বিগত চার দশকে এ দেশের খাদ্য ও কৃষি উৎপাদন গবেষণায় উদ্ভাবিত প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে দেশের অভাবিত পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। সত্তরের দশকে খাদ্যসংকটে থাকা বাংলাদেশ আজ গবেষণার মাধ্যমে অনেকাংশে কৃষি উৎপাদনে সাফল্য লাভ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ও অভিঘাতজনিত প্রভাব মোকাবিলায় স্বল্প জীবনকালের এবং জলবায়ু সহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবন ব্যাপকভাবে উৎপাদনব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
দেশের চাল, সবজি, ফল, আলু, ডাল ও তেল উৎপাদনে সফলতার পেছনে এ দেশের কৃষি গবেষণায় নিয়োজিত উচ্চশিক্ষিত বিজ্ঞানীদের মেধা ও অভিজ্ঞতা এবং দেশপ্রেম দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর, অন্যদিকে কৃষকেরা পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, তাই উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। স্বল্প উপকরণ ব্যয়ে অধিক ও লাভজনক কৃষিব্যবস্থা প্রবর্তনে প্রয়োজন হবে মেধানির্ভর গবেষণা ব্যবস্থাপনা।
উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে বিগত দশকে কৃষিবিজ্ঞানীরা চাকরির বৈষম্য, অবহেলার আর হতাশার মধ্যে চাকরি করে যাচ্ছে। সত্তর বা আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা চাকরি ছেড়ে গবেষণায় যোগদান করেছেন। আজ চাকরির সুযোগ-সুবিধার অভাবে বিজ্ঞানীরা গবেষণা ছেড়ে ক্যাডার সার্ভিসে যোগদান করছেন বা বিদেশ চলে যাচ্ছেন।
নব্বই দশকে প্রায় ৪০০ জন অভিজ্ঞ মেধাবী বিজ্ঞানী দেশ ছেড়ে গেছেন, যার কোনো প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়নি। নিয়োগ পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে গবেষণায় যোগদান করে গত ১০ বছরে ২০০ জনের অধিক বিজ্ঞানী গবেষণা ছেড়ে কিছুদিনের মধ্যেই অন্য সার্ভিসে চলে গেছেন। ব্যাহত হচ্ছে গবেষণার ধারাবাহিকতা।
নব্বই দশকে প্রায় ৪০০ জন অভিজ্ঞ মেধাবী বিজ্ঞানী দেশ ছেড়ে গেছেন, যার কোনো প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়নি। নিয়োগ পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে গবেষণায় যোগদান করে গত ১০ বছরে ২০০ জনের অধিক বিজ্ঞানী গবেষণা ছেড়ে কিছুদিনের মধ্যেই অন্য সার্ভিসে চলে গেছেন। ব্যাহত হচ্ছে গবেষণার ধারাবাহিকতা।
বাংলাদেশে ১৩টি কৃষি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সমন্বয়ে একটি জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেম (ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচার রিসার্চ সিস্টেম-এনএআরএস) চালু রয়েছে। এর মধ্যে ৭টি স্বায়ত্তশাসিত এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ভুক্ত স্বায়ত্তশাসিত বা সরকারি সংস্থা।
ভিন্ন ভিন্ন আইনে প্রতিষ্ঠিত ও ৫টি মন্ত্রণালয়ের আওতায় এই জটিল সিস্টেম সুষ্ঠু গবেষণা ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে এশিয়ার সব কৃষি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান একটি অভিন্ন সার্ভিস কাঠামো দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে এবং মেধা ধরে রাখা বা লালনের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হয়ে থাকে। তা ছাড়া যুগের প্রয়োজনে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিবর্তন করে চলেছে। ভারতের প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠান একটি স্বায়ত্তশাসিত কাউন্সিল (সোসাইটি) দ্বারা পরিচালিত।
অন্যদিকে এর প্রধান (মহাপরিচালক) ক্যাবিনেট দ্বারা নির্বাচিত দেশবরেণ্য কৃষিবিজ্ঞানী, যিনি সরকারের কৃষিসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ফসল ছাড়াও প্রাণী, মৎস্য, অর্থনীতি ও নীতি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত ও যান্ত্রিকীকরণ, অর্থনীতি ও নীতি ইত্যাদি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কাউন্সিলের মাধ্যমে অভিন্ন কাঠামোতে পরিচালিত। একটি কেন্দ্রীয় ও স্বাধীন বিজ্ঞানী রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে সব বিজ্ঞানী নিয়োগ ও পদোন্নতি হয়ে থাকে। প্রাদেশিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কাউন্সিলর সঙ্গে সম্পৃক্ত। মেধা লালনের জন্য বিজ্ঞানীদের অবসরসীমা বৃদ্ধি, উচ্চশিক্ষা ভাতা (পিএইচডি), শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ মেধাসম্পন্ন বিজ্ঞানীদের পদোন্নতিসহ নানা ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয়।
ভারতের প্রায় ৮৫ শতাংশ পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত, যা এই অঞ্চলের সব থেকে বেশি, পক্ষান্তরে বাংলাদেশে তা ৪০ শতাংশ। এ কারণে ভারতের সিস্টেম পৃথিবীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল। পাকিস্তানে একটি স্বায়ত্তশাসিত কাউন্সিলের মাধ্যমে অভিন্ন নীতিমালায় কৃষির সব শাখার গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয়। গবেষণালব্ধ পণ্য বাণিজ্যকরণের সুবিধা বিজ্ঞানীরা পেয়ে থাকেন। থাইল্যান্ডের কৃষি, ধান, মৎস্য এবং প্রাণিসম্পদ গবেষণা বিভাগগুলো একটি মন্ত্রণালয়ভুক্ত এবং সরকারের অন্যান্য সংস্থার মতো পরিচালিত হয়।
লক্ষণীয়, বর্তমানে আমাদের দেশে সব কটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সব মহাপরিচালক এবং চেয়ারম্যান সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রুটিন দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন এবং এর মধ্যেই কয়েকজন রুটিন দায়িত্ব থেকেই অবসরে চলে গেছেন। এটা একধরনের অবিচার, বৈষম্যপূর্ণ—যা কাম্য নয়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) ২০১২ আইনে গবেষণা সমন্বয় ও জবাবদিহি উন্নয়নের পদক্ষেপের উল্লেখ থাকলেও তা কার্যকর না হওয়ার ফলে গবেষণার সমন্বয়ে ব্যাঘাত ও মানোন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না। বিএআরসি আইনে নীতিনির্ধারণে শক্তিশালী গভর্নিং বডি নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয় না বা হলেও সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না। বিএআরসি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও কার্যকরভাবে তা পরিচালনা করা যাচ্ছে না।
নিম্নে গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চলমান বৈষম্য এবং করণীয় তুলে ধরা হলো
দীর্ঘ ১০-১২ বছর চাকরির পরও পদ না থাকায় পদোন্নতির না হওয়ার ফলে বিজ্ঞানীরা গবেষণায় আগ্রহ হারাচ্ছেন। সুপারন্যুমেরি পদ সৃজন করে যোগ্য বিজ্ঞানীদের পদোন্নতির ব্যবস্থা করা যেতে পারে;
সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় পেনশন থাকলেও কৃষি গবেষণার স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অনেকেই পেনশন সুবিধার পাচ্ছেন না। অচিরেই পেনশন সুবিধা প্রবর্তন করা প্রয়োজন;
কৃষি মন্ত্রণালয়ের স্বায়ত্তশাসিত ফসল গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন আইন ও সার্ভিস কাঠামো দ্বারা পরিচালিত, যা সুষ্ঠু গবেষণা ব্যবস্থাপনার অন্তরায়। ফলে নিয়োগ বা অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি করা সম্ভব হচ্ছে না। এসব প্রতিষ্ঠানের দক্ষ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি অভিন্ন সার্ভিস কাঠামো প্রবর্তন জরুরি;
কৃষি গবেষণায় মেধা লালন করার লক্ষ্যে জাতীয় বিজ্ঞানী বা ইমেরিটাস সায়েন্টিস্ট পদ সৃষ্টি করে দেশের কাজে লাগানো যেতে পারে;
কৃষিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈশ্বিক জ্ঞান-বিজ্ঞান আদান–প্রদান
প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন;
গবেষণায় অনন্য সাধারণ সফলতার জন্য পুরস্কার বা পদোন্নতির ব্যবস্থা করা যেতে পারে:
প্রকল্প সাহায্যের বাইরে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকে বরাদ্দ রাখা যেতে পারে এবং
অন্যান্য সার্ভিসের মতো কৃষি গবেষণায় সুযোগ-সুবিধা (যেমন বিজ্ঞানীদের উৎসাহ প্রদানের জন্য গবেষণা ভাতা, সামাজিক মর্যাদা, চিকিৎসাসুবিধা, উচ্চশিক্ষার সুযোগ ইত্যাদি) বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
দেশে টেকসই খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা অর্জনে বর্ণিত সুপারিশ বা বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে সরকারের বিবেচনা করা প্রয়োজন বিশেষভাবে যখন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধবিগ্রহসহ নানা কারণে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। দেশের কৃষি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গতিশীল ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার স্বার্থে, তথা টেকসই কৃষি উন্নয়নের স্বার্থে উল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা সময়ের দাবি।
ড. ওয়ায়েস কবীর সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। ই-মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব