যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে অভিজ্ঞতার শত বছরের কাঠামো ভাঙছে কেন

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে পুরো বিশ্ব ব্যবস্থাটায় হুমকির মুখে পড়েছেছবি : রয়টার্স

বিশ্বরাজনীতিতে যাঁরা ক্ষমতার কেন্দ্র দখল করে আছেন, তাঁদের ভূমিকা বোঝার ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত তাকাই সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক প্রভাব কিংবা আদর্শিক অবস্থানের দিকে। কিন্তু এসব দৃশ্যমান উপাদানের আড়ালে আরও একটি সূক্ষ্ম অথচ গভীরভাবে প্রভাবশালী বিষয় রয়েছে। সেখানে কারা ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং সেখানে বয়স ও অভিজ্ঞতার ভারসাম্য কেমন, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়।

গত এক শ বছরের মার্কিন ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের চারপাশে প্রায় সব সময়ই ছিলেন বয়সে ও অভিজ্ঞতায় পরিণত এক নেতৃত্ব গোষ্ঠী। এই কাঠামো কেবল প্রশাসনিক সুবিধা নয়, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার এক নীরব ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে ২০২০-এর দশকের মাঝামাঝি এসে সেই দীর্ঘস্থায়ী ধারা হঠাৎ ভেঙে পড়েছে।

১৯২৫ সাল থেকে প্রায় এক শ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের (অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে যাঁরা ছিলেন—ভাইস প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী) সম্মিলিত বয়স সাধারণত ১৬০ থেকে ১৭৫ বছরের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে।

এটি কোনো কাকতালীয় সংখ্যা নয়। এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পার করেছে দুটি বিশ্বযুদ্ধ, শীতল যুদ্ধ, কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, এক মেরু বিশ্বব্যবস্থা, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং কোভিড মহামারির মতো ঘটনা।

প্রতিটি যুদ্ধে বা সংকটে প্রেসিডেন্টের পাশে ছিলেন এমন ব্যক্তিরা, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে কাজ করেছেন, আগের সংকট দেখেছেন এবং ভুলের মূল্য কী হতে পারে তা নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন।

কিন্তু ২০২৫ সাল থেকে শুরু হওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই ঐতিহাসিক ধারায় বড় ধরনের ছেদ ঘটে। ভাইস প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সম্মিলিত বয়স নেমে আসে প্রায় ১৪০ বছরে—যা পুরো এক শ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি কি কেবল প্রজন্মগত পরিবর্তন, নাকি একটি কাঠামোগত রূপান্তর?

মার্কিন ইতিহাসে অভিজ্ঞতা ছিল একধরনের অদৃশ্য রক্ষাকবচ। জন এফ কেনেডির বয়স কম হলেও কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট সামাল দিতে পেরেছিলেন অভিজ্ঞ উপদেষ্টাদের কারণে। বিল ক্লিনটনের প্রশাসনে শীতল যুদ্ধ-প্রশিক্ষিত কূটনীতিকেরা ন্যাটো সম্প্রসারণের মতো সিদ্ধান্তে ভারসাম্য এনেছিলেন। রোনাল্ড রিগ্যান, যাঁকে আদর্শগতভাবে কঠোর মনে করা হতো, বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এই ব্যবস্থা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করেনি; বরং সিদ্ধান্তকে আরও কার্যকর ও নিরাপদ করেছে। ফলে প্রেসিডেন্ট কখনো একা হয়ে পড়েননি।

এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে প্রেসিডেন্টের বয়স সাধারণত শীর্ষ নেতৃত্বের সম্মিলিত বয়সের ২৭-৪০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এর অর্থ—সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমষ্টিগত বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিগত ভুলে বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি কম এবং নীতিতে ধারাবাহিকতা।

কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের বয়স এই অনুপাতের ৫৬ শতাংশেরও বেশি। এটি এক শতাব্দীতে নজিরবিহীন। যদিও প্রেসিডেন্ট একাই সব সিদ্ধান্ত নেন না; তাঁর পাশে থাকে বিশাল উপদেষ্টা পরিষদ, কংগ্রেস, সামরিক ও কূটনৈতিক কাঠামো; তবু বাস্তবে ক্ষমতার ভার এখন অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত।

এই বয়স-অভিজ্ঞতার ওলট–পালট ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন বৈশ্বিক ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল ও অনিশ্চিত। চীন, রাশিয়া ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো একযোগে সক্রিয়। সংকটগুলো দ্রুত বদলাচ্ছে, ভুল সংশোধনের সময় আগের চেয়ে অনেক কম।

এই বাস্তবতায় অভিজ্ঞতার ঘাটতি বাড়লে ঝুঁকিও বাড়ে—শক্তি প্রয়োগকে সহজ সমাধান ভাবা, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব উপেক্ষা করা কিংবা প্রতিপক্ষের সীমা ভুলভাবে বোঝার আশঙ্কা তৈরি হয়।

নিশ্চয়ই তরুণ নেতৃত্ব মানেই ব্যর্থতা নয়। তাঁরা পুরোনো ধারণা ভাঙতে পারেন, প্রযুক্তিনির্ভর কূটনীতিতে এগোতে পারেন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন গতি আনতে পারেন। কিন্তু ইতিহাস দেখায়—অভিজ্ঞতা ছাড়া সাহস অনেক সময় ঝুঁকিতে পরিণত হয়।

এক শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির পেছনে ছিল অভিজ্ঞতার এক নীরব কাঠামো। আজ সেই কাঠামো বদলে যাচ্ছে। এটি পতনের ইঙ্গিত না হলেও ঝুঁকি যে বেড়েছে—তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা বয়স নয়; প্রশ্নটা হলো—ইতিহাস থেকে শেখার ক্ষমতা আছে কি না।

  • আরিফ মাহমুদ শৈবাল যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক

(মতামত লেখকের নিজস্ব)