পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনে ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’

বিধানসভা নির্বাচনের আগে কলকাতার রাস্তায় এখন বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পতাকা। ১৫ মার্চ, ২০২৬ছবি: এএনআই

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর এখন নতুন একটি দৃশ্য তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং সেই সরকারের শপথের আগেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী অভিনন্দন জানিয়েছেন, উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছেন; পরে আনুষ্ঠানিক সফরের আমন্ত্রণও এসেছে।

ইতিপূর্বে যখন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে, সেই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা এসে শ্রদ্ধা জানানো, ভারতের সংসদে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ—এই সব সৌজন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দিল্লি নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক পথে ফেরাতে আগ্রহী। ঢাকা থেকেও পরিষ্কার বার্তা এসেছে যে নতুন সরকার পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়।

এই সব মিলিয়ে মনে হতে পারে সম্পর্ক এখন মোটামুটি স্থিতিশীল হওয়ার পথে এগোচ্ছে; অন্তত আগের মতো মুখোমুখি অবস্থা নেই। কিন্তু এখানেই যদি আমরা থেমে যাই, তাহলে বড় ছবি কিছুটা অধরা থেকে যায়। কারণ, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু দিল্লি আর ঢাকার সম্পর্ক না, এর মাঝে রয়েছে রাজ্য সরকার, সীমান্ত রাজনীতি, অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী সমীকরণ, মিডিয়ার ফ্রেমিং—সব মিলিয়ে এক জটিল অন্দরমহল। আর তাই বাংলাদেশের জন্য ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিকে নজর রাখা এখন ‘কূটনৈতিক বিলাসিতা’ নয়, বরং প্রয়োজনীয় কাজ।

আগামী এক-দেড় বছরে ভারত-বাংলাদেশ এজেন্ডায় কয়েকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসবে। তার অন্যতম গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি, যার মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কমে যাওয়া, উজানে নতুন প্রকল্প—সব মিলিয়ে গঙ্গা এখন কেবল কৌশলগত পানি ভাগাভাগির বিষয় না, বরং পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, কৃষক আন্দোলন, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।

একইভাবে তিস্তা নিয়ে বছরের পর বছর অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে শুধু দিল্লির ক্যালকুলেশন নেই, আছে কলকাতার আশঙ্কা, স্থানীয় জল-রাজনীতি, এবং সাম্প্রতিক সময়ে চীনের বিনিয়োগ প্রস্তাব ঘিরে আরেক স্তরের ভূরাজনীতি। এই বাস্তবতা বোঝা ছাড়া পানি ইস্যুতে বাংলাদেশের কূটনীতি সব সময়ই অসম্পূর্ণ থাকবে।

আরেকটি বড় ইস্যু হচ্ছে সীমান্ত এবং সংযোগ। রামগড়-ত্রিপুরা অংশে সেতু, ল্যান্ডপোর্ট, উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সড়ক ও বাণিজ্যিক সংযোগ—এগুলো একদিকে দিল্লি এবং ঢাকা উভয়ের চোখে সুযোগ। অন্যদিকে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন সংবেদনশীল প্রশ্নও তৈরি করছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ মানে কেবল গুদাম আর রাস্তা না, সঙ্গে চলে আসে ভূমি অধিগ্রহণ, নিরাপত্তা, পাচার, অভিবাসন, এমনকি রাজনীতির নতুন ‘পাওয়ার-বেজ’। কাজেই এই প্রজেক্টগুলোকে শুধু ‘উইন-উইন কানেকটিভিটি’ হিসেবে দেখলে বাস্তব রাজনীতির একটি বড় অংশ অদেখা থেকে যায়।

বাংলাদেশের জন্য করণীয় কী? প্রথমত, দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ কলকাতা, গুয়াহাটি, আগরতলার সঙ্গেও নীতিসম্মত ও ধারাবাহিক যোগাযোগ রাখা। শুধু কেন্দ্রীয় সরকার নয়, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নীতিনির্ধারক, থিঙ্কট্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম—এদের সঙ্গে শান্ত, যুক্তিনির্ভর সংলাপ জরুরি।

এসব স্ট্র্যাটেজিক বিষয় বুঝতে গেলে ভারতের দুটি রাজ্যকে আলাদা করে দেখতে হয়—পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম। কারণ, বাংলাদেশ ইস্যু সবচেয়ে বেশি সরব এখানে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে কয়েকবার ধরে ‘বাংলাদেশ’ একটা স্থায়ী বিতর্ক। কখনো ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুতে বিজেপি জাতীয়তাবাদী ভোট একত্র করার চেষ্টা করে; কখনো তৃণমূল নিজেদের ‘বাঙালি স্বাতন্ত্র্য’ তুলে ধরে পাল্টা ন্যারেটিভ (বয়ান) তৈরি করে।

শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের ভাষাতেই ‘বাংলাদেশি’ শব্দটি বেশির ভাগ সময়ই নিরাপত্তা, জনসংখ্যা চাপ কিংবা সংস্কৃতিগত দ্বন্দ্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। রাজ্য রাজনীতির জন্য এটি হয়তো কার্যকর স্লোগান, কিন্তু বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব মোটেও নিরীহ নয়। সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মনোভাব—সবখানেই এই ফ্রেমিংয়ের ছাপ পড়ে।

আসামের চিত্র আরও সংকটের। এনআরসি, ডিটেনশন ক্যাম্প, ‘ডাউটফুল ভোটার’—এই শব্দগুলো সেখানে বহুদিনের বাস্তবতা। বাংলাভাষী মুসলমানদের অনেককে প্রকাশ্যেই ‘বাংলাদেশি’ বলে ডাকা হয় এবং রাজনীতিকদের ভাষণে প্রায়ই শোনা যায় ‘ওরা ভোট দিতে হলে বাংলাদেশে যাক’ ধরনের বাক্য।

বাস্তবে সীমান্ত এলাকায় যে পুশব্যাকের ঘটনা ঘটে, তার সিংহভাগই নথিভুক্ত হয় না, কিন্তু সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে এগুলো অত্যন্ত বাস্তব। বাংলাদেশের জন্য এর ফল কয়েকভাবে আসে—   সীমান্তে অস্থিরতা বাড়ে, মানবাধিকারের লঙ্ঘন হয়, আর সবচেয়ে বড় কথা, ভারতের ভেতরের নির্বাচনী স্বার্থ মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যবহার হয় একধরনের ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ হিসেবে।

এই অবস্থায় ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যে ‘ডি-এস্কেলেশন’ দেখা যাচ্ছে, সেটাকে স্বাগত জানানো যায়, তবে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সম্পর্ক উন্নত হলেও, রাজ্য পর্যায়ে বাংলাদেশবিরোধী সেন্টিমেন্ট, সীমান্তের প্রশাসনিক বাস্তবতা আর মিডিয়ার ফ্রেমিং যদি বদলানো না যায়, তাহলে সময়ের ব্যবধানে সেই উত্তাপ আবারও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপরে এসে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের জন্য করণীয় কী? প্রথমত, দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ কলকাতা, গুয়াহাটি, আগরতলার সঙ্গেও নীতিসম্মত ও ধারাবাহিক যোগাযোগ রাখা। শুধু কেন্দ্রীয় সরকার নয়, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নীতিনির্ধারক, থিঙ্কট্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম—এদের সঙ্গে শান্ত, যুক্তিনির্ভর সংলাপ জরুরি। এতে অন্তত এতটুকু হয় যে বাংলাদেশের বিষয়ে একচোখা নিরাপত্তা ন্যারেটিভের পাশাপাশি অন্য ধরনের তথ্য ও দৃষ্টিভঙ্গিও সেখানে জায়গা পাবে।

দ্বিতীয়ত, গঙ্গা চুক্তি নবায়ন আর তিস্তা নিয়ে আলোচনা শুধু দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির হাতে ছেড়ে দিলে হবে না; এর সঙ্গে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য, নদীর দীর্ঘমেয়াদি প্রবাহ-প্যাটার্ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, দুই পারের কৃষকের বাস্তবতা—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব তৈরি করা দরকার। এর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ভেতরের পানি নিয়ে রাজনীতিকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ, ভুল তথ্য বা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তা কূটনৈতিক ভাষায় সংশোধনের চেষ্টা—এই ধরনের ‘প্রি-এম্পটিভ’ কাজ দরকার।

তৃতীয়ত, আসামের পুশব্যাক, এনআরসি-পরবর্তী মানুষের অবস্থান, সীমান্ত অঞ্চলের মানবাধিকার —এসব বিষয়ে শুধু ক্ষোভের ভাষা বা নীরবতা, কোনোটাই দীর্ঘ মেয়াদে কাজে দেয় না। আন্তর্জাতিক আইনের ভাষা, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং মানবিক যুক্তি—তিনটিকে মিলিয়ে খুব ঠান্ডা মাথায় কিন্তু পরিষ্কারভাবে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। এতে যাঁরা ভারতের ভেতরেই এ ধরনের নীতির সমালোচনা করেন, তাঁদের সঙ্গে বাংলাদেশ পরোক্ষভাবে একই নৈতিক অবস্থানে দাঁড়ায়, যা ভবিষ্যতের জন্য সুবিধাজনক।

চতুর্থত, পাবলিক ডিপ্লোমেসিকে আরও কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশকে যদি কেবল ‘সিকিউরিটি থ্রেট’, ‘মাইনরিটি ভায়োলেন্সের উৎস’ বা ‘ইনফিলট্রেটর উৎপাদনকারী দেশ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়, তাহলে সেই জায়গায় বিকল্প চিত্র হাজির করতে হবে; অর্থনীতি, জ্বালানি ট্রানজিশন, রিজিওনাল কানেকটিভিটি, জলবায়ু-সহনশীলতা, সাংস্কৃতিক বিনিময়—এসব নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ লেখা, সাক্ষাৎকার, যৌথ আলোচনা দরকার। এতে সব সমস্যার সমাধান হবে না, কিন্তু একমুখী নেতিবাচক ফ্রেমকে অন্তত প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে।

সবশেষে, বাংলাদেশের ভেতরেও সহজ আবেগপ্রবণ ভারতবিরোধী স্লোগান থেকে সাবধান থাকা জরুরি। ভারতের অভ্যন্তরীণ কিছু রাজনীতি বাংলাদেশকে যেভাবে ব্যবহার করে, তার প্রতিক্রিয়ায় যদি ঢাকাও একই ধরনের সরলীকৃত শত্রু-চিত্র আঁকে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে। বাংলাদেশের দায়িত্ব হচ্ছে নিজের জাতীয় স্বার্থকে মাথায় রেখে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, কিন্তু প্রতিবেশীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইকে যতটা সম্ভব পৃথক রাখা।

ভারত আজকের বিশ্বরাজনীতিতে একদিকে বড় অর্থনীতি, অন্যদিকে জটিল বহুদলীয় গণতন্ত্র; যেখানে কেন্দ্র, রাজ্য, আদালত, মিডিয়া, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী—সবাই আলাদা আলাদা খেলোয়াড়। বাংলাদেশও এক ঝোড়ো রাজনৈতিক সময় পার করে এসেছে এবং এখন নতুন এক গণতান্ত্রিক পর্বে প্রবেশ করছে। এই দুই বাস্তবতার মিলনে সম্পর্ক যেমন কখনো উত্তপ্ত হবে, তেমনই আবার নতুন সুযোগও তৈরি হবে।

ঠিক এই জায়গা থেকেই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিকে নজর রাখা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। লক্ষ্য হওয়া উচিত আবেগের ঘূর্ণিপাকে আটকে না গিয়ে বাস্তব স্বার্থের ভিত্তিতে এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেখানে পানি, সীমান্ত, সংখ্যালঘু, বাণিজ্য, সংযোগ—সব ইস্যুতে মতবিরোধ থাকলেও তা নিয়ন্ত্রিত থাকে; আর দুই দেশের সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে ভোটের গরম রাজনীতির বাইরে গিয়েও প্রতিবেশী হিসেবে একসঙ্গে বসবাসের জায়গা এখনো অক্ষুণ্ণ আছে।

  • আসিফ বিন আলী ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো। ই-মেইল: [email protected]

    *মতামত লেখকের নিজস্ব