মতামত
গণ-অভ্যুত্থানের ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’ এবং জুলাইয়ের না-বলা গল্প
জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের গাঠনিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে নানা আলোচনা দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের একটি ন্যায্য আন্দোলন কীভাবে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গণ–অভ্যুত্থান হয়ে উঠল? জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে আমরা কীভাবে দেখব? রাজনৈতিক সাহিত্যের আয়নায় এর পর্যালোচনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন সহুল আহমদ
২০২৪ সালে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও ব্যাপক নাগরিক প্রাণহানির প্রতিক্রিয়ায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত কায়দায় রাজপথে নেমে এসেছিল। সাধারণত যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের গল্প ধীরে ধীরে আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ও সাংগঠনিক অংশের তৎপরতার গল্পের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে পাঠ করতে না পারলে অভ্যুত্থানও অধরা রয়ে যায়।
স্বতঃস্ফূর্ততার কথা বললে ভুল-বোঝাবুঝিও তৈরি হয়। প্রশ্ন ওঠে, তবে কি লোকজন আচানক মাঠে নেমে পড়েছে? জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও রাজনৈতিক তৎপরতাকে কি লঘু করে দেওয়া হয়? ফলে বোঝা দরকার, জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত কায়দায় রাজপথে নেমেছে বলতে আসলে কী বোঝানো হয়।
দুই.
রাজনৈতিক সাহিত্যে ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’ [স্পন্টেইনিটি] বহুল আলোচিত বিষয়। মার্ক্সবাদী সিলসিলায় ভ্লাদিমির লেনিন ও রোজা লুক্সেমবার্গের মধ্যে তুমুল বাহাসের নজির আছে। লেনিন যেখানে আন্দোলনে পার্টির কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বের কথা বলেছিলেন, সেখানে রোজা পার্টির গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার পক্ষে কথা বলেছিলেন। পার্টির কেন্দ্রিকতা বনাম জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার এই তর্কের দীর্ঘ ইতিহাস আছে।
অন্যদিকে অ্যানার্কিস্ট বা অরাজপন্থীরা স্বতঃস্ফূর্ততাকে উদ্যাপন করেন। তাঁদের কাছে স্বতঃস্ফূর্ততা সত্যিকারের বিপ্লব তথা তাঁদের রাষ্ট্রকল্পনার জন্য অপরিহার্য। উপায় ও উদ্দেশ্যের সংগতি স্থাপনের আলামত হিসেবে স্বতঃস্ফূর্ততাকে তাঁরা পাঠ করেন। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিন্তায় ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’র ভূমিকা নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়েছে। যাঁরাই করেছেন, তাঁদের প্রায় সবাই এটাকে নেতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
বিশ্বজুড়ে ষাট-সত্তর দশক পর্যন্ত ধরেই নেওয়া হতো যে বড় ও শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়া গণ-আন্দোলন সম্ভব নয়। কিন্তু নব্বইয়ের পর পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি এই ধারণা ধীরে ধীরে পাল্টে দেয়। বিপ্লব বা গণ-আন্দোলনের কাঠামোও বদলে যেতে থাকে। নব্বই দশকে মেক্সিকোর চিয়াপাসের জাপাতিস্তা আন্দোলন এবং অতি সাম্প্রতিক আরব বসন্ত বা অকুপাই ওয়াল স্ট্রিটের মতো আন্দোলনের পর স্বতঃস্ফূর্ততার ইস্যু প্রবলভাবে রাজনৈতিক সাহিত্যে ফিরে এসেছে।
তিন.
রাজনৈতিক সাহিত্যে যখন স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে আলোচনা করা হয়, তখন আসলে এমন কিছু বোঝানো হয় না যে এটা আচানক নাজিল হয়েছে; বরং প্রথাগত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের বাইরে গিয়ে এবং প্রথাগত সাংগঠনিক কাঠামোকে এড়িয়ে যখন একধরনের অনুভূমিক আন্দোলন গড়ে ওঠে, তখন সেই অংশগ্রহণকে স্বতঃস্ফূর্ত বলা হয়ে থাকে। কাঠামোগত দিক থেকে এটাকে কীভাবে বোঝা যেতে পারে?
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততার এই কাঠামোকে তিনভাবে বোঝা যেতে পারে বলে মনে করি। প্রথমত, স্বতঃস্ফূর্ততা মানে প্রস্তুতি বা তৎপরতার বিপরীত কিছু নয়। বড় বড় রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের ব্যানারের বাইরে থেকে যাঁরা আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন, যাঁদের যুক্ত হওয়াটাকে এখানে ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ বলা হচ্ছে, তাঁদেরও আসলে একধরনের প্রস্তুতি তৈরি হয়েছে বিভিন্ন অতীত অভিজ্ঞতা ও কর্মতৎপরতার মাধ্যমে।
আন্দোলনকারীদের স্মৃতিচারণা বা সাক্ষাৎকারগুলো খেয়াল করলে দেখা যায়, তাঁরা ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনসহ আওয়ামী রেজিমের সময় বিভিন্ন ধরনের আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই নো-ভ্যাট আন্দোলনের সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের আন্দোলন বা ২০২১ সালের মোদি-বিরোধী আন্দোলনের সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে যাঁরা নানাবিধ ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দিয়ে অভ্যুত্থানকে ব্যাখ্যা করতে চান, তাঁরা আসলে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততাকে অস্বীকার করতে চান। অন্যদিকে যাঁরা কেবল সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে অভ্যুত্থানকে বুঝতে চান, তাঁরাও ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় জনগণের অংশগ্রহণের বিচিত্রতা ও ব্যাপকতাকে আড়াল করে ফেলেন।
অর্থাৎ জুলাই মাসে যে আন্দোলনকারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসছেন, সেটাও পুরোপুরি আচানক বা প্রস্তুতিহীন নয়, বরং নানাবিধ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাঁদের গড়ে তুলেছিল। আন্দোলনের ভাষা, গঠন ও কাঠামো দেখলে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মিলও চোখে পড়ার মতো।
দ্বিতীয়ত, স্বতঃস্ফূর্ততাকে বুঝতে হয় সিদ্ধান্ত প্রণয়নের কেন্দ্রিকতার বিপরীতে। জুলাই মাসে যখন আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে, এর কোনো কেন্দ্রীয় কাঠামো খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো কোনো একটা কর্মসূচি কেন্দ্র থেকে জানানো হচ্ছে, কিন্তু একেক এলাকার কর্মসূচি সেখানকার স্থানীয়রাই ঠিক করতেন। কোথায় হবে, কীভাবে হবে, স্থানীয় শরিকদের সঙ্গে আন্দোলনকারীরা আলাপ করে নির্ধারণ করতেন।
যখন আন্দোলন তুঙ্গে, তখনো কেন্দ্রের নেতা বা শেষের দিকে যাঁরা নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন, তাঁদের সম্পর্কে বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকার আন্দোলনকারীরা প্রায় বেখবর ছিলেন। উল্লেখ্য, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যে গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল, সেখানেও নেতাদের ছবি পাওয়া যায় না। শহীদ-স্মরণই ছিল অন্যতম প্রধান নিশানা। দল ও নেতার চেয়ে কর্মসূচিই ছিল গ্রাফিতির অন্যতম উপাদান আন্দোলনের এমন আনুভূমিক কাঠামো এই স্বতঃস্ফূর্ততারই স্মারক।
শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের নজির আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে অভ্যুত্থান-পরবর্তী তিন দিন/রাতে। আক্ষরিক অর্থে একধরনের রাষ্ট্রহীন অবস্থা তখন। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সহিংসতা মোকাবিলায় বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীরা যে সক্রিয়তা দেখিয়েছিলেন, সেটার কোনো কেন্দ্রিকতা ছিল না, এর কোনো কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ছিল না, বরং এটা ছিল পুরোপুরি অনুভূমিক।
এই যে দুটো দিক বলা হলো, তা সরাসরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আন্দোলনকারীদের যত স্মৃতিচারণামূলক সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে, তাতে এই দুই দাবির পক্ষে অজস্র প্রমাণ পাওয়া যায়।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সাক্ষাৎকার বা স্মৃতিচারণাগুলো আদতে আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী (প্রটেস্টার) এবং ভুক্তভোগীদের। তাঁদের স্মৃতি ও ভাষ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ইতিহাসের জন্য জরুরি বটে, কিন্তু কেবল তাঁদের অংশগ্রহণ দিয়ে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ব্যাপারটাকে পুরোপুরি বোঝা যাবে না।
ফলে তৃতীয় বিষয়টা হচ্ছে, সক্রিয় আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি যাঁরা সাধারণত নীরব দর্শক হয়ে থাকেন, তাঁদের অংশগ্রহণকেও আমলে নিতে হয়। তাঁদের অংশগ্রহণ ব্যতীত কোনো সমাবেশই বৈপ্লবিক চেহারা ধারণ করতে পারে না।
সমাজের অধিকাংশই মূলত নীরব দর্শক। মনে হতে পারে কোনো কিছুতে সরাসরি অংশগ্রহণ না করে কেবল ঘটনা বা পরিস্থিতিকে অবলোকন করছেন বা প্রাত্যহিক জীবন যাপন করছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এই নীরব দর্শকদের আমরা সরব হয়ে উঠতে দেখেছি। আন্দোলনকারীরা যদি হয়ে থাকেন ‘অ্যাকটিভ বা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী’, তাহলে তাঁরা হচ্ছেন ‘প্যাসিভ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণকারী’।
দেখা গেছে, আন্দোলনকারী কেউ দোকানে পানি আনতে গেছেন, সেই দোকানদার বিনা মূল্যে পানির বোতল দিয়েছেন। রিকশাচালক আন্দোলনকারীকে এগিয়ে দিয়ে এসেছেন, বিনিময়ে টাকা দেননি। টং দোকানদার বলে দিয়েছেন কোন দিকে পুলিশ আছে, কোন দিকে যেতে হবে। বাসার ভেতর থেকে মিছিলকারীদের উদ্দেশে টুথপেস্ট ছুড়ে দিয়েছেন অনেকে, যেন কাঁদানে গ্যাসের শেলের প্রভাব থেকে রেহাই পাওয়া যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বহু ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল, যেখানে বাসার ভেতর থেকে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে পানির বোতল বিলাতে দেখা যাচ্ছিল। আবার এক ভিডিওতে সিলেটের একজন নারীকে দেখা যায়: পুলিশ আন্দোলনকারীদের খুঁজতে তাঁদের বাড়িতে হানা দিয়েছে, তিনি তুমুল তর্ক জুড়ে দিয়েছেন পুলিশের সঙ্গে।
অর্থাৎ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততাকে কেবল সক্রিয় আন্দোলনকারীদের অংশগ্রহণ দিয়ে বোঝা যায় না, বরং এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে নীরব দর্শকদের অংশগ্রহণের ব্যাপকতার মধ্য দিয়ে।
চার.
