বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগে ‘সার্চ কমিটি’ গঠনের নজির রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের পাবলিক/নন-পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগে এই সব সার্চ কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সার্চ কমিটি পরবর্তী সময়ে আবার বিভিন্ন উপকমিটি গঠন করে উপাচার্য নিয়োগের দেখভাল করে থাকেন। এই সব কমিটিতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির ডিন, সাবেক উপাচার্য, শিক্ষক প্রতিনিধি, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ছাত্র প্রতিনিধিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী সংঘের সদস্য।
অনেকটাই আমাদের দেশে ৭৩ অধ্যাদেশে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ‘উপাচার্য নিয়োগে’ সিনেট সদস্যদের দ্বারা মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে আচার্য একজনকে বেছে নিতে পারেন, এই সব সার্চ কমিটি অনেকটাই সেই রকমই কাজ করে। যদিও বাংলাদেশে কাগজে–কলমে থাকা এসব নিয়মের কোনো কার্যকারিতা আমরা দেখতে পাই না। আচার্যের নির্দেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছাতার তলে আমলাতন্ত্রের কাঠামোয় উপাচার্য নিয়োগ যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে।
তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য সার্চ কমিটির ঘোষণা দিয়েছে। ১ এপ্রিল প্রথম আলোর অনলাইনে প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি সভাপতি হিসেবে থাকছেন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আর অন্যান্য সদস্য হিসেবে থাকছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একজন সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের একজন অধ্যাপক। এ ছাড়া মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) এই কমিটিতে সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যের পদমর্যাদা ‘কাঠামোগত’ভাবে সচিবদের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত। কিন্তু নিয়তির কী পরিহাস, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের দায়িত্ব পাচ্ছে আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ছোঁয়া।
একজন সচিব কোন যোগ্যতা বলয়ে উপাচার্য নিয়োগের সার্চ কমিটিতে ঢুকে পড়ে, তা বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নজির না থাকলেও আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেই সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত উটের পিঠে চলছে দেশ। আপনি যদি খোলা চোখেও বিবেচনা করেন, তাহলে একজন সচিব স্নাতক/স্নাতকোত্তর পাস করে কর্ম কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
আমলাতন্ত্রের ভেতর হাবুডুবু খাওয়া দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার হালহকিকত কী, তা আমরা দেখছি। সেই লুপে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের দায়দায়িত্ব সরকার চেপে দিয়ে নিজেকে নির্ভার মনে করলেও যে ভাবধারায় ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটির প্রয়োগ করা হয়, তা কর্পূরের মতো হয়ে যাবে। সবকিছু আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় ফেলে দেওয়া হলে স্বকীয়তা বহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পঙ্গুত্ব বরণ করবে কি না, তা নিয়ে ভাবতে হবে।
মূলত দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর কাজের মধ্য ডুবে থাকা এসব বিসিএস ক্যাডারের বিশ্ববিদ্যালয়–সংশ্লিষ্ট গবেষণা, প্রবন্ধ মূল্যায়ন কিংবা গবেষণার সৃজনশীলতা দেখভালের সুযোগ ও অভিজ্ঞতা তলানিতে থাকে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামোয় তাঁরা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পেলেও একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের গবেষণা, শিক্ষার পঠন-পাঠন নীতির সঙ্গে পরিচিত না থাকার পরও তাঁরাই যখন উপাচার্য নিয়োগের চূড়ায় বসে পড়েন, তখন সেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গুণগত উপাচার্য খুঁজে বের করা প্রশ্নাতীত হয়ে পড়ে।
এমনিতে এই দেশের গবেষণার প্রপোজাল থেকে সরকারি ফান্ডিং পাওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের সচিবদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ‘অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ’ দীর্ঘদিন ধরে ছিল। দেশের বাইরে পিএইচডি ও গবেষণায় অভিজ্ঞ অনেক শিক্ষক মন্ত্রণালয়গুলোতে ফান্ডিং প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ জানালেও সেই ধারার কোনো পরিবর্তন সরকারের পক্ষে থেকে করা সম্ভব হয়নি। এবার সেই ধারায় যুক্ত হচ্ছে উপাচার্যদের নিয়োগ। আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রবেশ করিয়ে উচ্চশিক্ষাকে ‘মেরুদণ্ডহীন’ করার শেষ পেরেকটি মনে হয় এই সরকার প্রবেশ করাতে যাচ্ছে।
যে উপাচার্যরাই নিয়োগ পেলেন, সার্চ কমিটি ছাড়া, যাঁদের উপাচার্য হিসেবে অতীত অভিজ্ঞতাও নেই, তাঁরাই খুঁজে নেবেন নতুন উপাচার্যদের। এমনিতে আমাদের দেশে উপাচার্যদের ‘রাজনৈতিক’ পদায়ন বন্ধ হয় না। দলীয় অনুরাগী শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে এনে, সরকার ও রাজনৈতিক দল একাকার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গলা টিপে হত্যা করেছে যুগের পর যুগ ধরে। মজ্জাহীন উপাচার্যদের কাঁধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন সৃজনশীল শিক্ষা ও গবেষণায় শ্বাস নিতে পারছে না, তখন এই সব সার্চ কমিটি একদলীয় কিংবা একপক্ষীয় মতাদর্শের ঘেরাটোপে থাকবে।
আমলাতন্ত্রের ভেতর হাবুডুবু খাওয়া দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার হালহকিকত কী, তা আমরা দেখছি। এখানকার শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে তাঁদের পদায়ন ও পদোন্নতির ঝুঁকি ঝামেলা নিয়ে হরহামেশায় পত্রিকার শিরোনাম রুখতে পারছে না। কিন্তু সেই লুপে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের দায়দায়িত্ব সরকার চেপে দিয়ে নিজেকে নির্ভার মনে করলেও যে ভাবধারায় ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটির প্রয়োগ করা হয়, তা কর্পূরের মতো হয়ে যাবে। সবকিছু আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় ফেলে দেওয়া হলে স্বকীয়তা বহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পঙ্গুত্ব বরণ করবে কি না, তা নিয়ে ভাবতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই সার্চ কমিটি গঠনের আগে কাগুজে স্বায়ত্তশাসিত তকমা পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি তাদের নিজেদের উপাচার্য নিয়োগের ‘নিয়মাবলি পরিবর্তন’ করেছে?
১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশে চলা বাংলাদেশের প্রধান চারটি (ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর) বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অধ্যাদেশের ১১ (১) ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, উপাচার্য নিয়োগে মূলত সিনেট কর্তৃক মনোনীত তিনজনের প্যানেল থেকে নির্ধারিত শর্তে আচার্য একজনকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেবেন বলে যে স্বীকৃতি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা অধ্যাদেশ আছে, তা কি পরিবর্তন করা হয়েছে? প্রায় একই ধারায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিনেটের পরিবর্তে সরাসরি আচার্য দ্বারা উপাচার্য নিয়োগের যে বিধিবিধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইনে বলা হয়েছে, তার যদি সংশোধন আনা না হয়, তাহলে আমরা কোন আইনের বলয়ে সার্চ কমিটি গঠন করে উপাচার্য নিয়োগের চিন্তাভাবনা করছি?
হ্যাঁ, এই কথা ঠিক, এই দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের অর্থে পরিচালিত হওয়ার শক্তি নেই কিংবা সামর্থ্য তৈরি করলেও দেশের মোট জনগোষ্ঠীর পক্ষে বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষায় ব্যয় বহনের সক্ষমতা নেই, ফলে সরকারের অর্থে পরিচালিত হওয়া নামকাওয়াস্তে ‘পাবলিক’ বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের আজ্ঞায় চলে, কিন্তু বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় ধারণা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিলে উচ্চশিক্ষা নেওয়া আমাদের প্রজন্ম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সুধা থেকে বঞ্চিতই থাকবে।
উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি হোক, তবে সেটার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন পরিবর্তন হোক। সার্চ কমিটিতে আমলাতন্ত্রের ছোঁয়া থাকবে না, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ করা হবে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি মেম্বার সেই কমিটিতে আসুক, বহিরাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতিনিধিও থাকুক, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি আসুক, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য দায়িত্ব পালন করে যাওয়া অভিজ্ঞদের আনা হোক। প্রয়োজনে দেশের বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্থান দেওয়া হোক।
একাডেমিক নিয়োগব্যবস্থা কেবল দক্ষ ও অভিজ্ঞ একাডেমিশিয়ানদের হাতে থাকুক, কোনো রাজনৈতিক দল ও কিংবা আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হাত থেকে দূরে থাকুক। রাজনৈতিক দৃষ্টির বাইরে গিয়ে দল-মতের ঊর্ধ্বে কেবল দক্ষ একাডেমিশিয়ানদের উপাচার্য নিয়োগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে না পারলে উচ্চশিক্ষার অবনমন কেউ ঠেকাতে পারবে না। আবার নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যরাও দলীয় অন্ধত্ব ঘোচাতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষা ও গবেষণায় সৃজনশীলতা ও উদারতার স্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন না।
ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব
