গাড়ীর বাক্সে ছাগলের দমবন্ধ মৃত্যু ও নিশ্চুপ প্রাণিকল্যাণ আইন

যাত্রীবাহী বাসের লাগেজ বক্সে করে লক্ষ্মীপুরে আনার পথে দম বন্ধ হয়ে ৪৭টি ছাগল মারা গেছে। লালমনিরহাট থেকে ছাগলগুলো লক্ষ্মীপুরে আনা হয়।ছবি: সংগৃহীত

প্রাণীর প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতা কমাতে ১৯২০ সালে ‘দ্য ক্রুয়েলটি অব অ্যানিমেলস অ্যাক্ট’ তৈরি হয়েছিল। ২০১৯ সালে আইনটি রহিত করে এর বিষয়গুলোকে বিবেচনায় এনে বাংলাদেশ জারি করে ‘প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯’।

কিন্তু এসব আইন প্রাণীর প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতা থামাতে পারেনি। বরং মানুষ প্রাণীর ওপর আরও নির্মম ও নিষ্ঠুর হয়েছে। বাণিজ্য, মুনাফা ও ভীমরতি ভোগের অন্যায় কোপে ফালি ফালি করা হচ্ছে প্রাণীদের জীবন।

প্রতিদিন দেশজুড়ে এমন নৃশংস বিশৃঙ্খল দৃশ্য দেখে আমাদের শিশুরা বড় হয়। ট্রাকে, ভ্যানে গাদাগাদি করে কিংবা খাঁচা বোঝাই করে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি পরিবহন করা হয়। অস্বস্তিকর যানজটে বন্দী কয়েদির মতো দাঁড়িয়ে থাকা গরুর অসহায় চাহনিগুলো মুহূর্তে হারিয়ে যায় নাগরিক কোলাহলে। ঈদ, উৎসব, বিয়ে, বৃহৎ ভোজ কিংবা পার্বণে প্রাণীদের এমন করুণ নির্দয় যাত্রা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। আইন-আদালত বসিয়ে এই নিষ্ঠুরতা থামানো সম্ভব নয়। দরকার প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের সংস্কৃতির বিকাশ।

বুনো উদ্ভিদ ও প্রাণীকে মানুষ ‘গৃহপালিত’ করেছে, নাকি উদ্ভিদ-প্রাণীরাই মানুষকে গৃহপালিত করে, এ নিয়ে তর্ক আছে। যা–ই হোক, বহু বুনো জাত আজ যেমন আবাদি ফসল, তেমনি বহু বুনো প্রাণী আজ মানুষের গৃহপালিত প্রাণিসম্পদ।

বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষিসংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে প্রাণিসম্পদের বহুমাত্রিক অবদানকে সঙ্গে নিয়েই। গরু, মহিষ, ছাগল, শূকর, ভেড়া, হাঁস, মুরগি কিংবা কবুতর—সব মিলেই গ্রামীণ জীবনের সংসার। প্রাণিসম্পদের প্রাচুর্য ও বৈভব গ্রামীণ সামাজিক ক্ষমতা ও অর্থনীতির এক মজবুত ভিত। তাই প্রবাদ তৈরি হয়েছে, ‘ধান বড় ধন, আর ধন গাই, সোনা–রুপা কিছু কিছু, আর সব ছাই।’

গ্রামে গরু–ছাগলেরও মানুষের মতো একেকটি নাম থাকে। পরিবারের সদস্য হিসেবেই তারা বড় হয়। প্রাণীদের কোনো অসুখ বা সমস্যায় পুরো পরিবার দুশ্চিন্তায় থাকে। এখনো বন্যা হলে কলার ভেলায় পরিবার–পরিজনের সঙ্গে বাড়ির গরু, ছাগল, মুরগি নিয়ে বাঁচার আশায় ছোটেন গ্রামীণ নারীরা। দেখা গেছে, ঘূর্ণিঝড়ের সময় উপকূলের গরিব নারীরা ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র যেতে পারেন না; কারণ, মুরগি-হাঁস-ছাগল নিয়ে সেখানে যাওয়া যায় না। এখনো দেশের বহু গরিব গ্রামীণ নারীর সম্বল একটা মুরগি বা হাঁসের ছানা।

যে দেশের মানুষ প্রাণীর মৃত্যুতে শোকার্ত হওয়ার ঐতিহাসিক সংস্কৃতি ধারণ করেন, সেই দেশেই আজ প্রতিদিন নিষ্ঠুরভাবে প্রাণীদের গাদাগাদি করে কষ্ট দিয়ে পরিবহন করা হয় বিক্রির জন্য।

ষাটের দশকে প্রবর্তিত বিষনির্ভর সবুজবিপ্লব প্রকল্প পাল্টে দিয়েছিল কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা, তারই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে অনিরাপদ বৃহৎ গবাদি প্রাণিসম্পদ বাণিজ্য। যেখানে গরু, ছাগল, মুরগিরা কোনো প্রাণসত্তা নয়; মাংসের দলা কিংবা দুধ-ডিম উৎপাদনের মেশিন। তাই এদের ভারী ধাতু মেশানো বিষাক্ত খাবার খাওয়ানো হয় কিংবা শরীরে ঢোকানো হয় অ্যান্টিবায়োটিক। নানাভাবে এদের শরীর নিয়ন্ত্রণ করা হয় কিংবা ভীষণ কষ্ট দিয়ে পরিবহন করা হয়। প্রাণীরা আর আমাদের পরিবারের অংশ নয়, নয়া উদারবাদী ভোগসর্বস্ব মুনাফার ময়দান।

সম্প্রতি লালমনিরহাট থেকে যাত্রীবাহী বাসের বক্সে করে লক্ষ্মীপুরে পরিবহনের সময় দমবন্ধ হয়ে মারা যায় ৪৭টি ছাগল। ২৭ মার্চ ছাগলগুলোকে বাতাসহীন বক্সে ঢোকানো হয়। বাতাসহীন বক্সে দীর্ঘ যাত্রায় ছাগলের মৃত্যুর পর বাসচালক ও সুপারভাইজারের সঙ্গে ছাগল ব্যবসায়ীর ঝগড়া হয়।

ঘটনা জানাজানির পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উভয় পক্ষকে ৫ হাজার করে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। তবে নিষ্ঠুরভাবে এই ছাগল পরিবহন নতুন কোনো ঘটনা ছিল না। রাষ্ট্র কোনোভাবেই এই নির্মম মৃত্যুর দায় এড়াতে পারে না।

ছাগল ব্যবসায়ী জানান, দুই বছর ধরে তিনি এভাবে বাসের বক্সে ছাগল পরিবহন করছেন। প্রতিটি ছাগলের জন্য ৩০০ টাকা ভাড়াও দিতে হয়। দীর্ঘদিন এই নিষ্ঠুর বেআইনি কাজ চলছে অথচ পরিবহন কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন বা প্রাণিসম্পদ বিভাগ কেন কোনো ব্যবস্থা নিল না? এতগুলো জীবন্ত প্রাণকে কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলার ন্যায়বিচার মাত্র ১০ হাজার টাকা জরিমানা কীভাবে হতে পারে? এই বিচারের বার্তা কি কাউকে সতর্ক ও দায়িত্বশীল করবে?

তবে এই প্রথম নিষ্ঠুরভাবে পরিবহনের কারণে প্রাণীদের মৃত্যু ঘটেনি, এমন প্রশ্নহীন প্রাণী হত্যা ঘটেই চলেছে। চলতি আলাপে আমরা সামান্য কিছু নজির হাজির করছি, যদিও কেবল পরিবহন নয়, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার সামগ্রিক বিষয়গুলোই খতিয়ে দেখা জরুরি। আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক বিচার যেমন জরুরি, জরুরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত সক্রিয় তৎপরতা। একই সঙ্গে প্রাণিসম্পদ লালন–পালন কিংবা বাণিজ্য—সর্বক্ষেত্রে প্রাণীদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার সংস্কৃতি বিকশিত করা দরকার।

প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধে খামারি, বিক্রেতা, ক্রেতা, ভোক্তা থেকে শুরু করে সব শ্রেণি–পেশা–বর্গের নাগরিক ঐক্য জরুরি। প্রাণিসম্পদ বিভাগ নানা মেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। অঞ্চল, পরিবহনব্যবস্থা, পথের দূরত্বকে গুরুত্ব দিয়ে প্রাণিসম্পদ পরিবহন পঞ্জিকা তৈরি করতে পারে। আশা করব, আসন্ন কোরবানির ঈদের আগেই প্রাণীদের পরিবহন নিরাপদ ও আরামদায়ক হবে।

বাসের লকারে পুড়ে ছাগলের মৃত্যু, জানুয়ারি ২০২৫

ঢাকাগামী একটি বাসের লকারে ছাগল রাখা হয়েছিল। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ফুলবাড়িয়া এলাকায় একটি অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে বাসের ধাক্কা লাগে, পরে বাসটিকে অন্য একটি বাস ধাক্কা দেয়। এতে অ্যাম্বুলেন্স ও বাস দুটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে পুড়ে মারা যায় বাসের লকারের ৫০টি ছাগল।

১৮ ছাগলের মরদেহ, জুলাই ২০২২

পাবনা থেকে কোরবানির পশুর হাটে বিক্রির জন্য বাসের বক্সে করে ছাগল এনেছিলেন এক ব্যবসায়ী। প্রচণ্ড গরম এবং বায়ুশূন্য বক্সে ছাগলগুলো মরে ঝলসে যায়। রাস্তায় দীর্ঘ যানজটে আটকে পড়েছিল বাসটি। রাতে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাইপাইল এলাকায় ছাগলের মরদেহগুলো ফেলে দেওয়া হয়।

