যানজট বৃদ্ধির কারণে ও মানসম্পন্ন গণপরিবহনের অভাবে রাইড শেয়ারিং জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় মোটরসাইকেলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। রাইড শেয়ারিং থেকে দেশে লাখো বেকার ছাত্র-যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। মোটরসাইকেল কোনো বিলাসবহুল পণ্য নয়, বরং এটি এখন মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাহন। সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে মহাসড়কে মোটরসাইকেল চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। পবিত্র ঈদুল আজহার আগের তিন দিন, ঈদের দিন ও ঈদের পরের তিন দিন সারা দেশের মহাসড়কে যৌক্তিক কারণ ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো যাবে না। পাশাপাশি এক জেলায় রেজিস্ট্রেশন করা মোটরসাইকেল অন্য জেলায় চালানো যাবে না। তবে যৌক্তিক ও অনিবার্য প্রয়োজনে পুলিশের অনুমতি নিয়ে মোটরসাইকেল চালানো যাবে।

সবার আগে খতিয়ে দেখা উচিত, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সড়কে দুর্ঘটনার কারণ এবং তা থেকে পরিত্রাণ পেতে কী করণীয়। নিরাপদ সড়কের দাবি এখন পুরো জাতির। আর তার জন্যই আমাদের কাজ করা উচিত। আমরাও চাই প্রত্যেক মোটরসাইকেলচালক বৈধ লাইসেন্স ব্যবহার করুন। কিশোর বা অপ্রাপ্ত বয়সের কাউকেই মোটরসাইকেল চালাতে দেওয়া উচিত নয়। এসব বিষয়ে আমাদের সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

এ কথা ঠিক যে সাম্প্রতিক সময়ে মোটরসাইকেলের দেশীয় শিল্পের বিকাশের কারণে এর সংখ্যা বেড়েছে। সরকারও মোটরসাইকেলশিল্পকে এগিয়ে নিতে উদ্যোগী। উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে অন্তত ৯টি মোটরসাইকেল কারখানা করেছেন, বিনিয়োগ করেছেন প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। মোটরসাইকেল উৎপাদন, বিপণন ও অন্যান্য কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় দুই লাখ পরিবার। ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল সাড়ে সাত লাখের মতো। বর্তমানে তা পৌঁছেছে সাড়ে ৩৭ লাখে। অর্থাৎ গত এক যুগে মোটরসাইকেল বেড়েছে প্রায় ৩০ লাখ। বিশেষ করে ২০১৬ সাল থেকে ভাড়ায় চালিত (রাইড শেয়ারিং) মোটরসাইকেল চলতে দেওয়া ও ২০১৭ সালে সরকারের প্রগতিশীল মোটরসাইকেল নীতিমালার ফলস্বরূপ এ সংখ্যা বেড়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যাও বেড়েছে। দুর্ঘটনায় কারও ভাই, কারও বন্ধু, কারও স্বজন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনার কোনোটাই কারও কাম্য নয়। কিন্তু এ দুর্ঘটনার প্রতিটি ক্ষেত্রেই কি মোটরসাইকেলচালক দায়ী?

গত পবিত্র ঈদুল ফিতরে লাখ লাখ বাইকার মোটরসাইকেলেই গ্রামের বাড়িতে ফেরেন। গত ২৭ এপ্রিল রাত ১২টা থেকে ৩০ এপ্রিল ২০২২ রাত ১২টা পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টায় ২১ হাজার ৩৬০টি মোটরসাইকেল বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু পারাপার হয়। ১৯৯৮ সালের জুনে সেতুটি চালু হওয়ার পর তিন দিনের হিসাবে এত বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেল এর আগে কখনো পারাপার হয়নি। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার মোটরসাইকেল বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়। অন্যদিকে ২৬ জুন পদ্মা সেতু চালুর পর এক দিনেই ৪৫ হাজারের মতো মোটরসাইকেল চলাচল করেছিল (অধিকাংশই সেতু দেখতে যাওয়া পর্যটক)। বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যুর পর ২৭ জুন থেকে সেতু দিয়ে মোটরসাইকেল পারাপার বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, উৎসুক কিছু জনতাকে রক্ষা করার চেষ্টার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে।

মূলত, বাস মালিক-শ্রমিক সংগঠন ৩ জুলাই আন্তজেলা সড়কে মোটরসাইকেল বন্ধের দাবি করার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত কি না, তা জনমনে এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোটরসাইকেল দূরপাল্লার যাত্রায় গণপরিবহনের তুলনায় ‘আকর্ষণীয়’ বিকল্প হয়ে উঠল কেন? এ প্রশ্নের উত্তর গভীরে গিয়ে খুঁজতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, ঠিক যেসব মৌলিক কারণে আন্তজেলা যাতায়াতে মোটরসাইকেল বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে, সেসব সমাধান করা হয়েছে কি? মহাসড়কে কিংবা পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল চলাচলের গতিবেগ ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ না করে, সেতুতে গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধকরণ বাস্তবায়ন না করে মোটরসাইকেল নিষিদ্ধ করলেই দুর্ঘটনার সমাপ্তি হবে? মোটরসাইকেল যে নগরে ও নগরের বাইরের দূরপাল্লার যাত্রায় গণপরিবহনের ‘আকর্ষণীয়’ বিকল্প হয়ে উঠল, তার সমাধান না করে একতরফা মোটরসাইকেল নিষিদ্ধ করা একমাত্র সমাধান হতে পারে না।

সবার আগে খতিয়ে দেখা উচিত, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সড়কে দুর্ঘটনার কারণ এবং তা থেকে পরিত্রাণ পেতে কী করণীয়। নিরাপদ সড়কের দাবি এখন পুরো জাতির। আর তার জন্যই আমাদের কাজ করা উচিত। আমরাও চাই প্রত্যেক মোটরসাইকেলচালক বৈধ লাইসেন্স ব্যবহার করুন। কিশোর বা অপ্রাপ্ত বয়সের কাউকেই মোটরসাইকেল চালাতে দেওয়া উচিত নয়। এসব বিষয়ে আমাদের সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। সেই সঙ্গে মোটরবাইকের মতো স্বাধীন যানবাহন নিয়ে যাতে মানুষ নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে এবং দেশে এ শিল্পের ব্যবসায়িক সমৃদ্ধি ও প্রসার হয়, সে লক্ষ্যে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্তই সরকারের নেওয়া উচিত।

সরকার, গণমাধ্যম, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণ একযোগে কাজ করলেই কেবল দেশে নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন করা সম্ভব। নিয়ম মেনে ও নিজে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে মোটরসাইকেল চালালে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল চালকের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের রাস্তায় চলাচল ও অন্য পরিবহনের চালকদেরও সচেতনতা বাড়াতে হবে। কোনো কিছু বন্ধ করে দেওয়া একমাত্র সমাধান হতে পারে না। আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণে যেকোনো সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি যাঁদের জীবন ও জীবিকার স্বার্থে এ মোটরসাইকেল ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেই বিশাল গোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে সামগ্রিকভাবে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া সময়োচিত দাবি বলে মনে করি।

বিপ্লব কুমার রায় সিইও, টিভিএস অটো বাংলাদেশ লিমিটেড

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন