সম্প্রতি ভারতের পুশ ইনকে কেন্দ্র করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভীষণ অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নারী–শিশুসহ অনেক মানুষকে সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে দেখা যায়। তারা খাদ্য পানি আশ্রয় ছাড়াই দিনের পর দিন খোলা আকাশের নিচে থাকতে বাধ্য হন।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ কর্তৃক দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত প্রটোকল ও আন্তর্জাতিক আইনকানুন না মেনে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে বিএসএফ পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ঠেলে দেওয়া মানুষদের আপাতত ফিরিয়ে নিলেও সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান হয়নি, সীমান্তজুড়ে পুশ ইনের তৎপরতাও বন্ধ হয়নি।
সীমান্তে হত্যার মতো বিএসফের পুশ ইনের চর্চাও দীর্ঘদিনের। ২০০২-০৩ সালের দিকে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ক্ষমতায় থাকার সময় ভারত থেকে প্রায়ই পুশ ইনের ঘটনা ঘটত। এরপর দুই দেশেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পুশ ইনের ঘটনা অনেক দিন ঘটেনি। গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে আবারও ভারত কর্তৃক বড় আকারে পুশ ইন করা শুরু হয়।
২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে বিএসএফ মোট ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করে। এরপর কিছুদিন পুশ ইনের ঘটনা বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকে পুশ ইনের ঘটনা বেড়েছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকে একটি বড় ইস্যুতে পরিণত করেছিল। নির্বাচনী ইশতেহারে অনুপ্রবেশকারীদের ‘ডিটেক্ট, ডিপোর্ট, ডিলিট’-এর (চিহ্নিতকরণ, ফেরত পাঠানো এবং মুছে ফেলা) প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বিজেপি সরকার কথিত অনুপ্রবেশকারীদের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের মাধ্যমে আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দিচ্ছে। এরপর ভারতীয় বিএসএফ এই মানুষদের কোনো ধরনের সীমান্ত প্রটোকল ও আন্তর্জাতিক আইন না মেনে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে।
গত এক মাসে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার কথা বলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ঠেলে পাঠানোর জন্য রাজ্যের বিভিন্ন ‘হোল্ডিং সেন্টার’–এ আটক আছেন আরও ৮৬৩ জন।
এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস (এপিডিআর) বলেছে, ‘বিএসএফ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশি সন্দেহে বহু মানুষকে, বিশেষত নারী ও শিশুদের, বিভিন্ন জেলার সীমান্তে নিয়ে গিয়ে জোর করে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।’
কোনো ভদ্র সভ্য দেশের ক্ষমতাসীন রাজনীতিকেরা সন্দেহভাজন অভিবাসীদের এভাবে রাতের অন্ধকারে ধাক্কা মেরে প্রতিবেশী দেশে ঠেলে দেওয়ার কথা বলেন না। ভারতের ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিবিদেরা এসব কথা খোলাখুলি বলছেন
২.
এক দেশের কোনো নাগরিক আরেক দেশে অনুপ্রবেশ করলে তাকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইনকানুন অনুসরণ করে ফেরত পাঠাতে হয়। একতরফা ঠেলে দেওয়া হলে অনেক প্রান্তিক মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়।
২০২৫ সালের পুশ ইনের সময় অন্তত ১২০ জন ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশি হিসেবে পুশ ইন করা হয়েছিল। এর মধ্যে আসামের স্কুলশিক্ষক খায়রুল ইসলাম, ভারতের ওডিশা রাজ্যের হিন্দিভাষী শেখ আবদুর জব্বারসহ ১৪ জনের পরিবার, পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার ধীতোরা গ্রামের বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা সোনালী বিবি, তাঁর স্বামী, সন্তানসহ ছয় সদস্যের পরিবার, আসামের নলবাড়ির আদি বাসিন্দা ৬৯ বছর বয়সী সাকিনা বেগমের কথা বহুল আলোচিত।
তারপরও ভারতের ক্ষমতাসীনরা এই অমানবিক চর্চা থেকে সরে আসছেন না। এই বেআইনি ও মানবাধিকারপরিপন্থী কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো রাখঢাকেরও প্রয়োজন বোধ করছেন না।
পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের পরেই নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিএসএফের সঙ্গে বৈঠকে কথিত বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারী’দের ফেরত পাঠানোর পদ্ধতি তুলে ধরেন। তিনি এ প্রসঙ্গে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক গোপন নির্দেশিকার সূত্র ধরে কথিত অবৈধ ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’দের বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেন।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এ বছরের ১৫ এপ্রিল এবিপি নিউজের হিন্দি চ্যানেল থেকে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে পুশ ইন বিষয়ে কোনো রাখঢাক না রেখেই বলেছেন, ‘আমরা কী করি—অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে, যেখানে বিডিআর (বিজিবি) নেই, সেখান দিয়ে পুশ ব্যাক করে দিই। বিএসএফ কী করে—কখনো ২০-৩০ বা ৪০ দিন, কখনো ১০ দিন মতো নিজেদের কাছে রেখে দেয়। যখন বিডিআর (বিজিবি) থাকে না, সেখান দিয়ে ধাক্কা মেরে পাঠিয়ে দেয়।’
কোনো ভদ্র সভ্য দেশের ক্ষমতাসীন রাজনীতিকেরা সন্দেহভাজন অভিবাসীদের এভাবে রাতের অন্ধকারে ধাক্কা মেরে প্রতিবেশী দেশে ঠেলে দেওয়ার কথা বলেন না। ভারতের ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিবিদেরা এসব কথা খোলাখুলি বলছেন কয়েকটি কারণে।
প্রথমত, সাম্প্রদায়িক ও উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ফায়দা নিতে প্রান্তিক বাঙালি মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা। দ্বিতীয়ত, গণ-অভ্যুত্থানে ভারতের অনুগত সরকার পতনের পর সীমান্তে মানবিক সংকট সৃষ্টি করে বাংলাদেশের নতুন সরকারের ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টি। তৃতীয়ত, দিনের পর দিন সীমান্ত হত্যার মতো আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারপরিপন্থী কাজ করার পরও বাংলাদেশ কর্তৃক সীমান্ত সংকটের আন্তর্জাতিকীকরণ না করার ফলে সৃষ্ট আত্মবিশ্বাস।
৩.
ভারতের পক্ষ থেকে অনেক সময় দাবি করা হয়, আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের নামের তালিকা দিলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অযথা বিলম্ব করা হয়। গত এপ্রিলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে দাবি করা হয়, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ভারত এখন পর্যন্ত ডিপ্লোমেটিক নোটের মাধ্যমে ২ হাজার ৮৬৮ জন সন্দেহভাজন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর নাগরিকত্ব যাচাইয়ের অনুরোধ করেছে; কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো কার্যকর জবাব পায়নি।
জবাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ভারতের অভিযোগটি সঠিক নয়। কারণ, ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে ১৫ মে পর্যন্ত ৬৩৪ জন বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করা হয়েছে। এর বাইরে আরও ৩৬১ জনের নাগরিকত্ব যাচাই করে নিশ্চিত করা হয়েছে, ভারতে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার কারণে যাঁদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
ভারতের দেওয়া নামের তালিকাতে সমস্যার কারণেও যাচাই করা সম্ভব হয় না। যেমন ৮৭৯টি নামের তালিকায় ঠিকানা বা পরিচয় শনাক্ত করার মতো কোনো তথ্য নেই। অন্তত ৩৫৮ জনের নাম দুবার করে এসেছে। এ ছাড়া আটককৃতদের পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো, ভারতের সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সেবা বা বন্দীদের সঙ্গে যোগাযোগের অনুমতি না পাওয়া।
ভারত আন্তরিক হলে দ্বিপক্ষীয়ভাবে এসব সমস্যার সমাধান করা যেত। সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রটোকল রয়েছে। এ রকম দুটি প্রটোকল হলো—জয়েন্ট ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ গাইডলাইনস ফর বর্ডার অথরিটিজ অব দ্য টু কান্ট্রিজ, ১৯৭৫ ও দ্য ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কো-অর্ডিনেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (সিবিএমপি), ২০১১। এসব প্রটোকলের আওতায় আলাপ–আলোচনার মাধ্যমে সব ধরনের সীমান্ত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
এ ছাড়া ২০১৭ সাল থেকে চলে আসা দ্বিপক্ষীয় কনস্যুলার সংলাপের মাধ্যমেও নাগরিকত্ব যাচাই ও অনুপ্রবেশ–সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা যায়। সর্বশেষ দুই দেশের কনস্যুলার সংলাপ অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের মে মাসে। এরপর এ বিষয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হলেও ভারতের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।
৪.
আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি অনুসারেও এভাবে এক দেশ থেকে মানুষকে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া অবৈধ। ইন্টারন্যাশনাল কোভেনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস(আইসিসিপিআর) এবং কনভেনশন অন দ্য প্রটেকশন অব দ্য রাইটস অব অল মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স অ্যান্ড মেম্বারস অব দেয়ার ফ্যামিলি অনুসারে, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে কোনো দেশ থেকে বহিষ্কার করা যায় না।
বাংলাদেশের উচিত দ্বিপক্ষীয়ভাবে পুশ ইন সমস্যার সমাধান না হলে বিষয়টিকে দ্রুত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উত্থাপন করা।
কল্লোল মোস্তফা লেখক ও গবেষক। নির্বাহী সম্পাদক—সর্বজনকথা
মতামত লেখকের নিজস্ব
