নির্বাচনে ‘ডিপফেক’ আতঙ্ক, এখন ভিডিও মানেই সন্দেহ

আজকের যুগে গণতন্ত্রের ওপর সবচেয়ে গভীর আঘাত ব্যালট বাক্স কারচুপি বা সাঁজোয়া গাড়ির ভয়ংকর উপস্থিতি দিয়ে আসে না। এটি নীরবে ঢুকে পড়ে আমাদের হাতের স্মার্টফোনে, যেখানে একটি অতি বাস্তবসম্মত এআই-তৈরি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই ভোটারের বিশ্বাসকে নাড়া দিতে পারে। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ গত ১২ ডিসেম্বর ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ এখন অ্যালগরিদমের এক অদৃশ্য ‘অভ্যুত্থানের’ মুখোমুখি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক কিছু নির্বাচনে আমরা দেখেছি পরিকল্পিতভাবে ডিপফেক ছড়ানোর ঘটনা। কণ্ঠ নকল তো এখন ডালভাত। বিরোধী নেতাদের নিয়ে এমন সব ভিডিও তৈরি করা হয়, যেখানে তাঁরা অদ্ভুত বা চরম ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন বলে মনে হয়। আবার এআই-তৈরি সংবাদ উপস্থাপক দিয়ে বানানো খবরেও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে।

ভোটের আগের রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ঘোষণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনো প্রার্থী নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এসব কোনো রসিকতা বা হঠাৎ তৈরি হওয়া মিথ্যা তথ্য নয়; এগুলো সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত ডিজিটাল আক্রমণ, যার উদ্দেশ্য ভোটারকে নিজের চোখ-কানকে সন্দেহ করতে বাধ্য করা। ফলে ‘দেখা মানেই বিশ্বাস’, এই পুরোনো ধারণা ভেঙে গেছে, আর তার জায়গায় এসেছে ‘দেখা মানেই সন্দেহ করা’।

ডিপফেক শনাক্ত করার দায়িত্ব এখন প্রযুক্তির নয়, বরং সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশাল গতি ও পরিসরের কারণে কোনো প্রযুক্তিগত শনাক্তকরণের ব্যবস্থাই সময়মতো সব ভিডিও যাচাই করতে পারে না। তাই প্রত্যেক বাংলাদেশি ভোটারের নিজের বিচারবোধ এবং কিছু মৌলিক ফরেনসিক কৌশল জানা অত্যন্ত জরুরি। আশা করি, এই ডিজিটাল ফরেনসিক গাইড কিছুটা হলেও ভোটারদের কাজে আসবে।

ডিপফেক সাধারণত এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে তা মুহূর্তের মধ্যে মানুষের মনে রাগ বা ঘৃণা তৈরি করে। তাই যখন আপনি কোনো ভিডিও দেখে সঙ্গে সঙ্গে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, তখনই সেটি আরও গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ডিপফেক শনাক্তে ফরেনসিক গাইড

ডিপফেক সাধারণত মানুষের মুখের সূক্ষ্ম জায়গাগুলোতেই ধরা পড়ে। মুখ বা চোখে আলো কীভাবে পড়ছে, ছায়া কি স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়েছে, ত্বক, গলা ও হাতের রং কি একই রকম দেখাচ্ছে—এসব বিষয় গভীরভাবে খেয়াল করলে অনেক সময় নকল ভিডিও ধরা পড়ে। ডিপফেকে প্রায়ই চোখে স্বাভাবিক ঝিলিক থাকে না, চোখের পলক কমে যায় বা চোখ দুটির আকার সামান্য অসমান দেখা যায়।

ডিপফেকের আরেকটি বড় ত্রুটি হলো ঠোঁটের নড়াচড়া ও কণ্ঠস্বরের অসামঞ্জস্য। অনেক সময় দেখা যায়, মুখের নড়াচড়া শব্দের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না। শব্দ একটু দেরিতে আসছে বা ঠোঁটের নড়াচড়া খুব মসৃণ বা রাবারের মতো লাগছে। কখনো অডিও খুব নিখুঁত, পরিষ্কার এবং অস্বাভাবিকভাবে মসৃণ হয়, যেখানে মানুষের স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস বা সামান্য বিরতিগুলো অনুপস্থিত থাকে। এগুলো সবই ডিপফেকের চিহ্ন।

কিন্তু শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটিতেই ডিপফেক ধরা পড়ে না; আচরণগত দিক থেকেও সন্দেহ করার অবকাশ থাকে। যদি কোনো ভিডিওতে কোনো রাজনৈতিক নেতা এমন কথা বলেন, যা তাঁর আগের আচরণ, রাজনৈতিক অবস্থান বা বক্তব্যের সঙ্গে একদমই মেলে না, তাহলে সেটি অবশ্যই সন্দেহজনক।

ডিপফেক সাধারণত এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে তা মুহূর্তের মধ্যে মানুষের মনে রাগ বা ঘৃণা তৈরি করে। তাই যখন আপনি কোনো ভিডিও দেখে সঙ্গে সঙ্গে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, তখনই সেটি আরও গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ডিপফেক ছড়ানোর আরেকটি সহজ কৌশল হলো ‘এখনই শেয়ার করুন’ ধরনের জরুরি বার্তা যুক্ত করা। এ ধরনের বার্তা মানুষের যুক্তিবোধকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।

আরও পড়ুন

করণীয় কী

বাংলাদেশ সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আন্তর্জাতিক সহযোগীরা এই হুমকি পুরোপুরি উপলব্ধি করেছে—এটি গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক। নির্বাচন কমিশন শুধু উদ্বেগ প্রকাশই করেনি, তারা বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে বলেছেন, এআই প্রচলিত নির্বাচনী সহিংসতার চেয়েও বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে।

এ জন্য একটি কেন্দ্রীয় সেল গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা ডিপফেক ও এআই-তৈরি ভুল তথ্য মোকাবিলা করবে। এই সেল বিটিআরসি, আইসিটি বিভাগ এবং বিভিন্ন সাইবার নিরাপত্তা ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ক্ষতিকর কনটেন্ট সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে; পাশাপাশি ইসি আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন প্রতিরোধ করা যায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রচেষ্টা। ইউএনডিপির নেতৃত্বে ব্যালট নামে একটি প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ইউএন উইমেন ও ইউনেসকোর মতো সংস্থাও কাজ করছে। এ প্রকল্প কেবল মনিটরিং নয়, এটি গণমাধ্যম ও সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা বাড়ানো, সক্ষমতা তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে কাজ করছে। এগুলো সবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং এগুলো প্রমাণ করে, রাষ্ট্র ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্রটিকে উপেক্ষা করছে না।

তবে বাস্তবতার কঠিন দিকটিও বিবেচনায় নিতে হবে। ভাষাগত বাধার কারণে বেশির ভাগ ডিপফেক শনাক্তকরণ টুল বাংলায় কাজ করে না। ফলে ভাইরাল বাংলা ভিডিও দ্রুত যাচাই করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। রিউমর স্ক্যানার ও ডিসমিসল্যাবের মতো স্বাধীন ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থসংকট, জনবলের অভাব এবং প্রয়োজনীয় এআই ফরেনসিক দক্ষতার অভাবের কারণে বড় পরিসরে কাজ করতে পারে না। এর ফলে নির্বাচন কমিশন তাদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতেও পারে না।

এর পাশাপাশি দেশে মিডিয়ার ওপর আস্থা কমে যাওয়ায় যেকোনো সরকারি ব্যাখ্যা ও ফ্যাক্টচেকিংকে অনেকেই রাজনৈতিক দৃষ্টিতে বিচার করেন। ফলে মিথ্যা তথ্য প্রতিরোধ করা আরও কঠিন হয়ে যায়। আর দেশের বহু মানুষ, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও কম সংযুক্ত এলাকায়, এখনো ডিজিটাল সাক্ষরতায় পিছিয়ে আছেন। তাঁরা ডিপফেকের সূক্ষ্মতা ধরতে না পারায় সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।

আরও পড়ুন

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমাধান হলো একটি সমন্বিত ব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকই হবে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের অংশ। সন্দেহজনক কোনো ভিডিও বা পোস্ট দেখলে নাগরিককে তিন ধাপে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, যে প্ল্যাটফর্মে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়েছে, সেখানে সরাসরি ‘False Information’ বা ‘Impersonation’ অপশন ব্যবহার করে রিপোর্ট করতে হবে। এতে অ্যালগরিদম দ্রুত ব্যবস্থা নেয়।

দ্বিতীয়ত, ভিডিওটি রিউমর স্ক্যানার বা ডিসমিসল্যাবের মতো প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হবে, যাতে তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করে জনগণকে তথ্য জানাতে পারে।

তৃতীয়ত, যদি ভিডিওটি নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করে বা সহিংসতা উসকে দেয় বা কোনো প্রার্থীকে টার্গেট করে, তাহলে স্থানীয় নির্বাচন কমিশন বা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে জানানো জরুরি। (ফোন: ০১৩২০০১০১৪৮, ই-মেইল:[email protected], ফেসবুক: https://www.facebook.com/cpccidbdpolice, নির্বাচনী প্রচারণায় নারীবিদ্বেষী ডিজিটাল কনটেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান এই নম্বরে: ০১৩২০০০০৮৮৮।)

ডিপফেক কেবল একটি মিথ্যা ভিডিও নয়; এটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অস্ত্র, যা আমাদের বিভ্রান্ত করতে চায় এবং গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করতে চায়। তাই আমাদের নিজস্ব সচেতনতা, সন্দেহ করার ক্ষমতা ও দায়িত্বশীল আচরণ এখন সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা। সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্যোগকে সম্মান জানিয়ে, একই সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত সতর্কতা ও দায়িত্ববোধ বজায় রেখে আমরা সবাই মিলে এই প্রতারণাকে পরাজিত করতে পারি।

আমাদের লক্ষ্য হতে হবে প্রতিটি মুঠোফোনের স্ক্রিনকে সত্য যাচাইয়ের জানালায় পরিণত করা, যাতে আমাদের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত তথ্যের ওপর দাঁড়ায়, বিভ্রান্তির ওপর নয়। এখন আমাদেরই বেছে নিতে হবে—আমরা কি সচেতন মিডিয়া ব্যবহার করব নাকি অ্যালগরিদমের অদৃশ্য অভ্যুত্থানের কাছে আত্মসমর্পণ করব।

  • রিজওয়ান-উল-আলম সহযোগী অধ্যাপক এবং চেয়ারম্যান, মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

    *মতামত লেখকের নিজস্ব