আইনের শিক্ষার্থী হওয়ার সুবাদে দু-চারজন উকিল কমবেশি পরিচিত ছিলেন। ফলে আত্মীয়স্বজন কেউ আমার কাছে কোনো আইনি পরামর্শ চাইলে আমি মামলা করার পরামর্শ দিতাম। এখন বিচারকার্যে এসে দেখি, কী মারাত্মক পরামর্শ তাঁদের দিয়েছিলাম! মানে তাঁদের মোটামুটি দৌড়ের ওপর রাখার জন্য আমার পরামর্শই যথেষ্ট ছিল।
এ দেশের কোর্ট-কাছারিতে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কথা কমবেশি সবাই শুনেছেন। সব মামলা নিষ্পত্তি হতে যে অনেক সময় লাগে, বিষয়টি এ রকম নয়। অনেক মামলারই দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, কিন্তু সব সময় ঝুলে থাকা মামলাগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ায় অনেকের মনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে সব মামলার নিষ্পত্তিতেই বোধ হয় এতটা সময় লাগে। আবার মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার পেছনে মূল নিয়ামকগুলো কী, তা–ও অনেকেরই জানা নেই।
আইনি জটিলতার কারণে কিছু মামলার নিষ্পত্তি হতে বেশি সময় লাগে, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু মামলার দীর্ঘসূত্রতার পেছনের আসল কারণগুলো মানবসৃষ্ট। যেমন উভয় পক্ষের আইনজীবীরা যদি মামলা নিষ্পত্তিতে আদালতকে সহযোগিতা না করেন, তাহলে এক বছরে সমাপ্ত হওয়ার মতো মামলা তিন বছরেও শেষ করা কঠিন। আবার যে মামলা নিষ্পত্তির জন্য কোনো একটা সরকারি অফিসের নথি তলব করা হয়েছে, সেই নথি না আসা পর্যন্ত মামলার কাজ আগানো সম্ভব হয় না। এ কারণে মামলার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগলে সেই দায়ভার তো আদালতের নয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন আদালত ঘুরেফিরে বছরের বিভিন্ন সময় আবার বিচারকশূন্য থাকেন। তখন ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে আদালতের আনুষ্ঠানিক কাজগুলো সম্পাদন করা হয়। একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিয়ে অনেক সরকারি-বেসরকারি কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চাইলে সুন্দর করে পরিচালনা করা সম্ভব, কিন্তু একজন ভারপ্রাপ্ত বিচারকের পক্ষে কখনো আদালতের মূল কাজ সম্পাদন করা সম্ভব নয়।
একজন ভারপ্রাপ্ত বিচারকের পক্ষে কেবল প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর করা সম্ভব এবং সেটাই হয়ে থাকে। কারণ, ভারপ্রাপ্ত বিচারকের তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত আদালতের কাজ করতেই দিন যায়। সেটা শেষ করার পর আরেকটি আদালতের জরুরি দু-একটা বিষয় শুনানি বাদে বিশেষ কিছু করার সম্ভব হয়ে ওঠে না।
অল্প কিছুদিন একটা আদালতে ভারপ্রাপ্ত বিচারক থাকলে তবু একটা কথা ছিল। মাঝেমধ্যে এক থেকে দুই বছরের অধিক সময়ও কিছু আদালত ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে চালাতে হয়। মামলা নিষ্পত্তির সময় হিসাব করার ক্ষেত্রে এই সময়ও কিন্তু হিসাব করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে বাগেরহাট জেলা জজ কোর্টের কয়েকটি আদালতের কথাই ধরা যাক। এই জজ কোর্টের চিতলমারী সহকারী জজ আদালত গত ১০ বছরের ৫ বছর ভারপ্রাপ্ত বিচারকের দায়িত্বে ছিলেন। ফকিরহাট সহকারী জজ আদালতে ১০ বছরের মধ্যে ৪ বছর ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে কাজ চলেছে।
একইভাবে গত ১০ বছরের হিসাবে মোরেলগঞ্জ ও রামপাল সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ৩ বছরের অধিক সময়, মোল্লাহাট সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ৫ বছর, শরণখোলা সহকারী জজ আদালতে প্রায় ৪ বছর এবং মোংলা সহকারী জজ আদালতে ৩ বছর নিয়মিত দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক ছিলেন না। আমার জানামতে, দেশের সব জেলার আদালতের অবস্থা কমবেশি এ রকমই।
আদালত ফাঁকা রেখে ‘মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা’ বলা তো ঠিক নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি যে মামলা নিষ্পত্তিতে বেশি সময় লাগে না, বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত এই সময় লাগানো হয়। মামলার দীর্ঘসূত্রতার পেছনে এটা অনেক বড় একটা কারণ। একটা আদালত বিরতি দিয়ে বছরখানেক সময় বিচারকশূন্য থাকলে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা না হয়ে উপায় আছে? ধরুন, ২০১৫ সালে ক আদালতে একটি মামলা হলো। ২০২৩ সালে এসে যদি নিষ্পত্তি হয়, তাহলে দেখা যাচ্ছে মামলাটি নিষ্পত্তি হতে সময় লাগল আট বছর। কিন্তু এর মধ্যে যে ক আদালতে তিন–চার বছর বিচারক ছিলেন না, সে সময় হিসাব করা হচ্ছে না। সব সময়ের জন্য আদালতে বিচারক নিয়োগ থাকলে এবং উভয় পক্ষের বিজ্ঞ উকিলদের সদিচ্ছা থাকলে এসব মামলার নিষ্পত্তিতে মোটেই বেশি সময় লাগে না।
বাদীপক্ষের উকিল লেখেন আরজি আর বিবাদীপক্ষের উকিল লেখেন লিখিত জবাব। অপর দিকে আদালতে বসে বিচারককে আরজি, জবাব ও জেরার বক্তব্য সাক্ষীদের মুখে শুনে নিজ হাতে লিখতে হয়। এজলাসে অবস্থানকালে বেশির ভাগ সময় এ কাজেই ব্যয় হয়। এ লেখালেখির পরিমাণ কতটুকু? এটা প্রতিদিন একটা তিন–চার ঘণ্টা সময়ের পরীক্ষা দেওয়ার সমান। এরপর নথি পর্যালোচনা করে রায় ও আদেশ লেখা তো আছেই। আমাদের পূর্ববর্তী বিচারকেরা এক যুগ ধরে স্টেনোগ্রাফার নিয়োগের কথা শুনে এলেও সহকারী জজ ও সিনিয়র সহকারী জজদের জন্য এখনো স্টেনোগ্রাফার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। স্টেনোগ্রাফার নিয়োগ দেওয়া হলে মামলার নিষ্পত্তি অনেক বেড়ে যাবে।
আদালত সব সময় দেওয়ানি বিরোধের আপস–মীমাংসার জন্য উৎসাহিত করেন। সে জন্য দেওয়ানি কার্যবিধিতে আপস–মীমাংসার বিধান রাখা হয়েছে। গ্রাম আদালতের মাধ্যমে বিরোধ–মীমাংসার ব্যবস্থা আছে। সরকার প্রতিটি জেলায় একজন লিগ্যাল এইড অফিসার নিয়োগ দিয়েছে। এরপরও যদি কোনো সাধারণ মানুষ মনে করেন যে তিনি পুলিশ, প্রশাসন কিংবা ক্ষমতাবান কারও কাছে গেলে ন্যায়বিচার পাবেন, তাহলে এর চেয়ে বড় দুরবস্থা কোনো দেশের বিচার বিভাগের জন্য হতে পারে না।
সারা দেশে বর্তমানে বিচারকসংখ্যা দুই হাজারের কাছাকাছি। এর মধ্য অনেক বিচারক আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে প্রেষণে নিযুক্ত আছেন। গড় হিসাব করলে দেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য মাত্র একজন বিচারক আছেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কথা হিসাব করলে এ সংখ্যা অনেক কম।
এ দেশের শিক্ষকেরা প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থীকে পাঠদান করেন। অন্যান্য দেশের একজন চিকিৎসকের তুলনায় এ দেশের একজন চিকিৎসকও অনেক বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। সেই হিসাবে, একজন বিচারকও বেশি মামলার বিচার করবেন, এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে এতটা ব্যবধান তো থাকা উচিত নয়। তদুপরি অন্য অনেক সমস্যা বিচার বিভাগকে আগাছার মতো জড়িয়ে ধরেছে।
বিচার বিভাগে এমন একটা অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যে মানুষের দিন দিন বিচার বিভাগের ওপর আস্থা হ্রাস পাচ্ছে। যেসব অভিযোগ ও দ্বন্দ্ব আদালতের মাধ্যমে নিষ্পন্ন হওয়ার কথা, তা এখন গণশুনানিতে গিয়ে মানুষ অভিযোগ আকারে দিচ্ছেন। বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় গণশুনানির নামে গণসালিসি চলছে। মানুষের মনে ভয় ঢুকে গেছে যে আদালতে মামলা করলে পাঁচ–সাত বছরের আগে কোনো সমাধান নেই। অথচ এর দায় বিচারকদের নয়। সব মিলিয়ে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে যে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিচারকদেরও কিছু করার থাকে না।
বাংলাদেশে যে আইনি ব্যবস্থা, তাতে আইনজীবীর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। মামলার পক্ষদের থেকে প্রাপ্ত ‘ফি’ উকিলদের জীবিকা। এখনো এ দেশের সাধারণ মানুষ আইনজীবীদের যথাযথ ‘ফি’ দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্পণ্য করেন, এ কথা সত্য। এ জন্য একশ্রেণির আইনজীবীর মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি বিলম্ব করে পক্ষদের কাছ থেকে অল্প অল্প করে বেশিদিন ফি আদায় করার প্রবণতা দেখা যায়।
প্রয়োজনের তুলনায় বিচারকসংখ্যা কম, জারিকারকের সংখ্যা কম, সহকারী ও সিনিয়র সহকারী জজদের স্টেনোগ্রাফার নেই, অনেক জজ কোর্টের বিচারকদের এজলাস শেয়ার করতে হয় এবং খাসকামরায় বসে কাজ করার মতো উপযুক্ত পরিবেশ নেই। যে টাকা প্রতিবছর বিচার বিভাগকে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাতে জেলা জজ আদালতগুলোর ব্যাপক কৃচ্ছ্রসাধন ছাড়া উপায় থাকে না। বিচারকার্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষ থেকে যথাযথ সহযোগিতা নেই। এত নেই আর এত কৃচ্ছ্রের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি বেশি কী করে হবে?
তালহা মুহাম্মদ
সহকারী জজ, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস