চীনের দিক থেকে কৌশলগত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে আমেরিকান ও ইউরোপীয়রা একটি সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছেছে। বিশেষ করে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তাঁর ক্ষমতার মেয়াদ বাড়াতে ও সংহত করতে যে অর্থনৈতিক হুমকি ও যুদ্ধমান পররাষ্ট্রনীতি নিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে এই ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে। ‘পশ্চিমারা যে ফিরছে’—এ রকম একটা শক্তিশালী ভাবনা জন্ম নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ নিজেদের মধ্যে এখন নতুন একটি রাজনৈতিক ঐক্য খুঁজে পেয়েছে। যে মূল্যবোধ তারা লালন করে আসছে এবং যে ধরনের বিশ্ব তারা দেখতে চায়, তার সমার্থক হয়ে উঠেছে এ ঐক্য।

এখন, প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তারা যে ধারণা সামনে আনার চেষ্টা করবে, তা হলো ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র খুব অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সিংহভাগ ব্যয়ের বোঝা বহন করছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসে আমার সহকর্মী জেরেমি শাপিরিও তাঁর সাম্প্রতিক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ২৪ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেখানে এর অর্ধেকটার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইউরোপ। এ প্রেক্ষাপটে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা প্রশ্ন তুলতে পারেন, আমেরিকানরা কেন ইউক্রেনকে বেশি টাকা দেবে?

এ সমস্যা অত্যাসন্ন। দীর্ঘ মেয়াদেও অনেক সমস্যা আছে। ইউক্রেনের বিজয়কে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, তা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক নতুন উত্তেজনা তৈরি করছে। বাইডেন প্রশাসন, ফ্রান্স ও জার্মানি যেখানে বলছে কিছু বিষয়ে শান্তি আলোচনা দরকার, সেখানে পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলোর মতে, রাশিয়াকে মাথা নত করতে হবে। আবার রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার চুক্তির মধ্যস্থতাকারী হতে চান বলে ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ট্রাম্পবাদ এখনো মরেনি। রিপাবলিকান প্রার্থীরা ট্রাম্পবাদের ধ্বংসাত্মক সাংস্কৃতিক যুদ্ধের নীতি অনুসরণ করতে পারেন। মুক্তবাণিজ্য, অভিবাসন, বিদেশে হস্তক্ষেপ ও ইউরোপকে নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান তাঁরা মেনে চলতে পারেন।

চীনের প্রসঙ্গ এলেও বেশ কিছু বিষয়ে উত্তেজনার বুদ্‌বুদ সৃষ্টি হয়। একটা বিষয় হলো, ন্যাটো জোট একই দিকে যাত্রা শুরু করেছে, মানে তারা সবাই যে একই লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, তা কিন্তু নয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজের সাম্প্রতিক চীন সফরের প্রসঙ্গ বিবেচনা করা যাক। চীনের সঙ্গে ইউরোপের অর্থনীতি পৃথক করার প্রশ্নে তাঁর (যদিও চীনের ওপর অতি নির্ভরতার বিপদ সম্পর্কে খুব ভালো করেই জানেন তিনি) আগ্রহ খুবই কম।

নিজেদের সুরক্ষা বিবেচনায় সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু আইন পাস করেছে। এগুলোর ব্যাপারে ইউরোপীয়রা উদ্বিগ্ন। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি হ্রাস আইন, চিপস ও বিজ্ঞান আইন এবং উচ্চ প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার ওপর বিধিনিষেধের মতো সিদ্ধান্ত রয়েছে। ইউরোপীয়দের এ উদ্বেগ যথার্থ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার অর্থনৈতিক যুদ্ধে ইউরোপও সমান্তরাল ক্ষতির মুখে পড়বে। এ কারণেই তাইওয়ান ইস্যুতে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

বড় বিপদটা আসতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে। অনেক বিশ্লেষকের প্রশ্ন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা তুলনামূলক খারাপ ফল করার অর্থ কি দলের ওপর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়ে যাওয়া? তাঁদের এ জিজ্ঞাসা দুটি কারণে। ট্রাম্প সমর্থিত অনেক প্রার্থীর পরাজয় এবং ফ্লোরিডায় গভর্নর হিসেবে রন ডি স্যান্টিসের জয়। তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে রিপাবলিকানদের অন্যতম প্রতিযোগী। স্যান্টিস জনপ্রিয়, তবে ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাইলে জেব বুশের ভাগ্য তাঁকেও বরণ করতে হতে পারে। ২০১৬ সালে রিপাবলিকান প্রাইমারি ভোটাররা তাঁকে বাতিল করে দিয়েছিলেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ট্রাম্পবাদ এখনো মরেনি। রিপাবলিকান প্রার্থীরা ট্রাম্পবাদের ধ্বংসাত্মক সাংস্কৃতিক যুদ্ধের নীতি অনুসরণ করতে পারেন। মুক্তবাণিজ্য, অভিবাসন, বিদেশে হস্তক্ষেপ ও ইউরোপকে নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান তাঁরা মেনে চলতে পারেন।

বিশ্ব অর্থনীতির যে বিপর্যয়কর অবস্থা, তাতে করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের আরও ভালো করার সুযোগ রয়েছে। এসব কারণে আগামী দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমাতে হবে ইউরোপের। বাইডেন যদি পরবর্তী নির্বাচনে জেতেন, তাহলে স্বনির্ভর ইউরোপ অপেক্ষাকৃত ভালো অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে পারবে।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ মনোজ দে

  • মার্ক লিওনার্ড ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পরিচালক