বাংলাদেশ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন যে নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করেছেন, এর শব্দসংখ্যা ২০৪। ২৪ মে ঘোষণা বিষয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার। তাঁর ৪০ দশমিক ৯ সেকেন্ডের ভিডিওটি ‘ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট ডেইলি প্রেস ব্রিফিং-মে ২৪, ২০২৩’ শিরোনামে ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। এ প্রেস ব্রিফিংয়ের স্থিতি ছিল ৪০ দশমিক ৯ সেকেন্ড, যার প্রথম দিকে ৪ দশমিক ৩২ সেকেন্ডজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসা নীতি প্রসঙ্গ।
ভিসা নীতি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর চ্যানেল আইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটি যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকা দূতাবাস সাইটে আপলোড করেছে (<https: //bd. usembassy. gov/bn/29790-bn/>)। এ সাক্ষাৎকারের স্থিতি ৭ দশমিক ২৩ সেকেন্ড।
এ নীতি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিব্যক্তি বুঝতে হলে শুধু অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের ২০৪ শব্দের ঘোষণার টেক্সটটি পড়লে হবে না; সঙ্গে দেখতে হবে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলারের ভিজ্যুয়াল অভিব্যক্তি। ডোনাল্ড লু ও ম্যাথিউ মিলারের ভিজ্যুয়াল অভিব্যক্তির মধ্যে রয়েছে বিশেষ অর্থময়তা। বাড়তি সংযুক্তি। প্রথমে নতুন ভিসা ঘোষণার টেক্সটের ভাবগত ক্রমিক দেখে তুলে ধরা হলো:
প্রথমত. নীতির অভিলক্ষ্য: অবাধ, স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের লক্ষ্যে এ নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করা হলো;
দ্বিতীয়ত. নীতি লঙ্ঘন ও অভিযুক্ত: যেকোনো বাংলাদেশি, যারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী বা জড়িত থাকবে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর ভিসা প্রদানে বিধিনিষেধ আরোপ করতে সক্ষম হবে;
তৃতীয়ত. অভিযুক্ত সুনির্দিষ্ট ধরন: এর মধ্যে রয়েছে বর্তমান ও সাবেক বাংলাদেশি কর্মকর্তা/কর্মচারী, সরকারপন্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং আইন প্রয়োগকারী, বিচার বিভাগ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য;
পঞ্চতম. আগাম সতর্কতা: ৩ মে ২০২৩ বাংলাদেশ সরকারকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে;
ষষ্ঠত. নির্বাচনপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্তকরণের ধরন সুনির্দিষ্টকরণ: ভোট কারচুপি, ভোটারদের ভয় দেখানো, সহিংসতার মাধ্যমে জনগণকে সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার প্রয়োগ করতে বাধা দেওয়া এবং বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল, ভোটার, সুশীল সমাজ বা গণমাধ্যমকে তাদের মতামত প্রচার করা থেকে বিরত রাখা।
সপ্তমত. অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে ভূমিকা সুনির্দিষ্টকরণ: অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ভোটার, রাজনৈতিক দল, সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমসহ সবার।
অষ্টম. অভিলক্ষ্য পুনর্ব্যক্তকরণ: যারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে চায়, তাদের সবাইকে আমাদের সমর্থন দিতে আমি এই নীতি ঘোষণা করছি।
টেক্সটের অনুবিশ্লেষণ
এ ঘোষণার বড় অংশের পাঠ দুর্ভেদ্য নয়, সহজ। তবে কোনো কোনো অংশ, যেমন বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তার বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি ভিন্নমাত্রায় অর্থ দিচ্ছে। এ দুটি বিভাগ বিশেষ বৈশিষ্ট্যসূচক। নতুন ভিসা নীতি ঘোষণায় এ দুটি বিভাগের অন্তর্ভুক্তি কি রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতার ভিন্ন ইঙ্গিত বহন করছে?
যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকা দূতাবাস সাইটে বাংলাদেশের নির্বাচনের সমর্থনে ভিসা নীতি সম্পর্কে সচরাচর জিজ্ঞাস্য অংশে উল্লেখ করেছে—গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী বা জড়িত ব্যক্তিদের নিকটতম পরিবারের সদস্যদের ভিসা বিধিনিষেধের আওতাভুক্ত হবে, যা ঘোষিত মূলনীতি অংশ উল্লেখ নেই। ঢাকা দূতাবাস এ ব্যাখ্যা দিয়েছে।
রাজনৈতিক নেতা, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়ী অনেকের সন্তান, আত্মীয়স্বজন পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত কাজে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। এমনকি সেখানে অনেকের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে ভয়টি আসলে সুবিধাভোগী শ্রেণির জন্য, যারা রাষ্ট্রের আনুকূল্যে বিগত দিনে পুষ্ট হয়েছে। এ শ্রেণি তাদের স্বার্থের উপযোগী শাসন চায়। নতুন ভিসা নীতি তাঁদের জন্য ভীতি সৃষ্টি করবে।
কারা হবেন অভিযুক্ত
রাজনৈতিক নেতা, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়ী অনেকের সন্তান, আত্মীয়স্বজন পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত কাজে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। এমনকি সেখানে অনেকের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে ভয়টি আসলে সুবিধাভোগী শ্রেণির জন্য, যারা রাষ্ট্রের আনুকূল্যে বিগত দিনে পুষ্ট হয়েছে। এ শ্রেণি তাদের স্বার্থের উপযোগী শাসন চায়। নতুন ভিসা নীতি তাঁদের জন্য ভীতি সৃষ্টি করবে।
ঘোষণার টেক্সট বিশ্লেষণ থেকে আরও দেখা যাচ্ছে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য যে বা যারা দায়ী বা জড়িত থাকবে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভিসা দেবে না। কিন্তু একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের দায় তো কার্যত সরকারের ওপর বর্তায়। সাধারণ নাগরিক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের দায়িত্বও কি সমান? জাতীয় নির্বাচন বাধাদানের সম্ভাব্য শাস্তি কি সমান হবে?
গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম কীভাবে বিবেচনা করা হবে
গণতান্ত্রিক দাবিদাওয়া আদায়ে সমাবেশ, পাল্টা সমাবেশ আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। রাজনৈতিক সভাসমাবেশ যে জাতীয় নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার তৎপরতা হিসেবে দেখা হবে না, তার নিশ্চয়তা কি থাকছে? রাজনৈতিক গতিশীলতা ছাড়া কি নির্বাচন সম্ভব?
ঘোষণাটি কী প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হবে, সে সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি; যেমন বাধাদানকারীদের কীভাবে চিহ্নিত করা হবে বা কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হবে, তার উল্লেখ নেই। তবে কি এ নীতি বাস্তবায়নে নতুন করে কর্মকৌশল ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে যুক্তরাষ্ট্র?
ম্যাথিউ মিলারের প্রেস ব্রিফিং: তাড়াহুড়ার প্রবণতা
গত ২৪ এপ্রিল স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলারের প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় বেশ তাড়াহুড়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে (https: //www. youtube. com/watch? v=PaMF3PJ6ANA&t=275s)। তাঁর কথা শোনা যাচ্ছে, অনুষঙ্গগুলো পড়া যাচ্ছে। কিন্তু পড়া যাচ্ছে না তাঁর শরীরী ভাষা। মুখের অভিব্যক্তিতে কিছুটা উৎকণ্ঠার ছাপ লক্ষ করা গেছে। সাংবাদিকদের প্রশ্ন শোনার ব্যাপারে তাঁকে যথেষ্ট মনোযোগী মনে হয়নি। তিনি ঘোষণাটি পড়ার পর সম্পূরকসহ মোট তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।
একজন সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছেন, বাংলাদেশের ওপর তো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে না? তাই না? ম্যাথিউ মিলার উত্তরে বলেন, ঠিক। তিনি পাল্টা যোগ করেন, আপনারা সব জায়গায় এ কাজ করছেন; কিন্তু আপনারা তো চূড়ান্তভাবে নিষেধাজ্ঞা দেন না। তিনি আরও জানতে চান, তবে এটি কি প্রতীকী ব্যাপার? উত্তরে ম্যাথিউ মিলার বলেন, বাংলাদেশের ওপর কোনো ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে না। গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়া অবাধ, স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ করতে এটি একটি ‘সিগন্যাল’।
তিনি ‘সিগন্যাল’ বা সতর্কবার্তা শব্দটি ব্যবহার করেন। আরেকজন সাংবাদিক জানতে চান, তাহলে বিষয়টি কী ‘ওয়াচ ইট আউট’ বা সর্তকতামূলক? তিনি ‘হ্যাঁ’সূচক উত্তর দেন। ম্যাথিউ মিলারের টেক্সচুয়াল উপস্থাপনা ছিল খুবই গতানুগতিক। তাঁর শরীরী ভাষা থেকে আলাদা কোনো অর্থ উদ্ধার করা যায়নি।
চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে ডোনাল্ড লুর সাক্ষাৎকার
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু নতুন ভিসা নীতি ঘোষণার পর চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মিলিত হন (https: //bd. usembassy. gov/bn/29801-bn/)। এ সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড লুকে সপ্রতিভ, আস্থাশীল, বিষয়নিষ্ঠ বলে মনে হয়েছে। কণ্ঠস্বর স্পষ্ট। শোনার দক্ষতা রয়েছে। প্রশ্ন শুনে ও বুঝে উত্তর দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।
ডোনাল্ড লু যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাচনিক ও অবাচনিক—দুই ধরনের অভিব্যক্তির মিশেল ঘটিয়েছেন, যা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। হাতের আঙুল গুনেছেন এবং তালুর উন্মুক্ততা ও বদ্ধতা যুগপৎভাবে উদার ও রক্ষণশীল মনোভাব ফুটিয়ে তুলেছে। সাক্ষাৎকারে তাঁকে কখনো নমনীয় কখনো খুব দৃঢ় মনে হয়েছে। তিনি ঘোষণাটির ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, এ নীতি সবার জন্য প্রযোজ্য। এটি ফরোয়ার্ড লুকিং পলিসি। তিনি এটিকে গঠনমূলক ও ইতিবাচকভাবে নেওয়ার আহ্বান জানান।
সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া
উল্লেখিত টেক্সট ও বাচনিক–অবাচনিক যোগাযোগ থেকে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, এটি সরকার, বিরোধী বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠী বা দলের জন্য ঘোষণা নয়। এটি নির্বাচনপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে যাঁরা নির্দেশ দেবেন এবং যাঁরা নির্দেশ বাস্তবায়ন করবেন, সবার জন্য প্রযোজ্য হবে।
প্রাথমিকভাবে এ ঘোষণার অধিক্ষেত্র বাংলাদেশের জনগণ। পরবর্তী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র যাঁদের জাতীয় নির্বাচন বাধাদানের অভিযোগে চিহ্নিত করবেন এবং অভিযুক্ত হবেন, তাঁরা। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে যদি স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত পদ্ধতি অনুসৃত না হয়, তবে বিষয়টি অধিকতর জটিলতার দিকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কূটনৈতিক দক্ষতা
বিষয় হলো, এ ধরনের ঘোষণাকে যতটুকু কূটনৈতিক দক্ষতা দিয়ে হ্যান্ডেল করা দরকার ছিল, ততটুকু হচ্ছে না। বরং দেখা যাচ্ছে অধিকতর প্রতিক্রিয়াশীলতা। নানা ধরনের পদক্ষেপ, বাগাড়ম্বরতা। সরকার ও বিরোধী পক্ষ উভয়েই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঘোষণাটি ব্যাখ্যা করছে। একপক্ষ অন্য পক্ষের ওপর চাপ বাড়বে বলে মন্তব্য করছে। ঘোষণার সারবত্তা আত্মীকরণে পেশাদারি উৎকর্ষের অভাব দেখা যাচ্ছে। আর কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এখনো সেই হাঁটি হাঁটি পা পা অবস্থা।
সুরক্ষিত হোক ভোটাধিকার
অবাধ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কোনো আকাশকুসুম চাওয়া নয়। এটি কোনো ঘোষণা বা শর্তনির্ভর বিষয় নয়। যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক কাজ হলো জনগণ যাতে শঙ্কাহীনভাবে নিজেদের সিদ্ধান্তে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে তা নিশ্চিত করা।
রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের মিথস্ক্রিয়া হয় ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে। নাগরিক ভোটাধিকারের সত্তা হারিয়ে ফেললে তার আর অবশিষ্ট কিছু থাকে না। এ কারণে রাষ্ট্র হয় জনশূন্য এক সত্তা।
সুরক্ষিত হোক ভোটাধিকার। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটুক। মানুষ নির্ধারণ করুক তাদের নেতৃত্ব। রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে মিলন ঘটুক। ভেদরেখা যাক মিলিয়ে।
খান মো. রবিউল আলম যোগাযোগবিশেষজ্ঞ