যানজট ও লাখ টাকার গরুর মৃত্যু, জুলাই ২০২১

পাবনার সাঁথিয়া থেকে কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য ট্রাকে করে ছয়টি গরু এনেছিলেন এক মালিক। যানজট ও গরমে গরুগুলো অসুস্থ হয়ে যায়। একটি গরু পথেই মারা যায়। গরুর মালিক তখন গণমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, এর দাম পাঁচ লাখ টাকা।

পিকআপেই অঙ্গার ৮ হাজার মুরগির বাচ্চা, জুন ২০২০

যশোর থেকে ১২ হাজার মুরগির বাচ্চা নিয়ে বগুড়ায় যাচ্ছিলেন এক খামারি। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া পৌঁছালে গাড়ির ত্রুটির কারণে আগুন লেগে যায়। আগুনে অঙ্গার হয় আট হাজার মুরগির বাচ্চা।

ট্রাক উল্টে ৫ ষাঁড়ের মৃত্যু, আগস্ট ২০১৯

চুয়াডাঙ্গার শিয়ালমারা হাট থেকে ১৮টি ষাঁড় কিনে একটি ট্রাকে গাদাগাদি করে বোঝাই করে বরিশাল ফিরছিলেন এক গরু ব্যবসায়ী। গৌরনদীর মদিনা স্ট্যান্ডের কাছে ষাঁড়বোঝাই ট্রাকটি উল্টে পড়ে গেলে পাঁচটি ষাঁড় ঘটনাস্থলেই মারা যায়।

প্রাণিকল্যাণ আইনের প্রয়োগ নেই কেন

প্রাণিকল্যাণ আইনের ৬ নম্বর ধারায় প্রাণীর প্রতি অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোনো প্রাণীকে যদি এমনভাবে বেঁধে রাখা হয় বা এমন কাঠামোর ভেতর আবদ্ধ রাখা হয় বা বহন করা হয়, যার কারণে সংশ্লিষ্ট প্রাণী তার প্রকৃতি অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে, বসতে বা ঘুমাতে না পারে, তবে আইন অনুযায়ী এটি প্রাণীর প্রতি এক অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ (ধারা-৬.১.ঘ)।

প্রাণিকল্যাণ আইনে এই নিষ্ঠুর আচরণকে ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আইনে এই অপরাধের শাস্তি কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। আইনটির ১৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কেউ অপরাধ সংঘটিত করলে বা অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করলে তাকে অনধিক ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। প্রাণিকল্যাণ আইন অনুযায়ী এমন অপরাধ একমাত্র কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগের মাধ্যমেই আদালত বিচারার্থে গ্রহণ করবেন। মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯–এর অধীনে মোবাইল কোর্ট কর্তৃক এই অপরাধের বিচার হবে। সাম্প্রতিক ছাগলের মৃত্যুসহ ওপরে উল্লেখ করা প্রতিটি প্রাণী হত্যাই প্রাণিকল্যাণ আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু দেশব্যাপী এর কার্যকর প্রচারণা ও প্রয়োগ নেই কেন?

২০২৫ সালের এপ্রিলে মুরগির মরদেহ নিয়ে লালমনিরহাট সদর থানায় হাজির হয়েছিলেন গোকুণ্ডার রশিদা বেগম নামের এক ভূমিহীন নিম্নবর্গ। ভিক্ষা করে মুরগিগুলো তিনি কিনেছিলেন। মুরগির ডিম বিক্রি করে একটা রোজগারের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কারা যেন খাবারে বিষ দিয়ে তাঁর ১১টি মুরগি হত্যা করে। থানায় তিনি মুরগি হত্যার বিচার চাইতে গিয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্র কি রশিদার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পেরেছে? রশিদা হোক বা ছোট–বড় কোনো খামারি, মালিক বা ব্যবসায়ী—প্রাণিসম্পদের ক্ষয়ক্ষতি সব জীবনকেই নানা মাত্রায় প্রভাবিত করে।

প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধে খামারি, বিক্রেতা, ক্রেতা, ভোক্তা থেকে শুরু করে সব শ্রেণি–পেশা–বর্গের নাগরিক ঐক্য জরুরি। প্রাণিসম্পদ বিভাগ নানা মেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। অঞ্চল, পরিবহনব্যবস্থা, পথের দূরত্বকে গুরুত্ব দিয়ে প্রাণিসম্পদ পরিবহন পঞ্জিকা তৈরি করতে পারে। আশা করব, আসন্ন কোরবানির ঈদের আগেই প্রাণীদের পরিবহন নিরাপদ ও আরামদায়ক হবে।

  • পাভেল পার্থ লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী