ফিরে দেখা যাক কেমন ছিল এখনকার প্রাকৃতিক পরিবেশ? ভাওয়াল-রাজেন্দ্রপুর-মধুপুর-সম্ভার (গাজীপুর-টাঙ্গাইল-সাভার) এ অঞ্চল অনেকের কাছেই ‘শালবন’ হিসেবেই পরিচিত। হরেক রকম দেশজ গাছগাছড়ার সঙ্গে শালগাছের আধিক্যই হয়তো এই নামকরণের হেতু। যদিও সাভার উপজেলায় ‘মিলিটারি ডেইরি ফার্ম’ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের পূর্ব পাশে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গুটিকয় শালগাছ। উঁচু-নিচু ভূপ্রকৃতির এই শ্যামল ছায়াঘেরা অঞ্চলজুড়েই ছিল খাল-বিল-জলাশয়। স্থানীয় ভাষায় ‘ট্যাঁক’ মানে জলাশয়বেষ্টিত টিলার মতো উঁচু জমি। বিভিন্ন প্রাণীর বিচরণভূমি ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এলাকা। গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষভাগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ভর্তি হই, সে সময়ের স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে শুনেছি বর্তমান মীর মশাররফ হোসেন হলের দক্ষিণ-পূর্ব ট্যাঁকটির আদি নাম ‘বাঘের ট্যাঁক’। একটি চিতাবাঘ এখানে বসবাস করত বলে কথিত আছে। বোটানিক্যাল গার্ডেনের নাম ছিল ‘ট্যাংরার ট্যাঁক’। এখানের চারপাশের জলাশয়ে প্রচুর ট্যাংরা মাছ পাওয়া যেত বলেই এই নামকরণ।

পুরোনো কায়দায় বন্ধের মধ্যে রাতের আঁধারে গাছ কেটে ভবনের জন্য জায়গা প্রস্তুত হচ্ছে। বসবাসকারী বন্য প্রাণীদের দেখছি কাটা গাছের মধ্য দিয়ে পালিয়ে যেতে। আমার নিজ হাতে লাগানো সন্তানতুল্য এসব গাছ নিধনের অধিকার তারা কোথা থেকে পেল? পরিকল্পনার সময় পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি কেন বিবেচনায় এল না? কালের বিবর্তনে আমি নিজেই আজ জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের কাতারে, কী জবাব দেব ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশমাইল এলাকা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে (এখন কাঠগড়া নামে পরিচিত) বাঁশবনে বাচ্চাসহ একটি ভালুক দেখেছেন বলেও দাবি করেছিলেন একজন স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র, তখন একজনকে আমাদের পুরোনো রেজিস্ট্রার ভবনের জলাশয়ের কাছ থেকে অজগর ধরতে দেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকায় (আদি নাম ভুইজা বুড়ার ট্যাঁক) চাঁদের আলোতে বাচ্চাসহ অসংখ্য খরগোশ ঘুরতে দেখেছি। শীতকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়ে শত–সহস্র বিভিন্ন জাতের অতিথি পাখি দেখেছি। এখানে এখনো টিকে আছে বাগডাশ, খাটাশ, মেছো বিড়াল, বনবিড়াল, শিয়ালসহ নানা জাতের প্রাণী। অতিথি পাখি ছাড়াও রয়েছে নানা জাতের পাখি। বিশেষজ্ঞরা বলেন ‘ডাইভার্সিটির’ দিক বিবেচনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ বিরাজমান।

ধারণা করি, গত শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকের শেষভাগে এখানকার বনভূমি বিনষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক (তাঁদের অনেকেই পরলোকগত ও অবসর জীবনযাপনরত) গত শতাব্দীর আশির দশকের শুরুতে সড়কের দুই ধারে কৃষ্ণচূড়াসহ বিভিন্ন জাতের বনজ ও ফলদ বৃক্ষ রোপণ করেন। আমরা আশির দশকের শেষভাগে এসে সড়কের দুই পাশে ওই রোপিত বনজ ও ফলদ বৃক্ষ আর কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে বেড়ে ওঠা তালগাছ, বট, ইত্যাদি ছাড়া পুরো বিশ্ববিদ্যালয়েই দেখেছি ছন, ঘাস আর একধরনের কাঁটা গাছের ঝোপে আচ্ছাদিত। আমরা তৎকালীন প্রাণবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ইনস্টিটিউটের প্রথম ও দ্বিতীয় আবর্তনের ছাত্রছাত্রীরা বন বিভাগের থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন জাতের গাছ ব্যাপক হারে রোপণ করেছিলাম। আজ ভাবলে গর্ববোধ হয় এই ভেবে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ জঙ্গলে আমার নিজ হাতে লাগানো হাজারের বেশি গাছ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বন বিভাগ ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হারে রোপণ করা হয়েছে বিভিন্ন জাতের গাছ। সংস্কার করা হয়েছে জলাশয়।

আশির দশকে কোনো রকম প্রতিবাদ ছাড়াই গাছ কেটে তৈরি করা হয় সমাজবিজ্ঞান অনুষদ। নব্বইয়ের দশকে প্রতিবাদ ছাড়াই জলাশয় ভরে শুরু হয় জীববিজ্ঞান অনুষদ ভবনের নির্মাণ। কিন্তু একই সময়ে নতুন কলাভবন তৈরির সময় প্রতিবাদের মুখে পড়ে প্রশাসন। সম্ভবত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এটাই প্রথম পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন। প্রতিবাদকারীরা গাছে কাপড়ের ফিতা বেঁধে গাছ রক্ষায় নামেন। এ আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রো-উপাচার্য ও সদ্য সাবেক প্রো-উপাচার্যরা ছিলেন নেতৃত্বে। তাঁরা সফল হয়েছিলেন, তৎকালীন কর্তৃপক্ষ ওই ভবন নির্মাণে যথাসম্ভব কম গাছ কেটে ভবন নির্মাণ করেছিল। এ ধারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বজায় ছিল। পরিবেশবাদীরা তৎপর ছিলেন, কিছু অসফলতা থাকলেও তাঁরা পরিবেশ রক্ষায় মোটামুটি সফল ছিলেন। এখানে ডুমুরগাছ কর্তনের জন্য কর্তিত গাছ নিয়ে শব-মিছিলও হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নের জন্য পেল রেকর্ড সরকারি অনুদান। শুরু হলো বহুতল ভবন নির্মাণের অপরিকল্পিত, অবৈজ্ঞানিক ও পরিবেশ বিপর্যয়কারী উন্নয়ন। পরিবেশ আন্দোলনের নেতৃস্থানীয়রাই যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে, তখন আমার মতো অনেকেই হয়তো ‘উন্নয়নের’ স্বার্থে ক্ষুদ্র ত্যাগ স্বীকারের মনোভাব নিয়ে কিছুটা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আর এখন আমার অবস্থা ‘জেগে দেখি বেলা নাই বেলা নাই। কোনবা পথে নিতাইগঞ্জ যাই...প্রাণ বন্ধু রে...’। সেই পুরোনো কায়দায় বন্ধের মধ্যে রাতের আঁধারে গাছ কেটে ভবনের জন্য জায়গা প্রস্তুত হচ্ছে। বসবাসকারী বন্য প্রাণীদের দেখছি কাটা গাছের মধ্য দিয়ে পালিয়ে যেতে। আমার নিজ হাতে লাগানো সন্তানতুল্য এসব গাছ নিধনের অধিকার তারা কোথা থেকে পেল? পরিকল্পনার সময় পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি কেন বিবেচনায় এল না? কালের বিবর্তনে আমি নিজেই আজ জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের কাতারে, কী জবাব দেব ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ের শুরু প্রাগৈতিহাসিক যুগে। তবে তা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। শিল্পবিপ্লবের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে পশ্চিমা বিশ্বে পরিবেশ বিপর্যয় ব্যাপকতা লাভ করে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তা মানবসভ্যতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে বিশ্বজুড়ে সংঘটিত জনমতের ভিত্তিতে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের পক্ষে শুরু হয় কার্যক্রম। এখন উন্নয়নের পূর্বশর্ত পরিবেশ রক্ষা। পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্ভাব্য ক্ষতির সম্মুখীন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আমার জানামতে বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকার প্রদত্ত আর্থিক অনুদান বাস্তবায়নের প্রধান শর্ত পরিবেশ রক্ষা। কিন্তু যেভাবে উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অতিসংকটাপন্ন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়েই যদি পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের উদাহরণ তৈরি করতে না পারি, তাহলে দেশ ও জাতি আমাদের থেকে আর কী আশা করতে পারে?

  • মোহাম্মদ মাফরুহী সাত্তার অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন