ভারত কেন ইসরায়েলের হাইফা দিবস পালন করে?  

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।ফাইল ছবি: রয়টার্স

২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর ২৩ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল ‘হাইফা দিবস’ পালন করে আসছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৮ সালের ‘হাইফা যুদ্ধে’ যে ভারতীয় সৈন্যরা অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের স্মরণে এই পালন।

তবে ১৫ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ফিলিস্তিন দূতাবাস ভারতীয় সংসদ সদস্যদের কাছে একটি চিঠি পাঠায় এবং ১৮ সেপ্টেম্বর তাদের নিজস্ব প্রাঙ্গণে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করে। এই চিঠি ও প্রামাণ্যচিত্রের মূল বক্তব্য—ফিলিস্তিনের শহর হাইফায় তৎকালীন ব্রিটিশ বাহিনীর দখলদারত্বকে ইসরায়েল যেভাবে ‘মুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে এবং ভারতের সঙ্গে তাদের ‘ভাগ করে নেওয়া ইতিহাস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, তা নিয়ে আপত্তি তোলা।

আরও পড়ুন

হাইফার যুদ্ধ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগে, ১৯১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সিনাই ও ফিলিস্তিন অভিযানের অংশ হিসেবে ব্রিটিশ, ফরাসি ও ইতালির বাহিনী আরব বিদ্রোহের পাশাপাশি উসমানীয় (অটোমান), জার্মান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

অটোমান বাহিনীকে সহায়তা করছিল জার্মান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় কামানের ব্যূহ। জেনারেল অ্যালেনবির অধীন ব্রিটিশ কমান্ড ১৫তম ইম্পেরিয়াল সার্ভিস ক্যাভালরি ব্রিগেডকে পাঠায়, যার বেশির ভাগ সদস্যই ছিলেন ভারতের তৎকালীন যোধপুর, মহীশূর ও হায়দরাবাদ রাজ্যের সৈন্য।

মূল সম্মুখ–আক্রমণের দায়িত্ব ছিল ‘যোধপুর ল্যান্সার্স’-এর ওপর। আর ‘মহীশূর ল্যান্সার্স’ পূর্ব ও উত্তর দিক থেকে আক্রমণের জন্য কারমেল পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে উঠে অস্ট্রিয়ান কামানগুলোকে অকার্যকর করে দেয়, যা না করলে অশ্বারোহী বাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।

সেদিন যোধপুর ল্যান্সার্সের নেতৃত্বে ছিলেন মেজর দলপত সিং শেখাওয়াত, যিনি যুদ্ধে নিহত হন। অটোমান বাহিনী শেষ পর্যন্ত ছত্রভঙ্গ হয়ে শহরের স্কয়ারের দিকে পালিয়ে যায় এবং আত্মসমর্পণ করে।

হাইফাকে ভারত-ইসরায়েল বন্ধুত্বের মূল প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা ভারতীয় মুসলিমদের সেই জটিল ইতিহাসকে যেমন আড়াল করে, তেমনি দেশে মুসলিমদের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিকেও বাড়িয়ে তোলে।

মুক্তি নাকি দখলদারত্ব

ফিলিস্তিনি দূতাবাসের চিঠির মূল প্রশ্নটি ছিল: হাইফার যুদ্ধ যদি একটি ‘মুক্তিযুদ্ধ’ হয়ে থাকে, তবে হাইফাকে কার কাছ থেকে মুক্ত করা হয়েছিল?

চিঠিতে বলা হয়, ‘ব্রিটিশ সামরিক ও সংসদীয় নথিগুলোয় যখন ফিলিস্তিন দখলের এ অভিযান বর্ণনা করা হয়েছে, তখন তারা ‘মুক্তি’ শব্দের বদলে ‘দখল’ বা ‘জয়’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছে। সামরিক বিজয়ের পর এ অঞ্চলকে অকুপায়েড এনিমি টেরিটরি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ওইটিএ) অধীন শাসন করা হতো। অর্থাৎ মিত্রবাহিনী ফিলিস্তিনকে শত্রু–ভূখণ্ড হিসেবে দখল করে সামরিক শাসনের অধীন রেখেছিল।’

এমনকি ভারতের নিজস্ব ঐতিহাসিক নথিতেও হাইফা ‘মুক্ত’ হওয়ার কোনো উল্লেখ নেই। ২০১৪ সালের সরকারি প্রকাশনা ‘ইন্ডিয়ান ওয়ার মেমোরিয়ালস অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে চিঠিতে বলা হয়, সেখানে লেখা আছে, ‘যোধপুর ল্যান্সার্সের অশ্বারোহী আক্রমণের মাধ্যমে দুর্গঘেরা হাইফা শহরের পতন ঘটে’ এবং তারা ‘শহরটি দখল করে নেয়’।

নয়াদিল্লির ‘তিন মূর্তি মেমোরিয়াল’, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত শহীদ ভারতীয় সৈন্যদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সেখানেও ‘হাইফার মুক্তি’–সংক্রান্ত কোনো খোদাই করা লেখা নেই।

চিঠিতে সরাসরি বলা হয়, ‘ভারতে যা উপনিবেশকারী শক্তি ছিল, ফিলিস্তিনে প্রবেশ করার পর তা কোনো ‘মুক্তিদাতা বাহিনী’ হতে পারে না।’

ইসরায়েলি হামলায় গাজা শহর যেন ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে।
ফাইল ছবি: রয়টার্স

যে সিদ্ধান্ত ভারত নেয়নি

চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘ভারতীয় সৈন্যদের এই সেবাকে সেই সময়ের ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার আলোকেই দেখতে হবে...যেখানে হাজার হাজার সৈন্যকে উপনিবেশ থেকে আনা হয়েছিল। যদিও নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে “স্বেচ্ছাসেবক” বলা হতো, কিন্তু পুরো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করত ব্রিটিশরা।’

ফিলিস্তিনি দূতাবাসের মতে, ‘পেছন ফিরে ইতিহাসকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যে “ভারতীয় সৈন্যরা হাইফাকে মুক্ত করেছিল”, তা মূলত ভারতের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সার্বভৌম অধিকারকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে। কারণ, তৎকালীন পরিস্থিতিতে ভারতের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতা ছিল না।’

আরও পড়ুন

একটি ঐতিহাসিক বৈপরীত্য

চিঠিতে ভারতীয় সৈন্যদের আত্মত্যাগ ও স্মৃতির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং নিজেদের ইতিহাস ও শহীদদের স্মরণ করার জন্য ভারতের সার্বভৌম অধিকারকে সম্মান জানিয়েই মূল বৈপরীত্যটি তুলে ধরা হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ভারতীয় সৈন্যদের বিপুল আত্মত্যাগের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ব্রিটিশরা পাস করে নৃশংস ‘রাউলাট আইন’, যার জেরে ঘটেছিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড।

ফিলিস্তিন বিষয়ে মহাত্মা গান্ধীর বিখ্যাত উক্তিও চিঠিতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়: ‘ইংল্যান্ড যেমন ইংরেজদের, ফিলিস্তিনও তেমনই আরবদের।’

১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে যখন রেজোল্যুশন ১৮১-এর মাধ্যমে হাইফাকে ইহুদি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, ভারত তার বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল। তাহলে ১৯৪৭ সালে হাইফাকে ‘ইসরায়েল’ রাষ্ট্রের অংশ করার বিরোধিতা করে আজ কীভাবে ভারত তার নিজস্ব সৈন্যদের দিয়ে হাইফার তথাকথিত ‘মুক্তি’-কে ইসরায়েলের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে মেনে নিতে পারে?

চিঠিতে প্রশ্ন তোলা হয়, ‘আনুষ্ঠানিক ভারতীয় নথিতে দেখা যায়, রামলেহ, গাজা, দেইর আল-বালাহ ও হাইফায় ভারতীয় সৈন্যরা সমাহিত আছেন। হাইফা যদি “মুক্তি” হয়ে থাকে, তবে অন্যগুলোও কি মুক্তি? কিন্তু এমন ব্যাখ্যা এই দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সঙ্গে মেলানো কঠিন।’

হাইফার যুদ্ধটি ঘটেছিল বেলফোর ঘোষণার এক বছরের কম সময়ের মধ্যে। চিঠিতে এ যুদ্ধকে ফিলিস্তিনিদের ‘নাকবা’ বা বিপর্যয়ের ধারাবাহিক ঘটনার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

‘ভারতীয় সৈন্যদের ভূমিকা যদি এখন পেছন ফিরে “হাইফার মুক্তি” হিসেবে দেখানো হয়, তবে তা ইতিহাস ও তার রাজনৈতিক, নৈতিক ও আইনি পরিণতির সঙ্গে ভারতীয় সৈন্যদের জড়িয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে।’

আরএসএস বাহিনীর প্রশিক্ষণের দৃশ্য
ফাইল ছবি

হিন্দুত্ববাদের বয়ান

২০১৪ সাল থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক বয়ানে ‘হাইফা’ শব্দটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে নেতানিয়াহুর ভারত সফরের সময় মোদি ও নেতানিয়াহু যৌথভাবে ‘তিন মূর্তি চক’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘তিন মূর্তি হাইফা চক’ রাখেন। এর এক বছর আগে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি ইসরায়েল সফর করেন এবং সেখানকার ভারতীয় সিমেট্রিতে শ্রদ্ধা জানান।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলি নেসেটে দেওয়া ভাষণে মোদি বলেন, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক রক্ত ও আত্মত্যাগে লেখা।’ বিজেপি ইসরায়েলের সঙ্গে একটি শক্তিশালী আদর্শিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, যার মূলে রয়েছে হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলায় উভয় দেশের অনুরূপ মনোভাব।

তবে হাইফার যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাজনৈতিক মাত্রা রয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের হয়ে অটোমান খিলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার তীব্র বিরোধিতা করেছিল ভারতের মুসলিমরা, যা পরে ‘খিলাফত আন্দোলন’ (১৯১৯-১৯২৪) নামে তৎকালীন ঔপনিবেশিক ভারতের অন্যতম বড় গণ–আন্দোলনে রূপ নেয়।

ফলে হাইফাকে ভারত-ইসরায়েল বন্ধুত্বের মূল প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা ভারতীয় মুসলিমদের সেই জটিল ইতিহাসকে যেমন আড়াল করে, তেমনি দেশে মুসলিমদের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিকেও বাড়িয়ে তোলে।

  • রামশা সার্তাজ দ্য ওয়ারের সাংবাদিক।

  • দ্য ওয়ার থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।