এই ‘ঐতিহাসিক’ ঘটনা ১৯৫০–এর দশকের। আর সেই ‘দোকানদার’ শেলীই হলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও আমাদের এই সময়ের কিংবদন্তি প্রয়াত বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।

চাকরি হারানোর পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন দোকানদারি করছেন—ছবিসহ এই খবর সংবাদমাধ্যমে ছাপা হওয়ার পর বিচারপতি হাবিবুর রহমানের সেই ঘটনার কথা মনে এল।

অবশ্য এই দুই ঘটনার মধ্যে ‘মিল আছে’ না বলে ‘সাযুজ্য আছে’ বলাই ভালো। কেননা হাবিবুর রহমান প্রতিবাদ করলেও নিজ বিভাগের অধ্যক্ষ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর যাতে বিব্রত না হন, সে জন্য তিনি নিজে পদত্যাগপত্র দাখিল করেছিলেন। তিনি ‘দোকানদারি’ করেছিলেন প্রতিবাদ হিসেবে; চাকরি খুইয়ে অর্থকষ্টে পড়ে নিতান্ত পেটের দায়ে নয়। কিন্তু চট্টগ্রামের ষোলশহর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মের পাশে যে ছোট একটি কনফেকশনারি দোকানে বসে শরীফ উদ্দিনকে দোকানদারি করতে হচ্ছে, তা স্রেফ জীবিকার প্রয়োজনে। দোকানটি তাঁর নিজেরও নয়। দোকানটির মালিক তাঁর ভাই। তিনি বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে সেখানে কাজ করছেন।

ছোটখাটো কনফেকশনারির দোকান চালানো বা এ ধরনের দোকানে কর্মচারীর কাজ করার মধ্যে অসম্মানের কিছু থাকতে পারে না (যদিও এ দেশে অনেকের কাছে উচ্চশিক্ষিত কিংবা কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করে আসা একজন ব্যক্তির এই পেশা বেছে নেওয়াকে একটু হলেও অস্বাভাবিক মনে হয়)।

জনমানসে এটি মোটামুটি প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কাজ করেই শরীফ আজ চাকরিচ্যুত। তাঁর পুরস্কার পাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি তিরস্কৃত হয়েছেন। এতে দুর্নীতিবাজরা উৎসাহিত হচ্ছেন। এই ভাষ্য বা বয়ান দীর্ঘ মেয়াদে সরকার তথা রাষ্ট্রের জন্য যে কত বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে, তা বলার মতো নয়।

কিন্তু সেই কাজের চেয়ে মহৎ এবং বৃহৎ পরিসরের জনস্বার্থ–সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তাকে যখন দৃশ্যমান যৌক্তিক ও ন্যায়ানুগ কারণ প্রদর্শন ছাড়াই সেই পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে এবং অন্য চাকরি পাওয়ার পথ রুদ্ধ করার মাধ্যমে তীব্র অর্থকষ্টে ফেলে দোকানদারি করতে বাধ্য করা হয়, তখনই সেই ঘটনা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখনই জনমানস ন্যায়-অন্যায়ের নৈতিক আদালতের বিচারক হয়ে ওঠে।

দেখা যাচ্ছে, সাড়ে সাত বছরের চাকরিজীবনের প্রথম ছয় বছরই বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর) শরীফ উদ্দিনকে দুদকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ‘অতি উত্তম’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন। তাঁকে তদন্তকাজে ‘অভিজ্ঞ’ এবং ‘উদ্যমী ও দক্ষ কর্মকর্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল দুদক। কিন্তু কক্সবাজারে ৭২টি প্রকল্পে সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার ভূমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি, কিছু রোহিঙ্গার এনআইডি ও পাসপোর্ট জালিয়াতি, কর্ণফুলী গ্যাসে অনিয়মসহ বেশ কিছু দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করার পরই তিনি দুদকের কাছে হয়ে যান ‘চলতি মানের’ কর্মকর্তা। তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়। চাকরিচ্যুতির কোনো কারণও দেখায়নি কর্তৃপক্ষ। শরীফ চাকরি ফিরে পাওয়ার আবেদন করলেও তিনি চাকরি পাননি। তিনি বলেছেন, বিভিন্ন জায়গায় চাকরির চেষ্টা করলেও প্রভাবশালীদের বাধার মুখে তা হচ্ছে না। সঞ্চয় যা ছিল সব এত দিনে শেষ হয়ে গেছে। ঘরে অসুস্থ বৃদ্ধ মা, স্ত্রী, সন্তান রয়েছে। তাই বড় ভাইয়ের দোকানে বসতে হয়েছে তাঁকে।

সরকারের দিক থেকে দুর্নীতির বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’-এর ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। দুদক যেন কোনো দুর্নীতিবাজকে না ছাড়ে, সে বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত যেসব খবরাখবর পাওয়া গেছে, তাতে মনে হচ্ছে, সরকারের সেই আদেশ যখন শরীফ উদ্দিন কারও চোখ রাঙানির পরোয়া না করে পালন করতে গেছেন, তখনই তাঁদের চক্ষুশূল হয়েছেন।

এর আগেও আমরা শরীফের মতো বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখেছি। অন্যদিকে, ‘মাসুদ, তুমি কি ভালো হবা না?’খ্যাত সর্বসম্মত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা একের পর এক পদোন্নতি পেয়ে বড় বড় গদিতে বসছেন। এতে ‘জিরো টলারেন্স’ কথাটার ফেস ভ্যালু জিরোতে এসে ঠেকছে এবং এটি ‘চোরকে চুরি করতে আর গেরস্তকে সজাগ থাকতে’ বলার নামান্তর হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

জনমানসে এটি মোটামুটি প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কাজ করেই শরীফ আজ চাকরিচ্যুত। তাঁর পুরস্কার পাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি তিরস্কৃত হয়েছেন। এতে দুর্নীতিবাজরা উৎসাহিত হচ্ছেন। এই ভাষ্য বা বয়ান দীর্ঘ মেয়াদে সরকার তথা রাষ্ট্রের জন্য যে কত বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে, তা বলার মতো নয়।

এই ভাষ্য যত গেড়ে বসবে, দুর্নীতিবাজেরা তত বেপরোয়া হবে, সৎ কর্মকর্তারা তত কোণঠাসা হবে। আর অনিবার্যভাবেই মানুষ ভাবতে বাধ্য হবে, এই পুরো পরিস্থিতি ক্ষমতাসীন রাজনীতিকেরাই কায়েমি স্বার্থ হাসিল করার জন্য ঠান্ডা মাথায় তৈরি করছে।

তাহলে কি আশাবাদের সুযোগ নেই? আছে। বেশ জোরালোভাবেই আছে। আশার খবর হলো, শরীফ উদ্দিনের দোকান চালানোর খবর প্রকাশের পর তাঁকে ৩৫টির বেশি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান চাকরির প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠান তাঁর কাছে নিয়োগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছে।

শরীফ উদ্দিন বলেছেন, তিনি শিগগিরই নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগ দেবেন। যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারবেন, সেখানে যুক্ত হবেন। লাখো কোটি ডলার পাচার হওয়ায় আজ বাংলাদেশ যে সংকটে পড়েছে, তার পেছনে শরীফ উদ্দিনদের মতো নির্ভীক কর্মকর্তাদের অভাব একটি বড় কারণ। এই সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য তাঁদেরই দুদকে দরকার। তাঁদের যদি দোকানদার বানিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ আরও খারাপ, এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়।

  • সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক

[email protected]