অভিমত–বিশ্লেষণ
খাতভিত্তিক দুর্নীতি মোকাবিলার কৌশল যেমন হতে পারে
বাংলাদেশে দুর্নীতি একক কোনো ‘পাথরের খণ্ড’ নয়। এটি বহু প্রক্রিয়ার সমষ্টি। তাই সমাধানও হতে হবে খাতভিত্তিক, ধাপে ধাপে, বাস্তবতার ভিত্তিতে। ‘পাহাড়’ সরানোর কথা বলে থেমে থাকার চেয়ে ছোট ছোট ‘ঢিবি’ সরানোই হয়তো আমাদের সবচেয়ে কার্যকর পথ। বাংলাদেশে খাতভিত্তিক দুর্নীতি মোকাবিলার কৌশল নিয়ে লিখেছেন নুরুল হুদা সাকিব
বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে কথা উঠলেই আমরা কিছু বড় বড় শব্দ যেমন—‘প্রাতিষ্ঠানিক’, ‘ব্যবস্থাগত’, ‘সর্বব্যাপী’ ব্যবহার করি। এই বর্ণনাগুলো একেবারে ভুল নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, এমন ভাষা মানুষের মনে একধরনের অসহায়ত্ব তৈরি করে। যখন দুর্নীতিকে বিশাল একটি ‘পাহাড়’ হিসেবে কল্পনা করা হয়, তখন সেটি সরানোর কথা ভাবাটাও অনেকটা অসম্ভব মনে হয়।
কিন্তু যদি আমরা দুর্নীতিকে একটি ‘অচল পাহাড়’ হিসেবে না দেখে বরং অনেকগুলো ছোট ছোট ‘টিলা’ বা ‘ঢিবি’ হিসেবে দেখি—যেগুলো আলাদা আলাদা খাতে, আলাদা আলাদা প্রক্রিয়ার মধ্যে গড়ে উঠেছে, তাহলে কি বিষয়টা অন্য রকম মনে হবে? যদি আমরা এটিকে শুধু রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে না দেখে, ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবেও বিবেচনা করি, তাহলে কি চিত্রটা ভিন্ন হতে পারে?
মার্ক পায়ম্যান ও পল এম হেইউড তাঁদের বই সেকশন–বেজড অ্যাকশন এগেইনস্ট করাপশন-এ ঠিক এই কথাই বলেছেন। তাঁদের প্রস্তাব হচ্ছে, দুর্নীতি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো খাতভিত্তিকভাবে এগোনো; অর্থাৎ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভূমি, পুলিশ, অবকাঠামো—প্রতিটি খাতে আলাদা করে দুর্নীতির ঝুঁকি চিহ্নিত করা, অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা এবং বাস্তবসম্মত সমাধান নেওয়া।
মার্ক পায়ম্যান ও পল এম হেইউড এই পদ্ধতিকে বলেছেন ‘সেরা’ (এসইআরএ)। এটি চারটি ধাপের সংক্ষিপ্ত রূপ:
১. এস—সেক্টর (খাত নির্বাচন)
২. ই—এক্সপোজার (ঝুঁকি উন্মোচন)
৩.আর—রেসপন্স (প্রতিকার পরিকল্পনা) এবং
৪. এ—অ্যাকশন (বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন)
বাংলাদেশে এই ‘সেরা’ পদ্ধতিটি আদৌ প্রাসঙ্গিক কি না, তা এই নিবন্ধে আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছে।
দুর্নীতি যেখানে ঘটে: দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশে দুর্নীতি কোনো বিমূর্ত সূচক নয়; এটি নাগরিকের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। সরকারি হাসপাতালে বেড পেতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়, ভূমি অফিসে নামজারি আটকে থাকে, ঠিকাদারি কাজে অস্বচ্ছতা থাকে, থানায় অভিযোগ নিতে গড়িমসি হয়—এই সবই দুর্নীতির বাস্তব রূপ।
বিভিন্ন খাতে সাধারণ জনগণের নানাবিধ অভিজ্ঞতা রয়েছে। খুব কমসংখ্যক জনগণই দুর্নীতি ছাড়া সেবা পেয়েছে বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের দায়িত্ব মূলত দেওয়া হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনকে।
► দুর্নীতি যে জায়গায় ঘটে, সেটি হচ্ছে নির্দিষ্ট খাতের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার ভেতরে, যা কিনা বাইরের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এর প্রকৃত সমস্যা অতিদ্রুত সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়ে। ► বাংলাদেশে অনেক সময় আমরা দুর্নীতির ফলাফল নিয়ে কথা বলি, কিন্তু প্রক্রিয়ার দুর্বলতা বিশ্লেষণ করি না। এক্সপোজার ধাপটি সেই বিশ্লেষণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। ► দুর্নীতি শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়; এটি ব্যবস্থাপনার ইস্যুও। যেমন নিরাপত্তাঝুঁকি, আর্থিক ঝুঁকি বা পরিবেশ ঝুঁকি পরিচালনা করা হয়, তেমনি দুর্নীতির ঝুঁকিও পরিচালনা করতে হবে।
ইতিমধ্যে মামলার ভারে জরাজীর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে পুরো দেশের সব খাতের সমস্যা একসঙ্গে সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ, দুর্নীতি যে জায়গায় ঘটে, সেটি হচ্ছে নির্দিষ্ট খাতের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার ভেতরে, যা কিনা বাইরের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এর প্রকৃত সমস্যা অতিদ্রুত সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা সেক্টরে দুর্নীতি উদ্ঘাটনের ক্ষেত্রে প্রশ্নগুলো হওয়া উচিত এমন; স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির প্রকৃতি কী? ভূমি প্রশাসনে কোথায় ফাঁক? অবকাঠামো নির্মাণে কোন ধাপে অনিয়মের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?
এই খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকেই শুরু হতে পারে কার্যকর সংস্কার।
‘সেরা’ কী?
‘সেরা’ হলো দুর্নীতি মোকাবিলার একটি খাতভিত্তিক (সেক্টর–বেজড) বাস্তবধর্মী কাঠামো। এটি দুর্নীতিকে একটি বিমূর্ত, সার্বিক সমস্যা হিসেবে না দেখে নির্দিষ্ট খাতের নির্দিষ্ট ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে সমাধান করার পদ্ধতি।
সেক্টর (খাত নির্বাচন): প্রথম ধাপে একটি নির্দিষ্ট খাত নির্বাচন করা হয়—যেমন স্বাস্থ্য, ভূমি, শিক্ষা, পুলিশ বা অবকাঠামো। উদ্দেশ্য হলো দুর্নীতির সমস্যা সীমাবদ্ধ ও স্পষ্ট করা। ‘দেশে দুর্নীতি আছে’ বলা সহজ, কিন্তু ‘স্বাস্থ্য খাতে ওষুধ ক্রয়ে ঝুঁকি আছে’—এভাবে বললে সমস্যাটি নির্দিষ্ট ও বিশ্লেষণযোগ্য হয়।
বাংলাদেশে উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক ভূমি প্রশাসন। এখানে নাগরিকের অভিজ্ঞতা বেশ নেতিবাচক। নামজারিতে বিলম্ব, রেকর্ড সংশোধনে অনিয়ম, দালাল চক্রের প্রভাব—এসব সমস্যা সুপরিচিত।
খাত নির্ধারণ মানে সমস্যাকে একটি সীমাবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে আনা। এতে তিনটি সুবিধা হয়—দায়বদ্ধতা স্পষ্ট হয় (কোন মন্ত্রণালয়/দপ্তর দায়িত্বে), তথ্য সংগ্রহ সহজ হয় ও বাস্তবসম্মত সমাধান নির্ধারণ করা যায়।
এক্সপোজার (ঝুঁকি উন্মোচন): এই ধাপে নির্বাচিত খাতের ভেতরে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়। এখানে প্রশ্ন করা হয়: দুর্নীতি কোন প্রক্রিয়ায় ঘটছে? কোথায় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল? কোন ধাপে স্বচ্ছতা কম? কারা উপকৃত হচ্ছে?
উদাহরণ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের কথা ধরা যাক। স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সাধারণ অভিযোগ হলো—‘হাসপাতালে দুর্নীতি হয়।’ কিন্তু ‘সেরা’ জিজ্ঞেস করবে—ওষুধ ক্রয়ে কি অতিমূল্য নির্ধারণ হচ্ছে? যন্ত্রপাতি ক্রয়ে কি দরপত্রে কারসাজি হয়েছে? চিকিৎসকের অনুপস্থিতির কারণে কি সেবা ব্যাহত হয়েছে? অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন কি রোগীর প্রবেশাধিকার সীমিত করছে?
এই ধাপে তথ্য, পর্যালোচনা বৈঠক, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনে নাগরিক প্রতিক্রিয়া নেওয়া হয়। লক্ষ্য হলো—দুর্নীতির প্রকৃত দুর্বল জায়গা (ভালনারেবিলিটিস) চিহ্নিত করা।
বাংলাদেশে অনেক সময় আমরা দুর্নীতির ফলাফল নিয়ে কথা বলি, কিন্তু প্রক্রিয়ার দুর্বলতা বিশ্লেষণ করি না। এক্সপোজার ধাপটি সেই বিশ্লেষণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
রেসপন্স (প্রতিকার পরিকল্পনা): ঝুঁকি চিহ্নিত হওয়ার পর সেই ঝুঁকি কমাতে বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরি করা হয়। উদাহরণ: ই-প্রকিউরমেন্ট চালু করা, সময়সীমা নির্ধারণ, স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া, ডিজিটাল নজরদারি। এখানে লক্ষ্য ‘দুর্নীতি সম্পূর্ণ নির্মূল’ ঘোষণা করা নয়; বরং নির্দিষ্ট ঝুঁকি কমানো।
ধরা যাক, অবকাঠামো খাতে সমস্যা হলো দরপত্রের আগেই ব্যয় বাড়িয়ে ধরা। তাহলে প্রতিকার হতে পারে, স্বাধীন কারিগরি পর্যালোচনা বোর্ড, আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে তুলনা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকাশ, নকশা, দরপত্র ও তদারকি আলাদা রাখা। এগুলো কাঠামোগত পরিবর্তন, কিন্তু মৌলিক পরিবর্তন নয়।
একইভাবে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন কমাতে ডিজিটাল অভিযোগ নিবন্ধন, অভিযোগকারীর মোবাইলে স্বয়ংক্রিয় নিশ্চিতকরণ, এলোমেলো তদারকি বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছ মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। রেসপন্স ধাপটি ব্যবহার করে এটা করা যেতে পারে। কারণ, ধাপটি প্রমাণভিত্তিক ও ব্যবস্থাপনামূলক।
অ্যাকশন (বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন): সবশেষ ধাপে পরিকল্পনাকে বাস্তবে কার্যকর করা হয়। এখানে প্রয়োজন নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, সময়সীমা, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল মূল্যায়ন। অর্থাৎ নীতিপত্র নয়, বাস্তব প্রয়োগই মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশে সংস্কারের বড় দুর্বলতা হলো—নীতিপত্র থাকে, বাস্তবায়ন হয় না। ‘সেরা’-এর শেষ ধাপ তাই সবচেয়ে কঠিন—অ্যাকশন। এখানে প্রয়োজন নির্দিষ্ট সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল মূল্যায়ন।
উদাহরণ হিসেবে ভূমি প্রশাসনে যদি নামজারি আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তাহলে একটি অনলাইন ড্যাশবোর্ডে কত আবেদন সময়মতো নিষ্পত্তি হয়েছে তা প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে জবাবদিহি তৈরি হয়।
অ্যাকশন মানে শুধু উদ্যোগ নয়; ধারাবাহিক অনুসরণ করা। এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করলে দুর্নীতি দমন আরও সহজে বাস্তবায়নযোগ্য করা যায়।
‘সেরা’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
‘সেরা’ দুর্নীতিকে রাজনৈতিক স্লোগানের বিষয় না বানিয়ে, ব্যবস্থাপনার একটি ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে। এটি বলার চেষ্টা করে যে দুর্নীতি একটি বিশাল পাহাড় নয়; বরং অনেকগুলো ছোট ছোট প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমষ্টি। তাই একসঙ্গে পুরো ব্যবস্থা বদলানোর চেষ্টা না করে খাতভিত্তিক ঝুঁকি কমানোর মাধ্যমে ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সংক্ষেপে, ‘সেরা’ হলো বাস্তবসম্মত, ধাপে ধাপে, খাতভিত্তিক দুর্নীতি মোকাবিলার একটি কাঠামো। খাতভিত্তিক পদ্ধতির বড় শিক্ষা হলো—দুর্নীতি শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়; এটি ব্যবস্থাপনার ইস্যুও। যেমন নিরাপত্তাঝুঁকি, আর্থিক ঝুঁকি বা পরিবেশ ঝুঁকি পরিচালনা করা হয়, তেমনি দুর্নীতির ঝুঁকিও পরিচালনা করতে হবে।
প্রশিক্ষণ, নজরদারি, তথ্য প্রকাশ, জবাবদিহি—এসব প্রতিটি খাতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। এতে দুর্নীতি মোকাবিলা বাহ্যিক চাপ নয়, অভ্যন্তরীণ পেশাগত দায়িত্বে পরিণত হবে।
বাস্তবসম্মত পথ
এই পদ্ধতি কোনো এক দিনে ‘দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেয় না; এটি বলে—যেখানে হাত বাড়ানো সম্ভব, সেখান থেকেই শুরু করা হোক। প্রতিটি মন্ত্রণালয় যদি দুই বছর পরপর নিজ নিজ খাতে দুর্নীতির শীর্ষ পাঁচ ঝুঁকি চিহ্নিত করে, অগ্রাধিকার ঠিক করে এবং বাস্তবসম্মত সংস্কার বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়—তাহলে ছোট ছোট পরিবর্তন জমে বড় রূপ নেবে।
বাংলাদেশে দুর্নীতি একক কোনো ‘পাথরের খণ্ড’ নয়। এটি বহু প্রক্রিয়ার সমষ্টি। তাই সমাধানও হতে হবে খাতভিত্তিক, ধাপে ধাপে, বাস্তবতার ভিত্তিতে। ‘পাহাড়’ সরানোর কথা বলে থেমে থাকার চেয়ে ছোট ছোট ‘ঢিবি’ সরানোই হয়তো আমাদের সবচেয়ে কার্যকর পথ।
● নুরুল হুদা সাকিব সভাপতি ও অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
*মতামত লেখকের নিজস্ব