২.

আমরা শ্রীলঙ্কা হয়ে যাইনি, সম্ভবত হবও না। কিন্তু আমরা যে খুব বড় বিপর্যয়ের মধ্যে আছি, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ১২ বছর পর ঘোষণা দিয়ে লোডশেডিং, এক দশক পর আইএমএফের কাছে ঋণের আবেদন, ডলারের অভূতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের অব্যাহত ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানির অভাবে সার কারখানা, সেচ ও পেট্রলপাম্পে অনিশ্চয়তা—গত তিন মাসে এতগুলো ঘটনা এ বিপর্যয়েরই সাক্ষ্য বহন করে।

সরকার এ অবস্থা মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। জনগণের কাছে নির্দেশ আসছে যতটা পারা যায় ব্যয় সংকোচনের, জ্বালানি সাশ্রয়ের, অপচয় বন্ধের। দেশের সংকটে নাগরিকেরা অবশ্যই এসব করার চেষ্টা করবেন। সরকার যদি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য আরও ব্যবস্থা নেয় (যেমন: অফিস-আদালত সপ্তাহে দুই দিন অনলাইন, সেই দুই দিন প্রাইভেট কারের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া, ব্যাটারিচালিত যান বন্ধ করা, এসি ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ, প্রিপেইড গ্যাস আর বিদ্যুৎ বিলের ব্যবস্থা), তাহলে জনগণকে তা সমর্থন করা উচিত। কিন্তু এসবকে স্বতঃস্ফূর্ত করতে হলে সরকারকে আরও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, কিছু জবাবদিহিও করতে হবে।

সরকারকে প্রধানত যা করতে হবে, নিজের ব্যয় সংকোচন করতে হবে। নিজের জানা ঘটনা থেকে ব্যাখ্যা করে বলি। ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকে সরকার ব্যাপকভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রদান করে, যুগ্ম সচিব পদমর্যাদা পর্যন্ত সব সরকারি কর্মকর্তাকে সহজ সুদে গাড়ি কিনতে দেয় এবং সেই গাড়ি তেল ও চালক বাবদ প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা করে প্রদানের ব্যবস্থা করে। এরপর সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার হিড়িক পড়ে যায়, বিনা খরচের পেট্রল ব্যবহারের ধুমও লেগে যায়।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তার পরিবারের বাজারসদাই, ঘোরাফেরা, স্কুল ডিউটি আর বিনোদনের জন্য পেট্রল ও চালকের খরচ সাধারণ মানুষ দেবে কেন? কোনো দেশে কি নেওয়া হয় এ ধরনের জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত? সরকারকে এ ধরনের মাসিক খরচ প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। দৃষ্টান্ত সৃষ্টির জন্য হলেও রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার আর প্রধান বিচারপতি ছাড়া বাকি সবাইকে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন সরকারি পরিবহন পুলের বাস বা মাইক্রোবাস ব্যবহার করতে হবে। সংবিধান অনুসারে সরকারি কর্মচারীরা দেশের জনগণের সেবকমাত্র। অন্তত দেশের সংকটকালে এটা মনে রেখে তাঁদের বিলাসিতা কমাতে হবে।

লোডশেডিংয়ের মতো পদক্ষেপগুলো নিতে হবে বৈষম্যহীনভাবে। আমি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলামের একটি বই পড়লাম সম্প্রতি। মেকিং অব আ নেশন বাংলাদেশ নামক গ্রন্থের একটি অংশ পড়ে জানা গেল, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় ত্রাণের কিছু খাবার রাজধানী থেকে বেশি দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকায় প্রেরণের সুযোগ ছিল। রাজধানীর মানুষ খেপে গেলে সরকার বেশি বিপাকে পড়বে—এ চিন্তা থেকে তা করা হয়নি। আমার মনে হয় না এই মনোভঙ্গি থেকে আমরা বের হতে পেরেছি। হতে পারলে রাজধানীতে এক ঘণ্টা আর গ্রামাঞ্চলে সাত থেকে আট ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের খবর পেতাম না আমরা। মনে রাখতে হবে, আমাদের খাদ্য আর কাঁচামাল আসে গ্রাম-মফস্‌সল থেকেই। সেচের বিদ্যুৎ সচিবালয়ের বিদ্যুতের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আমি শুধু কিছু উদাহরণ দিলাম। এ রকম আরও বহু পদক্ষেপের প্রস্তাব বিভিন্ন মহল থেকে আসছে। সরকারকে এসব প্রস্তাব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। জনগণকে ঢালাওভাবে কৃচ্ছ্রের বাণী দিয়ে আর লোডশেডিংয়ের মতো জিনিস চাপিয়ে দিলে হবে না। আপনি আচরি ধর্ম! আগে সরকারের লোকজনকে কৃচ্ছ্রের উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে।

৩.

লোডশেডিং, ব্যয় সংকোচন ও কৃচ্ছ্র জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে হলে সরকারকে কিছু বিষয়ে জবাবদিহিও করতে হবে। রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মেয়াদ কয়েক দফা বাড়িয়ে তাদের বিদ্যুৎ ছাড়াই প্রতি মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে সরকার। মনে রাখতে হবে, এ টাকা সরকারের নয়, দফায় দফায় বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন বিল বাড়িয়ে আমাদের পকেট থেকে এ টাকা নেওয়া হয়েছে। আমাদের এই প্রায় লাখো কোটি টাকা কুইক রেন্টালের নামে কাদের দিয়েছে সরকার, তাদের সঙ্গে সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের কী সম্পর্ক, তা জানার অধিকার আছে জনগণের। বিদেশে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনকারীদের থেকে সংকটের সময় বাড়তি কর আদায়ের বহু নজির আছে। ভাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র নামে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটকারীদের ওপর দেশের এ সংকটের সময় বাড়তি কর ধার্য করতে হবে। সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, সংসদ, উচ্চ আদালতকে ভাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের নৈরাজ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে।

দেশের এই বিদ্যুৎ-সংকট সৃষ্টির পেছনে সরকারের আরও ব্যাপক ব্যর্থতা রয়েছে। ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থেকে তারা যে আসলে বিদ্যুৎ–নিরাপত্তা নয়, মূলত বিদ্যুৎ তৈরির কারখানা (পাওয়ার প্ল্যান্ট) বানিয়েছে, সেটি এখন স্পষ্ট হয়েছে। এসব পাওয়ার প্ল্যান্ট চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির নিশ্চয়তার জন্য তাদের ব্যাপক গ্যাস অনুসন্ধান করা উচিত ছিল, উচিত ছিল বিকল্প হিসেবে বিদেশ থেকে এলএনজি কেনার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করার। সেটি না করে কিছু মহলকে ব্যাপক আর্থিক সুবিধা দেওয়ার জন্য স্পট মার্কেট বা ফাটকা বাজার থেকে এলএনজি কেনা হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানির জন্য আমেরিকা ও ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করছে। ফলে এলএনজির জন্য এখন আরও বেশি ফাটকা বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। রিজার্ভ কমার এই সময়ে আকাশছোঁয়া এই ফাটকা বাজার থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি কেনার সামর্থ্যও বাংলাদেশের নেই।

কার স্বার্থে, কী উদ্দেশ্যে জ্বালানি মন্ত্রণালয় স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কেনার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এটা জনগণের জানার অধিকার আছে। অধিকার আছে এই এলএনজি ব্যবসায়ীদের উচ্চ মুনাফার ওপর বাড়তি কর আরোপের দাবি তোলার। অধিকার আছে সরকারি যেকোনো ব্যয়ে জবাবদিহি দাবি করার।

৪.

জনগণ শান্ত থাকে, থাকতে চায়। কিন্তু তার মানে এই নয়, মনের কষ্ট আর ক্ষোভ ভুলে যায় তারা। দেশের সংকটকালে এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ হলে শান্ত সমুদ্র কীভাবে গর্জে ওঠে, তা আমরা আজকের শ্রীলঙ্কা শুধু নয়, নিকট অতীতে বহু দেশে দেখেছি।

জনগণকে শান্ত রাখার দায় সরকারের। দেশের দুর্যোগকালে সময়মতো সত্যিকারের জনবান্ধব পদক্ষেপ নিলে মানুষ শান্ত থাকবে। সরকার নিজে কৃচ্ছ্র পালন করে, কুইক রেন্টাল, এলএনজি ব্যবসায়ীদের ওপর উচ্চ মুনাফা কর ধার্য করে, দেশের সম্পদ পাচারকারী, ব্যাংক লোপাটকারী আর দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে, নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য বিভিন্ন সহায়তামূলক ব্যবস্থা করে জনগণের বহু কষ্ট আর ক্ষোভকে প্রশমিত করতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের সেই সদিচ্ছা আছে কি? সদিচ্ছা থাকলে আছে কি তা বাস্তবায়নের সামর্থ্য?

আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন