ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরের বাসিন্দারা শ্বাস নিতে গিয়ে প্রতিমুহূর্তে টের পাচ্ছেন যে তাঁরা বাতাসের মধ্যে ডুবে আছেন। বায়ুদূষণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছে এমন শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান বেশ ওপরে। এমনকি ২০২৪ সালের শুরুতেই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর হিসেবে ঢাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার বায়ুতে শ্বাস নিলে প্রতিদিন ২২টি সিগারেট খাওয়ার সমান প্রভাব পড়ছে।
মানবসৃষ্ট সংকটগুলোর মধ্যে সবার আগে রয়েছে বায়ুদূষণ। এমনকি দেশের গ্রামীণ এলাকাগুলোও এই দূষণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর এই দূষণের প্রধান কারণগুলো হচ্ছে অবাধে চলাচল করা পুরোনো যানবাহনের ধোঁয়া, অবৈধ ইটভাটা ও নির্মাণকাজের ধূলিকণা এবং শিল্পকারখানা থেকে নির্গত ক্ষতিকর বর্জ্য।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বায়ুদূষণের ফলে শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও ফুসফুসের ক্যানসারের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে চলেছে। ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। শহরের বাসিন্দা ও শিল্পকারখানার কর্মীদের জন্যও এ সমস্যা আরও উদ্বেগজনক।
শহরের বায়ুতে উপস্থিত ক্ষুদ্র কণা (পিএম ২ দশমিক ৫) মানুষের শ্বাসতন্ত্র ও ফুসফুসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এমন অবস্থায় ঢাকাবাসীর জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিশু, বয়স্ক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
বায়ুদূষণ কেবল স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে এমন নয়; বরং একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা হ্রাসের প্রধান কারণও এটি। দূষণের কারণে একদিকে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে কর্মক্ষম জনশক্তি কমে গিয়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই এ সংকট কাটিয়ে উঠতে আমাদের সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স (একিউএলআই) অনুযায়ী, ক্ষুদ্র কণার (পিএম ২ দশমিক ৫) এই বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৪ দশমিক ৮ বছর কমছে। এই সূক্ষ্ম কণা শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে; দীর্ঘ মেয়াদে হৃদ্রোগ ও ফুসফুসের নানা প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করে যাচ্ছে।
বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে গাড়ির টেইলপাইপ থেকে নির্গত ধোঁয়া। বিশেষ করে পিএম ২ দশমিক ৫ ও পিএম ১০-এর মতো ক্ষুদ্র কণা গাড়ির টেইলপাইপ থেকে নির্গত হয়। এর মধ্যে এককভাবে পিএম শূন্য দশমিক ২ নিঃসরণের সর্বোচ্চ উৎস এই টেইলপাইপ। এ অবস্থায় শহরের বায়ুদূষণ কমাতে ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে হলে টেইলপাইপ নিঃসরণ কমাতেই হবে।
যানবাহনের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা, যানবাহনের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহনের প্রসার ঘটানো আমাদের জন্য খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ইটভাটা, নির্মাণ ও শিল্পখাত থেকে হওয়া বায়ুদূষণের মাত্রা কমিয়ে আনতে হলে আমাদের পরিবেশবান্ধব নীতি ও কৌশল প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। নির্মাণকাজের সময় যেন ধুলোবালি উড়ে বায়ুদূষণকে আরও বাড়াতে না পারে, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হতে হবে।
নীতিমালা বাস্তবায়নে সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোকে আরও তৎপর হতে হবে। শিল্পখাত থেকে হওয়া দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে লোকালয় থেকে দূরে, বিশেষায়িত ও নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চলে নিয়ে যেতে হবে। এই খাতের কর্মী ও পরিবেশের সুরক্ষায় সরকারি নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
তবে দীর্ঘ মেয়াদে দূষণের এই সমস্যা মোকাবিলায় বিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর যানবাহন ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) টেইলপাইপ থেকে কোনো নিঃসরণ তৈরি করে না, যা বায়ুদূষণে ভোগা শহরগুলোর জন্য একটি অনন্য বিকল্প হতে পারে। ঢাকার মতো শহর, যেখানে যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুদূষণের একটি অন্যতম প্রধান কারণ, সেখানে শহরের বাতাসের গুণগত মান উন্নত করতে বৈদ্যুতিক গাড়ি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশে বিদ্যুৎনির্ভর যানবাহন জনপ্রিয় করতে বিভিন্ন ইভি উৎপাদক প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে; নীতিগত সহযোগিতা পেলে তাদের পরিবেশবান্ধব এ উদ্যোগ আরও বেশি কার্যকর ও গতিশীল হবে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির শূন্য কার্বন নিঃসরণের বিশেষ এই বৈশিষ্ট্য বায়ুদূষণ কমানোর পাশাপাশি, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ধোঁয়া ও দূষণমুক্ত পরিবেশ আমাদের দীর্ঘমেয়াদি নানা সমস্যার ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারে। পরিবেশবান্ধব দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হিসেবে এখন আমাদের বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে দেশে ইভির প্রচলন বাড়াতে প্রয়োজনীয় নীতি ও কৌশল গ্রহণ করা উচিত। বৈদ্যুতিক গাড়ির টেইলপাইপ নিঃসরণ-মুক্ত হওয়ায় কার্বন ডাই–অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও পিএম ২ দশমিক ৫-এর মতো সূক্ষ্ম কণা নিঃসরণ এবং এগুলোর কারণে সৃষ্ট ক্ষতির প্রভাব কমিয়ে আনতে সক্ষম। একই সঙ্গে এতে তেল-গ্যাসের মতো জীবাশ্মভিত্তিক জ্বালানির ব্যবহার কমে আসবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে।
ফলে বলা চলে, বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসার বাড়লে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা ও অন্যান্য দূষণ-সম্পর্কিত রোগের প্রকোপ অনেকখানি কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাসে এটি একটি টেকসই ও কার্যকর সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে মোট যানবাহনের ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তরিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জন থেকে আমরা অনেক দূরে রয়েছি। তবু দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর যান জনপ্রিয় করতে কাজ করা হচ্ছে। এই শূন্য কার্বন নিঃসরণের বিষয়টি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে পৃথিবী বদলে দেওয়ার মতো ‘তিন শূন্য’ ধারণার মধ্যে এটি একটি।
দেশকে বায়ুদূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে যানবাহনের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব যানের দিকে যাওয়া ছাড়া আমাদের হাতে আর তেমন কোনো বিকল্প নেই। আমাদের আগামী প্রজন্মকে সুস্থ-সবল ও স্বাস্থ্যঝুঁকিমুক্ত রাখতে চাইলে এ রকম টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করতে হবে।
ইমতিয়াজ নওশের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা, বিওয়াইডি বাংলাদেশ