নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ‘মেড ইন চায়না’ কোভিড-১৯ মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে অন্য দেশের অবকাঠামো প্রকল্পে চীন ঋণ দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে (২০১৯ সাল পর্যন্ত চীনের এ খাতে ঋণদানের গতি ছিল তীব্র)। অবকাঠামো খাতে অংশীদারি দেশগুলোর ঋণ নেওয়া কমার আংশিকভাবে কারণ হলো মহামারি ওই দেশগুলোকে মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপে ফেলেছে; অবশ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন সমালোচনাও আছে যে এ চাপের পেছনে চীনের ‘শিকারি ঋণের’ দায় আছে।

অনেকে মনে করতে পারে, চীনের ঋণপ্রবাহের এ নিম্নমুখী প্রবণতা ঔপনিবেশিক মডেলের চীনা ঋণের ফাঁদ থেকে দরিদ্র দেশগুলোকে মুক্তি দেবে। কিন্তু বিষয়টি মোটেও তা নয়। যেসব দেশ আগে থেকেই চীনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সংকটে ছিল এবং এখন মহামারির কারণে নতুন অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে, তাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে (বেল আউট) চীন নতুন করে ঋণ দেবে। এর বেশির ভাগই পাবে বিআরআই অংশীদার দেশগুলো, যেগুলো কেনিয়ার মতো ইতিমধ্যে চীনের ঋণের ভারে নুয়ে পড়েছে।

এ বেল আউট ঋণের পরিমাণ বিশাল। চীনের কাছ থেকে বেল আউট হিসেবে ঋণ নেওয়া শীর্ষ তিন দেশ হলো আর্জেন্টিনা, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা। ২০১৭ সাল থেকে এ তিন দেশ বেল আউট হিসেবে চীনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে ৩ হাজার ২৮০ কোটি ডলার। পাকিস্তান এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা। ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত তারা জরুরি ঋণ হিসেবে চীনের কাছ থেকে নিয়েছে ২১৯০ কোটি ডলার।

একইভাবে পাকিস্তান চার দশক ধরে তার গোয়াদর বন্দর চালানোর জন্য চীনকে একচেটিয়া অধিকার দিয়েছে। সেই সময়ে, চীন বন্দরের রাজস্বের ৯১ শতাংশ নিজের পকেটে পুরেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে চীনের ঋণচুক্তির বিশদ বিবরণ এখনো পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। কিন্তু এটা ইতিমধ্যে স্পষ্ট যে চীনের এ ঋণদান সাম্রাজ্যবাদের সুদূরপ্রসারী ঝুঁকি বহন করে। এটি সবার জন্য বিপদের বিষয়।

যেহেতু চীন আইএমএফের মতো ঋণের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতি সংস্কারে কঠোর শর্ত দেয় না, সেহেতু দেশগুলো আরও বেশি ঋণ নিতে থাকে এবং একপর্যায়ে ঋণের সাগরে ডুবে যায়।

চীনের ঋণ চুক্তিগুলো সাধারণত গোপনীয়তায় ঢাকা থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই করদাতাদের কাছে ঋণের খবর গোপন রাখা হয়, যা সরকারের জবাবদিহিকে ক্ষুণ্ন করে।

লাওসের কথাই ধরুন। তারা চীনের কাছ থেকে যে পরিমাণ গোপন ঋণ নিয়েছিল, তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত ঋণের পরিমাণকে ছাপিয়ে গেছে। মহামারির ধাক্কার পর ছোট্ট এই দেশটি দেনার দায়ে তার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের বেশির ভাগের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। এ ছাড়া এ দেনা থেকে বাঁচতে তার সামনে চীনের হাতে তার ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ তুলে দেওয়া ছাড়া খুব সামান্যই বিকল্প থাকবে।

দেনার কারণে তাজিকিস্তান পামির পর্বতমালার ১ হাজার ১১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা চীনের কাছে সমর্পণ করেছে এবং চীনা কোম্পানিগুলোকে তার ভূখণ্ডে সোনা, রৌপ্য এবং অন্যান্য খনিজ আকরিকের খনির অধিকার দিয়েছে।

চীনের ঋণের অর্থ শোধ করতে না পেরে শ্রীলঙ্কা তার মহাসাগর অঞ্চলের সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হামবানটোটা এবং তার আশপাশের ৬ হেক্টরের বেশি জমি চীনকে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিতে বাধ্য হয়েছে। এ বলিদানের পরও শ্রীলঙ্কা এ বছরের শুরুতে চীনের ঋণ খেলাপি হয়েছে।

একইভাবে পাকিস্তান চার দশক ধরে তার গোয়াদর বন্দর চালানোর জন্য চীনকে একচেটিয়া অধিকার দিয়েছে। সেই সময়ে, চীন বন্দরের রাজস্বের ৯১ শতাংশ নিজের পকেটে পুরেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে চীনের ঋণচুক্তির বিশদ বিবরণ এখনো পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। কিন্তু এটা ইতিমধ্যে স্পষ্ট যে চীনের এ ঋণদান সাম্রাজ্যবাদের সুদূরপ্রসারী ঝুঁকি বহন করে। এটি সবার জন্য বিপদের বিষয়।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

  • ব্রহ্ম চেলানি নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিষয়ের অধ্যাপক