমিউনিটির ভূমি মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় যুক্ত কর্মসূচিগুলোতে। আবার এর মাত্র ভগ্নাংশ গেছে সরাসরি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোতে।
বন সুরক্ষার আন্তর্জাতিক তহবিল
২০২১ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত কপ২৬–এ ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রতিশ্রুতির মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ গেছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে। কারণ, এসব তহবিল যায় তাদের কাছেই, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে ভূমির মালিক হিসেবে আইনগতভাবে স্বীকৃত। ফলে কার্যকরভাবে বন সুরক্ষার জন্য এসব জনগোষ্ঠীর যথেষ্ট সম্পদ থাকে না।
বন সুরক্ষার জন্য এ ধরনের বৈশ্বিক আরও তহবিল রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি (টিএফএফএফ)। বিশ্বের ৫৩টি দেশ এ উদ্যোগের অনুমোদন দিয়েছে। ১২৫ বিলিয়ন ডলারের এই মিশ্র তহবিল থেকে বনাঞ্চলীয় দেশগুলোকে অর্থায়ন করা হয়। শর্ত হলো অন্তত ২০ শতাংশ অর্থ সরাসরি আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে দিতে হবে, যারা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় বনের সুরক্ষা নিশ্চিত করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বনজঙ্গলকে ধরা হয় সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে। বৈশ্বিক নানা সম্মেলন ও চুক্তিতে ২০৩০ সালের মধ্যে বন বিনাশ বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ৩০তম জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেওয়া দেশগুলো বন বিষয়ে তিনটি বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতিতে আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বন সংরক্ষণের ভূমিকার কথা স্বীকার করা হয়েছে। তা ছাড়া বনের সুরক্ষায় অর্থায়ন এবং এসব জনগোষ্ঠীর আনুষ্ঠানিক ভূমির অধিকার বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও করা হয়েছে।
কিন্তু সংকটটা এখানেই। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির আইনি মালিকানা পাওয়ার প্রক্রিয়া সাধারণত জটিল। আমরা জানি যে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল সংকটই হলো ভূমির বিরোধ নিষ্পন্ন না হওয়া। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অনেক কিছুই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হলেও আসল সংকট এই ভূমির বিরোধ আজও মেটেনি। ফলে পাহাড়ে অসন্তোষ পুরোপুরি কখনোই থামেনি। নিয়মিত বিরতিতে সংঘাতও ঘটে চলেছে।
ভূমির দ্বৈত ব্যবস্থাপনা ও বন সুরক্ষার সংকট
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি ব্যবস্থাপনা হয় দ্বৈত পদ্ধতিতে। একদিকে আছে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা। অন্যদিকে প্রথাগত ব্যবস্থাপনা। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হলো ১৯০০ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার কর্তৃক প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ১৯০০, যা সিএইচটি ম্যানুয়াল হিসেবে পরিচিত। এই আইনের অধীনে ভূমি হস্তান্তর, লিজ দেওয়া এবং সরকারের খাসজমি বরাদ্দের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব জেলা প্রশাসকের হাতে।
অন্যদিকে প্রথাগত আইনের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম তিনটি প্রশাসনিক সার্কেলে বিভক্ত। তিনটি সার্কেল হলো রাঙামাটিতে চাকমা সার্কেল, বান্দরবানে বোমাং সার্কেল এবং খাগড়াছড়িতে মং সার্কেল। এসব সার্কেলপ্রধানের অধীনে মৌজাপ্রধান বা হেডম্যানরা কাজ করেন। কয়েকটি পাড়া বা গ্রাম মিলে একটি মৌজা হয়। হেডম্যানের অধীনে পাড়াগুলোতে আবার থাকেন কার্বারিরা। এখন কোনো কোনো মৌজার বনের নেতৃত্ব কার্বারিদের অধীনেও আছে। আবার কোথাও কোথাও হেডম্যান ও কার্বারি ছাড়াও এলাকার নেতৃস্থানীয় অনেকেই ভিসিএফের নেতৃত্বে আছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনের ৩৪(৫) ধারা মোতাবেক, ভূমির যেকোনো ধরনের ক্রয়–বিক্রয় ও হস্তান্তরের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন লাগবে। তা ছাড়া ৩৪(১৩) ধারা মোতাবেক, স্থানীয় বাসিন্দা না হলে বাইরে থেকে কেউ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ভূমির মালিক হতে হলে জেলা প্রশাসকের প্রকাশ্য সম্মতি লাগবে।
১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠিত হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ এলাকার ভূমি ব্যবস্থাপনা ব্যাপকভাবে বিতর্কিত রয়ে গেছে। এই কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে নানামুখী চ্যালেঞ্জ। প্রথাগত আদিবাসী ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় আইনের অধীনে পাওয়া মালিকানার বিরোধ রয়েছে ব্যাপক। ভিলেজ কমন ফরেস্ট (ভিসিএফ) বা মৌজা বনের ব্যবস্থাপনা, অবৈধভাবে গাছ কাটা এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্প বনাম আদিবাসী ভূমি অধিকারের দ্বন্দ্ব পাহাড়ে চলমান রয়েছে।
অথচ আরও কার্যকরভাবে বন সুরক্ষার জন্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সম্পদ প্রয়োজন। কিন্তু তাদের ভূমির আনুষ্ঠানিক অধিকার না থাকলে, বন সুরক্ষার বৈশ্বিক তহবিল এসব জনগোষ্ঠী পাবে না।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ
আদিবাসী ও কমিউনিটির ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষিত অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভিন্নভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যেমন ইন্ডিজেনাস অ্যান্ড কমিউনিটি কনজার্ভড এরিয়াজ (আইসিসিএ)।
এসব সংরক্ষিত অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে প্রতিবেশিকভাবে সংকটাপন্ন ভূমি ও জলাশয়। আদিবাসী ও স্থানীয় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এসব অঞ্চলের রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ। তাদের নিজস্ব প্রথা, ঐতিহ্য ও নিয়মকানুনের মাধ্যমে এসব এলাকা তারা পরিচালনা করে। এসব ভূমিতে ব্যক্তিমালিকানার বদলে সামষ্টিক অভিভাবকত্ব স্বীকার করা হয়। তা ছাড়া এমন এক কাঠামো থাকে, যার মাধ্যমে অর্থ ও সংরক্ষণবিষয়ক সহায়তা সরাসরি তাদের কাছে পৌঁছায়।
অনেক দেশ আইসিসিএ হিসেবে পরিচিত এসব অঞ্চলকে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অর্থায়নকারী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমাগত তাদের সহায়তা করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় জার্মান ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট ইনিশিয়েটিভ কিংবা ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ড–কানাডার কথা। কিন্তু এসব সংগঠন থেকে সহায়তা পেতে হলে বৈশ্বিক আইসিসিএ রেজিস্ট্রিতে আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের মৌজা বনগুলোর নিবন্ধন থাকতে হবে। ২০০৮ সালে এই রেজিস্ট্রি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আইসিসিএ আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত সংরক্ষণ লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই কাজ করে। যেমন ২০২২ সালে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক সম্মেলনে পৃথিবীর ১৯৬টি দেশের স্বাক্ষর করা কুনমিং–মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভারসিটি ফ্রেমওয়ার্ক। এ ছাড়া রয়েছে ২০৩০ এজেন্ডা ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট। বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের মৌজা বনের উদাহরণ নিয়ে আইসিসিএ ছাড়াও এ ধরনের অন্য প্ল্যাটফর্মগুলোতে যেতে পারে।
বহু দেশ প্রথাগতভাবে পরিচালিত এসব বনের মালিকানা স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু এই স্বীকৃতির মাত্রা একেক দেশে একেক রকম। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বননীতিতে মৌজা বনের স্বীকৃতি দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব মৌজা বন প্রথাগত আইনে পরিচালিত হয়।
আমাদের সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে প্রথাগত আইনের স্বীকৃতি রয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় সংবিধানের পরিপন্থী এবং প্রচলিত কোনো মৌলিক অধিকার খর্ব না করার শর্তে। ফলে আমাদের এসব মৌজা বনের জন্য বৈশ্বিক পর্যায়ে বন সুরক্ষার অর্থ আদায় করা যায় কি না, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলো ক্রমাগত বন সুরক্ষার মাধ্যমে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের লাগাম টানার চেষ্টা করছে। বৈশ্বিক সম্মেলনে দেওয়া এসব প্রতিশ্রুতি যদি সত্যিই বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে ভূমির অধিকারের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে আনা প্রয়োজন। আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে না পারলে, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। তাই এই অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের বন সুরক্ষা ও যৌথ ভবিষ্যতের একমাত্র পথ।
খলিলউল্লাহ্ লেখক ও সাংবাদিক
মতামত লেখকের নিজস্ব