স্নায়ুযুদ্ধের পর পূর্ব এশিয়ার তিন প্রধান শক্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং চীন। প্রাথমিক বাস্তববাদী বিবেচনা বলে, যুক্তরাষ্ট্রের তখন জাপানকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী একটি পুরোনো ভগ্নাংশ না ভেবে তার সঙ্গে মৈত্রী পুনরুজ্জীবিত করা উচিত ছিল। ২০০১ সালে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সদস্য হওয়ার অনেক আগে, ক্লিনটন প্রশাসন মার্কিন-জাপান জোটকে আবার গড়ে তোলা নিশ্চিত করেছিল, যা বাইডেনের কৌশলের ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে।

ক্লিনটন ও বুশ দুজনই বুঝতে পেরেছিলেন, চীনকে শীতল যুদ্ধের ধাঁচে নিয়ন্ত্রণে রাখা অসম্ভব হবে, কারণ অন্য দেশগুলো তত দিনে বিশাল চীনা বাজারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। এ কারণে চীনকে তাঁরা যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রেখে তাকে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র তখন এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চেয়েছিল, যেখানে চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তিও তার আচরণকে নতুন আদল দেবে। ক্লিনটনের নীতি অব্যাহত রেখে বুশ প্রশাসন বৈশ্বিক পণ্য ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবদান রাখতে চীনকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছিল। চীনকে তারা তৎকালীন মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট বি জোয়েলিকের ভাষায় ‘একটি দায়িত্বশীল অংশীজন’ বানানোর চেষ্টা করেছিল।

দায়িত্ব নেওয়ার আগে বাইডেন প্রশাসনের নতুন কৌশল নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত দুজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা লিখেছিলেন, ‘চীনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার ধারণার মূল ভুলটি ছিল এটি অনুমান করা যে এই সংযুক্তি চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং বৈদেশিক নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে।’ তাঁরা উপসংহার টেনেছেন এই বলে যে যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হলো, মার্কিন স্বার্থ এবং মূল্যবোধের অনুকূল শর্তে চীনের সঙ্গে সহাবস্থানের একটি স্থির অবস্থার সন্ধান করা।’

যুক্তরাষ্ট্রের নীতিটি ছিল ‘চীনকে যুক্ত করো, তবে ঘেরাও করে রেখে’; অর্থাৎ চীনকে বৈশ্বিক অগ্রগতির ধারায় যুক্ত করতে হবে কিন্তু তার সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দূরত্বও বজায় রাখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র আগে প্রত্যাশা করেছিল, সি চিন পিং যুগের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেশটিতে গণতন্ত্র আনতে না পারলেও বৃহত্তর উদারীকরণের আবহ তৈরি করবে। কিন্তু সি চিন পিং সে প্রত্যাশা ভেঙে দিয়েছেন। অল্প কিছু সময়ের জন্য চীন তার ভূখণ্ডে বিদেশিদের ভ্রমণে বৃহত্তর স্বাধীনতা দিয়েছিল, বিদেশি যোগাযোগ আগের চেয়ে বাড়িয়েছিল, সংবাদপত্রে বিস্তৃত মতামত প্রকাশ করতে দিয়েছিল এবং মানবাধিকারের প্রতি নিবেদিত কিছু এনজিওকে বিকশিত হতেও দিয়েছিল। কিন্তু তার সবকিছুই এখন ছেঁটে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দায়িত্ব নেওয়ার আগে বাইডেন প্রশাসনের নতুন কৌশল নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত দুজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা লিখেছিলেন, ‘চীনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার ধারণার মূল ভুলটি ছিল এটি অনুমান করা যে এই সংযুক্তি চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং বৈদেশিক নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে।’ তাঁরা উপসংহার টেনেছেন এই বলে যে যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হলো, মার্কিন স্বার্থ এবং মূল্যবোধের অনুকূল শর্তে চীনের সঙ্গে সহাবস্থানের একটি স্থির অবস্থার সন্ধান করা।’

এই শতাব্দীর প্রথম দশকে চীন বৃহত্তর উন্মুক্ততা, সংযম এবং বহুত্ববাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ইকোনমিস্ট পত্রিকার মতে, ‘মিস্টার সি যখন ২০১২ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন চীনে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছিল। মধ্যবিত্তদের সংখ্যা বাড়ছিল, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইভেট ফার্ম গড়ে উঠছিল এবং নাগরিকেরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সংযুক্ত হচ্ছিল। একজন ভিন্নমতের নেতা হয়তো এগুলোকে সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু মিস্টার সি এটিকে শুধুই হুমকি হিসেবে দেখেছেন।’

এখন যেহেতু সি চিন পিং তাঁর নতুন মেয়াদ নিশ্চিত করে অধিকতর রক্ষণশীলভাবে এগোচ্ছেন, সেহেতু যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সতর্কভাবে চীন নীতি তৈরি করতে হচ্ছে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

  • জোসেফ এস নাই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক