লাতিন আমেরিকা যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দখলে চলে যাচ্ছে

মার্কিন নৌবহররয়টার্স

লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা ক্রমে বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গত মার্চ মাসে গঠিত আমেরিকাস কাউন্টার-কার্টেল কোয়ালিশনের (এসিসিসি) ছত্রচ্ছায়ায় মার্কিন বাহিনী মাদক পাচারের সন্দেহে বিভিন্ন জলযানে হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তারা লাতিন আমেরিকার সামরিক বাহিনীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার করছেন।

এটি অঞ্চলটিতে ওয়াশিংটনের সামরিকীকরণ নীতি জোরদার করার একটি প্রতিফলন, বিশেষ করে যখন সেখানে বামপন্থী রাজনীতির প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে। লাতিন আমেরিকার জন্য এর অর্থ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সেই পুরোনো বলপ্রয়োগকারী নীতির পুনরাবৃত্তি।

প্রতিনিধি পাঠানোর মাধ্যমে ক্ষমতার প্রদর্শন, সরাসরি মার্কিন সেনা উপস্থিতি কিংবা আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে মার্কিন সামরিক ক্ষমতার যে প্রসার ঘটছে, তা এ অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার বা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোনো কাজে আসবে না। বরং এটি গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং সহিংসতা ও অস্থিরতাকে আরও উসকে দিতে পারে।

আরও পড়ুন

মনরো নীতির প্রত্যাবর্তন

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও এসিসিসির সদস্য হিসেবে রয়েছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ১৭টি দেশ—আর্জেন্টিনা, বাহামা, বেলিজ, বলিভিয়া, কোস্টারিকা, ইকুয়েডর, গায়ানা, গুয়াতেমালা, প্যারাগুয়ে, জ্যামাইকা, পানামা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, হন্ডুরাস, এল সালভাদর, ডমিনিকান রিপাবলিক, কলম্বিয়া ও পেরু।

ভেনেজুয়েলা আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটের অংশ না হলেও মনে হচ্ছে, দেশটি মার্কিন সামরিক অভিযানের জন্য তার ভূখণ্ড উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার অনানুষ্ঠানিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এসিসিসি পুরো ‘আন্দিয়ান আর্ক’ পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সরবরাহকৃত সমস্ত কোকেন উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু। এখানেই অঞ্চলের অনেক সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।

তবে এই জোট কেবল মাদকের বিরুদ্ধে লড়তেই তৈরি করা হয়নি বলেই মনে হয়। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, এসিসিসির অন্যতম লক্ষ্য হলো ‘পশ্চিম গোলার্ধের বাইরে থেকে আসা ক্ষতিকর প্রভাব’ মোকাবিলা করা, যা মূলত চীনের প্রতি ইঙ্গিত করে।

আরও পড়ুন

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সেনাবাহিনী একটি স্থল অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার মাত্র দুই মাস পর ফ্লোরিডায় এসিসিসি গঠিত হওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

একই ধারায় আরেকটি পদক্ষেপ দেখা যায় গত ৪ আগস্ট, যখন মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড (সাউথকম) ‘ওয়েস্টার্ন হেমিস্ফিয়ার জয়েন্ট টাস্কফোর্স’ গঠনের ঘোষণা দেয়। এর কাজ হবে ‘হুমকি মোকাবিলা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার এবং দ্রুত সংকট নিরসনে মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে মার্কিন সামরিক অভিযানের সমন্বয় করা’। এই নতুন টাস্কফোর্স এসিসিসির ১৮টি সদস্যরাষ্ট্রের কমান্ড ও কন্ট্রোলকে একত্র করবে।

ওয়াশিংটন স্পষ্টতই অঞ্চলে তার একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তারা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা–সম্পর্কিত সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চায়, যা ১৮২৩ সালের ‘মনরো নীতি’র এক আধুনিক সংস্করণ বা ‘ট্রাম্প করোলারি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।

লাতিন আমেরিকার নেতাদের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
রয়টার্স

লাতিন আমেরিকার সামরিকীকরণ

সাম্প্রতিক অভিযানগুলো নতুন করে মার্কিন সামরিক শক্তি প্রয়োগের ধরন কেমন হবে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। গত জুনে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশ করেন, ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে মার্কিন সেনাবাহিনী বলিভার রাজ্যে ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’ নামের অপরাধী চক্রের নেতা হেক্টর গেরেরো ফ্লোরেসকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। পরবর্তী সময়ে ভেনেজুয়েলা সরকারও এক বিবৃতিতে দুই দেশের যৌথ অভিযানের বিষয়টি স্বীকার করে।

আগস্টের শেষ ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে নতুন গঠিত ওয়েস্টার্ন হেমিস্ফিয়ার জয়েন্ট টাস্কফোর্স সন্দেহভাজন কয়েকটি জলযানে হামলা চালায়, যাতে অন্তত দুজন নিহত হয়। এটি ছিল ‘সাউদার্ন স্পিয়ার’ অভিযানের ধারাবাহিকতা, যে অভিযানে এ পর্যন্ত অন্তত ২২০ জন নিহত হয়েছে। অথচ নিহত ব্যক্তিদের সবাই সত্যি সত্যি মাদক পাচারে জড়িত ছিল কি না, তা নিয়ে কোনো তদন্ত করা হয়নি।

এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ঘোষণা। তিনি জানান, কলম্বিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট অ্যাবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েল্লা ‘মাদক-সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার’ নামে কলম্বিয়ায় মার্কিন বাহিনীকে সামরিক অভিযান পরিচালনার অনুমতি দিয়েছেন।

সরাসরি মার্কিন সেনা উপস্থিতি কিংবা আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে মার্কিন সামরিক ক্ষমতার যে প্রসার ঘটছে, তা এ অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার বা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোনো কাজে আসবে না। বরং এটি গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং সহিংসতা ও অস্থিরতাকে আরও উসকে দিতে পারে।

এসবের অর্থ দাঁড়ায়, যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকায় তার সামরিক প্রভাব আরও বিস্তার করতে চায়—তা যৌথ অভিযানের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমেই হোক কিংবা আকাশসীমা ব্যবহার বা সামরিক ঘাঁটিগুলোয় প্রবেশাধিকারের মতো একতরফা পদক্ষেপের মাধ্যমে।

মার্কিন দৃষ্টিতে যে ঘটনাকেই হুমকি মনে হবে, তা নিশ্চিহ্ন করতে মাঠে সরাসরি মার্কিন সৈন্যের উপস্থিতি দেখা যেতে পারে।

লাতিন আমেরিকার জন্য মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ নতুন কিছু নয়। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে ওয়াশিংটন গোপনে নানা কর্মকাণ্ড চালিয়েছে, আবার কিউবায় ‘বে অব পিগস’ আক্রমণ বা গ্রেনাডায় আগ্রাসনের মতো প্রকাশ্য অভিযানও চালিয়েছে।  

স্নায়ুযুদ্ধের পর মার্কিন প্রভাব রূপ নেয় মাদকবিরোধী অভিযানের নামে, যা সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনেনি। ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের ‘প্ল্যান কলম্বিয়া’র কথাই ধরা যাক, যার উদ্দেশ্য ছিল মাদক পাচার এবং বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মোকাবিলা করা।

আরও পড়ুন

যদিও এটি বিদ্রোহী সংগঠনগুলোকে দুর্বল করতে ভূমিকা রেখেছিল, তবে এটি ভয়াবহ সহিংসতার জন্ম দেয়। মার্কিন প্রশিক্ষিত কলম্বিয়া সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তারা নিজেদের সফলতা দেখাতে হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে হত্যা করে বিদ্রোহী বলে চালিয়ে দিয়েছিল।

‘প্ল্যান কলম্বিয়া’র নামে ১০ বিলিয়ন ডলার মার্কিন তহবিল দেওয়া হলেও দিন শেষে তা কলম্বিয়ার নিরাপত্তাকে কেবল সামরিকীকরণের দিকে ঠেলে দেয়, সশস্ত্র সংঘাত ও কার্টেল সহিংসতা বাড়ায় এবং শ্রমিকনেতা, কৃষক ও সাধারণ জনগণের ওপর নিপীড়ন বাড়ায়। এটি কোকা চাষের বিস্তার রোধ করতেও ব্যর্থ হয়।

অতীতের এই রক্তাক্ত ইতিহাস বিবেচনা করলে বলা যায়, লাতিন আমেরিকান দেশগুলোয় সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং মার্কিন উপস্থিতি বাড়ানোর তাগিদ অঞ্চলে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে
রয়টার্স

লাতিন আমেরিকার সমাজে প্রভাব

অঞ্চলে বর্ধিত মার্কিন সামরিক উপস্থিতির প্রভাব কেবল নিরাপত্তা খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এসিসিসির সদস্য হওয়ার অর্থ হলো প্রথাগত জাতীয় প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি করা।

এর ফলে জাতীয় বাজেটের ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে অর্থ সরিয়ে প্রতিরক্ষা খাতে ঢালা হবে। সেবা খাতের অবক্ষয় জনগণের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়াবে।

এরপর আসে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতি তৈরিতে, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সামরিক সহযোগিতার পরিধি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতে চাইবে। ওয়াশিংটন তার এজেন্ডা বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার ও আইনসভার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

এমনকি মার্কিন কর্মকর্তারা এসিসিসি সদস্যদেশগুলোকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) থেকে বেরিয়ে আসার জোর তাগিদ দিয়েছেন, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য শুভ লক্ষণ নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিচার থেকে পার পাইয়ে দেওয়া বা দায়মুক্তি নিশ্চিত করা।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির এ অভাব লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে উদীয়মান কর্তৃত্ববাদী প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করবে। এর পরিণতি আমাদের সবার জানা—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার বৃদ্ধি, আইনের শাসনের অবক্ষয় এবং এর ফলে নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানের অবনতি।

  • কার্লোস এইচ ব্র্যান্ড এস একজন রাজনীতিবিষয়ক বিজ্ঞানী ও হাইড্রোকার্বন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ। আল–জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।