জংধরা ‘জিরো টলারেন্স’ ও মায়ের মাথা ফাটানো ছেলে

মাদকের টাকার জন্য মাথা ফাটানো মা শরিফা বেগম রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।ছবি: প্রথম আলো।

স্লোগানটা অতি পুরোনো হয়ে গেছে। তবু ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা ও তাঁদের প্রশাসন বলতেই আছেন, মাদকের ব্যাপারে আমাদের ‘জিরো টলারেন্স’। স্কুলের লাইব্রেরির তালার মতো যে পুরোনো এই স্লোগানে জং ধরে গেছে, তার দিকে কারও নজর নেই। জংধরা তালা খুলতে হলে যে তেলটেল দিতে হয় বা মেকানিক ডাকতে হয়, তার তো আর দরকার পড়ছে না। সে রকম ওই মাদকের ব্যাপারে আমাদের পুরোনো একটা স্লোগান আছে—জং ধরে গেলেও তারই দোহাই দিচ্ছেন সবাই। এদিকে যে তারাপদ রায়ের সেই কবিতার মতো ‘আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে’; তার দিকে কারও ভ্রুক্ষেপ নেই।

এক.

ফেনসিডিলের ব্যবসা করার জন্য বাবার বাড়ি থেকে এক লাখ টাকা আনাতে হাসিনা খাতুনের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছিলেন তাঁর স্বামী মো. রাতুল। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে গত ৫ মে হাসিনা কীটনাশক পান করেন। হাসপাতালে নিলে স্ত্রীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে রাতুল স্ত্রীর গা থেকে সব গয়নাগাটি খুলে নিয়ে পালিয়েছেন। হাসিনার লাশ পড়ে ছিল রাজশাহী মেডিকেল কলেজের হিমঘরে। হাসিনার স্বামী রাতুলের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ি মোল্লাপাড়া গ্রামে। প্রায় ৭ মাস আগে রাতুলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। হাসিনা (২১) দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

এ না হয় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে। হয়তো বলবেন, এই সম্পর্কের ভাঙনের শেষ নেই। প্রতারণারও শেষ নেই। আমার এক আত্মীয় তাই মাঝেমধ্যেই বলতেন, ‘তুমি যার পেট থেকে হয়েছ আর তোমার পেট থেকে যে হয়েছে, তাকে ছাড়া দুনিয়াতে আর কাউকে বিশ্বাস করবে না।’

তাহলে এবার এক মা-ছেলের মধুর সম্পর্কের কথা বলি, মায়ের নাম সোহাগী খাতুন। বয়স প্রায় ৫৫ বছর। তাঁর আদরের বড় ছেলের নাম সুমন। বয়স ২১। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সুমন মায়ের কাছে আসেন। মা খুশি হন। দিন শেষে ছেলে মায়ের কাছে এসে বসেছেন, কিন্তু মায়ের খুশির মুখে ছাই দিয়ে সুমন মায়ের কাছে টাকা চান। এত রাতে মা টাকা দিতে চাননি। অথবা টাকা হয়তো মায়ের কাছে ছিলও না। সুমন টাকার জন্য মায়ের সঙ্গে জেদাজেদি শুরু করেন।

একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মায়ের ওপরে হামলা করেন। কিছুক্ষণের মধ্যে মা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। গত ৩১ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজশাহী নগরের চন্দ্রিমা থানার খড়খড়ি এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল। পালানোর সময় এলাকাবাসী সুমনকে ধরে পুলিশে দিলেন। এলাকাবাসী জানান, সুমন দীর্ঘদিন ধরে বখাটে স্বভাবের আর মাদকাসক্ত।

দুই.

মাদক সেবনের জন্য প্রতিদিনই মায়ের কাছে টাকা চান সুজন আলী (২৮)। না দিতে পারলে মাকে মারেন। বাড়িতে ভাঙচুর করেন। অতিষ্ঠ হয়ে মা শরীফা বেগম গিয়েছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে। তিনি পাঠিয়েছিলেন থানায়। কিন্তু পুলিশ ছেলেকে ধরতে পারেনি। তখন ছেলে বাঁধা গরু ছাড়া পাওয়ার মতো আচরণ শুরু করেন। ইট ছুড়ে মায়ের মাথা ফাটিয়ে দেন। একই অবস্থা করেন বড় বোন ডালিয়ার (৩৫)।

গত ৩১ জানুয়ারি দুপুরে এ ঘটনা ঘটল রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার শিয়ালা গ্রামে। মা ও মেয়ে গোদাগাড়ী উপজেলা (প্রেমতলী) স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, মা শরীফার মাথা দিয়ে রক্ত ঝরছে। তিনি জরুরি বিভাগের বেডে শুয়ে কেঁদেই যাচ্ছেন। তাঁর মাথার নিচে একটি ওড়না। সেটি রক্তে ভেসে গেছে। পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন মেয়ে ডালিয়া। তাঁর মাথাও ফেটেছে ইটের আঘাতে। তিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

ডালিয়া বলেন, ‘আমার দুই ভাই। এর মধ্যে বড় ভাই সুজন মাদকাসক্ত। হেরোইন, গাঁজা, ইয়াবা—সব খান। মাদকের টাকার জন্য রোজ বাড়িতে ঝামেলা করেন। এ জন্য সন্তান রেখেই তাঁর স্ত্রী চলে গেছেন। সুজন কোনো কাজ করেন না। বৃদ্ধ মা ছোট ছেলে রুবেলের সংসারে খান। তাঁর কাছেই টাকার জন্য প্রতিদিন চাপ দেন সুজন। আমি অন্তঃসত্ত্বা। কবে জানি আমাদের মেরেই ফেলবে।’ এ কথা বলেই হু হু করে কান্নায় ভেঙে পড়েন ডালিয়া।

তিন.

সাজেদা বেগমের বয়স প্রায় ৫৫ হয়েছে। তাঁর স্বামী আবদুল মতিন আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র থাকেন। ছেলে রাজন (২২) স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। রাজন মাঝেমধ্যেই তাঁর মায়ের কাছে এসে মাদক সেবনের জন্য জোর করে টাকা নিয়ে যান।

৩ মে বিকেলে তিনি তাঁর মায়ের কাছে এসে ৫০০ টাকা দাবি করেন। মা টাকা দিতে পারেননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রাজন পকেট থেকে ছুরি বের করে তাঁর মায়ের পেটে উপর্যুপরি আঘাত করেন। এতে মায়ের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যায়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরের দিন এই মায়ের মৃত্যু হয়।

ঘটনা নাটোরের বড়াইগ্রামের। অবশ্য এর মধ্যে শ্বশুরবাড়ি থেকে ছেলেকে আটক করেছে পুলিশ (দৈনিক যুগান্তর, ৩ মে)। এ গল্পের শেষ নেই। দেখেশুনে মনে হয়, সন্তান জন্ম দেওয়ার দায়ে তার ভালো-মন্দ সব দাবি যেন মাকেই মেটাতে হবে।

চার.

তানোর থানার ওপেন হাউস ডে অনুষ্ঠান ছিল ৭ মে। তানোর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শমশের আলী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘তানোর পৌর সদরের চিহ্নিত মাদক সিন্ডিকেট এলাকা হিসেবে পরিচিত ঠাকুরপুকুরে বর্তমানে আর মাদক ব্যবসা হয় না।’ সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠানে উপস্থিত লোকজন সমস্বরে ‘হয় হয় হয়’,‘হয় হয় হয়’ বলে তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। এ অবস্থায় অনুষ্ঠানে হাসির রোল পড়ে যায়।

এ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান। সভাপতিত্ব করছিলেন তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মাসুদ পারভেজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন গোদাগাড়ী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মীর্জা আবদুস সালাম।

এ ছাড়া বিএনপি-জামায়াতের নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠানের অতিথিদের মুখেও হাসির রেখা ফুটে ওঠে। এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

তাই ওসি এস এম মাসুদ পারভেজের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বিএনপি নেতার বক্তব্য সঠিক, নাকি প্রতিবাদকারীরা সঠিক? উত্তরে তিনি বললেন, ‘যাঁরা বক্তব্য দিয়েছেন বা প্রতিবাদ করেছেন, তাঁরাই এটা বলতে পারবেন। আমরা সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঠাকুরপুকুরে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রেখেছি। মাদকের ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স।’

  • আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী