চায়না দুয়ারি জালে মাছ শিকার বন্ধ করা কি অসম্ভব

মৎস্য সুরক্ষা আইনে চায়না দুয়ারি জাল তৈরি করা, বহন করা, বাজারজাত করা, এই জালে মাছ শিকার করা এবং বৈদ্যুতিক শকে মাছ ধরা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু চায়না দুয়ারি ও বৈদ্যুতিক শকে সারা দেশে এখন অনেকেই প্রচুর মাছ শিকার করছেন। চায়না দুয়ারি জাল ও বৈদ্যুতিক শকে মাছ নিধন বন্ধ কি অসম্ভব—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন তুহিন ওয়াদুদ

চায়না দুয়ারি জাল নিষিদ্ধের দাবিতে রাজশাহীর সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে জেলেদের মানববন্ধন
ছবি: প্রথম আলো

লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলায় শৌখিন মাছশিকারি আবদুল করিম চাচার বাড়ি। তিনি প্রায় ৩৫ বছর ধরে বড়শি দিয়ে মাছ শিকার করেন। তিনি বলেন, ‘তিস্তা, সানিয়াজান, বুড়িতিস্তা এবং ধরলা নদীতে আগে বড়-ছোট প্রচুর মাছ ছিল। এখন আর আগের মতো মাছ নেই। যেসব মাছ পানির বেশি নিচ দিয়ে চলে, সেগুলো বিলুপ্ত হচ্ছে চায়না দুয়ারি জালে আর কম গভীর দিয়ে চলে যেসব মাছ, সেগুলো শেষ হচ্ছে আইপিএসের (বৈদ্যুতিক শক) ফাঁদে।’

চায়না দুয়ারি জাল মাছ ধরার বিশেষ একটি ফাঁদ। লোহার গোল বা চার কোনা রিং আর নেট দিয়ে এই জাল তৈরি করা হয়। খুব ছোট ফাঁসওয়ালা জাল দিয়ে লোহার রিং ঘিরে দেওয়া হয়। সেটার ভেতরে মাছ ঢোকার অনেকগুলো পথ আছে, কিন্তু মাছ বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। আবদুল করিম চাচা বলছিলেন, ‘অনেকগুলো দুয়ার থাকার কারণে এটাকে চায়না দুয়ারি জাল বলে।’ অনেকে রিং জালও বলেন।

ব্যাটারি, রড আর নেট দিয়ে বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতেও মাছ ধরা হয়। এ পদ্ধতিতে কয়েক মিটার অংশজুড়ে পানি বিদ্যুতায়িত করা হয়। যে অংশে পানি বিদ্যুতায়িত হয়, সেই স্থানের তাৎক্ষণিক অসুস্থ হয়ে পড়ে, অনেক মাছ মারাও যায়। বিশেষ করে যখন মা মাছ অনেক পোনা নিয়ে একসঙ্গে চলে, তখন সেখানে পানি বিদ্যুতায়িত করলে ঝাঁকের সব পোনাই মারা যায়। বিদ্যুতায়িত অংশে কেবল মাছ নয়, যেসব জলজ প্রাণী থাকে, তার সবটাই মারা যায়।

২.

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেক ধরনের মাছ ধরা ফাঁদের বিজ্ঞাপন দেখছি। সেগুলো প্লাস্টিকে তৈরি। পানির নিচে ফেলে রাখা হয়। চায়না দুয়ারি জালের মতোই মাছ ঢোকার অনেকগুলো পথ আছে, বের হওয়ার পথ নেই। দেখে মনে হচ্ছে, এই ফাঁদও আমাদের মৎস্য আইনে নিষিদ্ধ ফাঁদ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ, ছোট পোনাসহ বিভিন্ন পোকামাকড় মারা যাবে এই ফাঁদে। এই ফাঁদ বিক্রির বিজ্ঞাপন বন্ধ করা জরুরি।

বৈদ্যুতিক শকে এবং চায়না দুয়ারি জালে ছেয়ে গেছে গোটা দেশ। সারা দেশে এখন অনেকেই চায়না দুয়ারি জালে প্রচুর মাছ শিকার করছেন। ধারণা করি, দেশে এমন কোনো জলমহাল বা নদী নেই, যেখানে চায়না দুয়ারি জাল নামানো হয়নি। একেকটি বড় জলমহালে বা নদীতে কয়েক শ চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে মাছ শিকার করা হয়।

বৈদ্যুতিক শকে মাছ শিকারও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বছরখানেক আগের কথা। কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়েছিলাম। আমাদের নৌকা থেকে দূরে দেখছিলাম, একটি ছোট নৌকায় দুটি ছেলে কিছু একটা করছে। পরে আমাদের নৌকার মাঝির কাছে জানতে পারলাম, বৈদ্যুতিক শকে মাছ শিকার করছে। আমাদের নৌকা তাদের উদ্দেশে চালাতে থাকলে তাদের নৌকা আরও ক্ষিপ্রগতিতে দূরে চলে যায়।

অনেকে মনে করেন, বৈদ্যুতিক শকে শিকার করা মাছ খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। মাস দুয়েক আগে নীলফামারী জেলার তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় দেখলাম ছোট-বড় বৈরালি মাছ বিক্রি হচ্ছে। আমার সঙ্গে থাকা স্থানীয় এক ব্যক্তি বললেন, বড় বৈরালি মাছ কেনা যাবে না। কারণ হিসেবে তিনি বললেন, বড় বৈরালিগুলো বৈদ্যুতিক শকে মারা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, যেহেতু মাছগুলো বিদ্যুতায়িত করে মারা হয়েছে, সেগুলো খেলে শরীরের ক্ষতি হতে পারে।

কী পরিমাণ মানুষ বৈদ্যুতিক শকে তিস্তা নদীতে মাছ শিকার করে—এ প্রশ্ন করলে একজন জানালেন, এ হিসাব দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সম্পূর্ণ তিস্তা নদীতেই এ পদ্ধতিতে মাছ ধরা মানুষের সংখ্যা শত শত হতে পারে বলেও একজন মন্তব্য করলেন।

আমাদের দেশে প্রকৃত অর্থে কোনো নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি। এর কারণ, যাঁদের এ জাল নিষিদ্ধ করার কথা, তাঁরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

৩.

নিষিদ্ধ জাল বন্ধে পুরোনো কৌশলে চায়না দুয়ারি জাল কিংবা বৈদ্যুতিক শকে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়। চায়না দুয়ারি জাল বন্ধ করার ক্ষেত্রে আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে মাঝেমধ্যে সরব হতে দেখি। তারা সদলবল যেখানে জাল পেতে রাখা হয়, সেখানে যায়। তারপর পানির নিচ থেকে কিছু জাল তুলে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। চায়না দুয়ারি জাল বন্ধে এটুকুই চেষ্টা। কে জাল পেতেছে, কোথা থেকে জাল কিনেছে, এগুলোর আর কোনো অনুসন্ধান নেই। দু-একবার অপরাধীকে ধরতে দেখেছি।

চায়না দুয়ারি জালে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। প্রশাসনের পক্ষে জালে আগুন দেওয়া হলে জালওয়ালারা আবারও বাজার থেকে জাল কিনে আনেন এবং তাঁদের মাছ ধরা কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। এক দিনের জন্যও মাছ ধরা বন্ধ থাকে না। অনেক স্থানেই এ ঘটনা দেখেছি।

সাধারণ মাছশিকারিদের কাছে রাষ্ট্র অসহায় কিংবা রাষ্ট্র এ কাজ বন্ধ করতে পারবে না—এ ধারণা অমূলক। সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তি চাইলে চায়না দুয়ারি জালসহ যত নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে মাছ শিকার করা হয়, তার সবটাই বন্ধ করা সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পানির নিচ থেকে সব জাল তুলতে পারেন না। কারণ, পানির নিচ থেকে জাল তুলতে হলে যে পরিশ্রম করতে হয় কিংবা যত শ্রমিক নিতে হয়, তা তাঁরা করবেন না।

নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বন্ধ করা মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের বাস্তবে যেন কিছুই করার নেই। তাঁরা কেবল মৌখিকভাবে নিষেধ করতে পারেন।

খুব বেশি হলে উপজেলা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করতে পারেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব বন্ধ করার জন্য।

মৎস্য কর্মকর্তার কথায় গুরুত্ব দিয়ে এক-আধদিন সরেজমিন এসি ল্যান্ড বা ইউএনও যাবেন কি না, সেটি তাঁদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। মৎস্য কর্মকর্তার অনুরোধে তাঁরা যেতে বাধ্য নন। উপজেলা, জেলা কিংবা বিভাগীয় মৎস্য কর্মকর্তাকেউই মাছের নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না। তবে মৎস্য বিভাগ দেশজুড়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। সেই সচেতনতা সৃষ্টির জন্য মৎস্য বিভাগকে তেমন সক্রিয় হতে দেখা যায় না।

৪.

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা চাইলে কিছুটা ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। তা-ও পরোক্ষভাবে। যেহেতু জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হওয়ার অর্থ তা পরিবেশের জন্য ক্ষতি—এ অর্থে তাঁরা মামলা করতে পারেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যেখানে প্রত্যক্ষভাবে পরিবেশের বড় বড় ক্ষতি হলেও মামলা করেন না, সেখানে মৎস্য কিংবা অপরাপর পোকামাকড় সুরক্ষার জন্য মামলা করবেন, তা আশা করা যায় না।

নদীর ভাঙনরোধে কিংবা খননের কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বেশ কয়েকটি সরকারি সংস্থা যুক্ত থাকলেও নদী যদি মাছশূন্য হয়, তাতেও এসব সংস্থার কিছু করার নেই। পানির জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তাদের কোনো ক্ষমতা দেওয়া নেই।

নদ-নদী, খাল-বিল-জলাশয় দেখভাল করার প্রধানত দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। জেলা প্রশাসন কিংবা তার অধীন উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অসংখ্য কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তাঁরা নদী-খাল-বিল-জলাশয় সুরক্ষায় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। নদীর দখল-দূষণ কিংবা ব্যক্তির নামে নদী লিখে দেওয়াই বন্ধ করতে পারেন না যাঁরা, তাঁরা চায়না দুয়ারি জাল কিংবা বৈদ্যুতিক শকে মাছ ধরা বন্ধ করবেন কীভাবে?

চায়রা দুয়ারি জাল ও বৈদ্যুতিক শকে মাছ ধরা বন্ধ করা খুব কঠিন কিছুই নয়। কোন বিলে, কোন নদীতে কে কে কখন এসব জাল দিয়ে কিংবা বৈদ্যুতিক শকে মাছ ধরেন, এটি খুঁজে পাওয়া যায় সহজে।

গোপনে জাল বিক্রি হলেও এতটা গোপনীয়তার সঙ্গে বিক্রি হয় না যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আবার যাঁরা চায়না দুয়ারি জালে কিংবা বৈদ্যুতিক শকে মাছ ধরেন, তাঁরাও প্রকাশ্যে এ কাজ করেন।

যিনি বা যাঁরা এসব জাল বিক্রি করেন এবং ওই পদ্ধতিতে মাছ ধরেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকে সচেতন করতে হবে। সাধারণ জনগণ সচেতন হলে, প্রতিবাদ করলে কেউ চায়না দুয়ারি জাল কিংবা বৈদ্যুতিক শকে মাছ শিকার করতে পারবেন না।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের চিংড়ি চাষ প্রকল্পের প্রধান ফরিদুল ইসলামের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘যারা অভাবের কারণে নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে মাছ ধরে, তাদের অভাব দূর করতে হবে এবং সচেতন করতে হবে। আর যারা অভাবে নয়, স্বভাবে এভাবে মাছ ধরছে, তাদের বিরুদ্ধে শক্ত আইন প্রয়োগ করতে হবে। নয়তো প্রাকৃতিক উৎস থেকে যে মাছ পাওয়া যেত, ভবিষ্যতে আর পাওয়া যাবে না।’

দেশি মাছের অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন যে আমাদের আগামী প্রজন্ম এ মাছ বাস্তবে দেখতে পারবে কি না, সন্দেহ। ছবি দেখেই হয়তো তারা মাছ চিনবে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

৫.

মৎস্য সুরক্ষা আইন আছে। এ আইনে চায়না দুয়ারি জাল তৈরি করা, বহন করা, বাজারজাত করা, এই জালে মাছ শিকার করা এবং বৈদ্যুতিক শকে মাছ ধরা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ আইন প্রয়োগ করে মাছ ধরার ক্ষেত্রে উল্লেখিত অপরাধ রোধ করা সম্ভব। এ আইনের প্রয়োগ যথাযথ না হওয়ায় এসব অপরাধকে অপরাধীরা ঠুনকো জ্ঞান করছেন।

বিদ্যমান আইনটিকে আরও কার্যকর হিসেবে সংশোধন করা প্রয়োজন। মৎস্য বিভাগকে অভিযান পরিচালনাপূর্বক দণ্ড প্রদান করার ক্ষমতা দিতে হবে, নয়তো মৎস্য বিভাগ মৎস্য সুরক্ষায় কোনো ভূমিকাই রাখতে পারবে না। যাদের ওপর মৎস্য সুরক্ষার দায়িত্ব থাকবে, তারা ব্যর্থ হলে তাদের জবাবদিহিও বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সাধারণ মাছশিকারিদের কাছে রাষ্ট্র অসহায় কিংবা রাষ্ট্র এ কাজ বন্ধ করতে পারবে না—এ ধারণা অমূলক। সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তি চাইলে চায়না দুয়ারি জালসহ যত নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে মাছ শিকার করা হয়, তার সবটাই বন্ধ করা সম্ভব। প্রত্যাশা করি, সরকার প্রাকৃতিক উৎসের মাছসহ ছোট জলজ প্রাণী সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

  • তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক

    মতামত লেখকের নিজস্ব