আন্দোলনের যে স্বতঃস্ফূর্ততা ও অনুভূমিক বৈশিষ্ট্যের কথা এখানে বলা হয়েছে, সেটা সাম্প্রতিক বৈশ্বিক প্রবণতাও বটে। অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলন, আরব বসন্ত, চিলি, সুদান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপালের অভ্যুত্থান—সবখানেই এই প্রবণতা স্পষ্ট।
আন্দোলনের গড়ন ও কাঠামোর দিক থেকে বিবেচনা করলে এটা বিশের দশক বা ষাট-সত্তর দশকের বিপ্লবের চেয়ে পুরোদস্তুর ভিন্নতর। এখানে জনগণের অংশগ্রহণ ঘটছে আরও বিরাট আকারে, কিন্তু পূর্বের চেনা ছকে নয়। আগে রাজনৈতিক দলের যে ভূমিকা থাকত, বা যে কল্পনা থাকত, সেটা আমূল পাল্টে গেছে।
সাম্প্রতিক এই প্রবণতা নিয়ে বেশ কিছু মতামত রয়েছে। কোনো মত অনুযায়ী, এটা আসলে রাজনৈতিক দলের প্রতি সামগ্রিকভাবে অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। খোদ ‘রাজনৈতিকতা’ বলতে যা বোঝানো হতো, সেটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে এই প্রবণতা। বলা হচ্ছে, জনগণের মধ্যে ‘আসল গণতন্ত্রে’র প্রতি যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, এটা তারই প্রতিফলন।
অন্য মত অনুযায়ী, নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থার অধীনে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন সক্রিয় থাকতে পারে না। কেননা স্বৈরতান্ত্রিক ও দমনমূলক শাসনব্যবস্থা নানা কায়দায় প্রতিপক্ষ বা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দুমড়েমুচড়ে ফেলে। ফলে এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের বাইরে প্রচুর স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম বা সংগঠন ও অপ্রাতিষ্ঠানিক বন্ধন হয়ে ওঠে রাজনৈতিক চর্চার লীলাক্ষেত্র।
আরব বসন্ত নিয়ে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁরাও দেখিয়েছেন, এই সম্পর্কগুলোর এমন বহিঃপ্রকাশ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে থাকে। এটাকে কেউ বলছেন, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় উৎপাদিত বিরাজনীতিকীকরণের ফলাফল হচ্ছে এই ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা।
ফলে এটাও অবাক হওয়ার বিষয় নয় যে আওয়ামী লীগ আমলে বড় সমাবেশ ঘটেছে তার সবই আসলে বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের ব্যানারের বাইরে থেকে। নো ভ্যাট আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলনসহ এসব আন্দোলনে সমাজের যে বিরাট অংশ যোগ দিচ্ছে, তাঁরা এমন কোনো দলের নেতা নন, বা বড় সংগঠনের মতো তাঁদের এমন কোনো কাঠামো নেই। বরং নানাবিধ যোগাযোগের সূত্রে বিভিন্নজনের সঙ্গে একধরনের শিথিল সম্পর্কের বদৌলতে একটা সম্পর্ক–জাল গড়ে উঠেছিল। অভ্যুত্থানের পর বহুজন নিজেদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য বলে চিহ্নিত করলেও, অভ্যুত্থান চলাকালে বরং সবাই যুক্ত হয়েছিলেন নানাবিধ সম্পর্কের বরাতেই।
পাঁচ.
অনেকেই ভাবতে পারেন, স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা করলে নেতৃস্থানীয়দের ভূমিকা ও সিদ্ধান্তগুলোর কৃতিত্ব খাটো করা হয়। নিঃসন্দেহে এগুলো ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু কেবল নেতৃস্থানীয় ও সংগঠিত সাংগঠনিক অংশের ভূমিকা ও কর্মতৎপরতা দিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মতো ঘটনাকে বোঝা প্রায় অসম্ভব।
বাংলাদেশে যেকোনো ঘটনার ইতিহাসচর্চা সাধারণত পরিণত হয় নেতৃস্থানীয়দের ক্ষমতার টানাপোড়েন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাহাসের গল্পে। জনগণের অংশগ্রহণের স্বতঃস্ফূর্ততা, বিচিত্রতা ও ব্যাপকতার চেয়ে নেতাদের ভাষণই ইতিহাসের বাঁকবদলের চিহ্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এখনো যখন ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা ‘ নেপথ্য নায়ক’ নিয়ে জনপ্রিয় পরিসরে আলোচনা হয়, তখন স্পষ্টত টের পাওয়া যায়, আমরা ‘ঘটনা’কে পাঠ করছি আমাদের পূর্বের মনোভঙ্গি দিয়ে।
স্বতঃস্ফূর্ততার এই প্রবণতা আমাদের রাজনৈতিক পরিসরকেও নতুনভাবে পাঠ করতে উদ্বুদ্ধ করছে। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে একটা স্ববিরোধ ধরা পড়ে। যে স্বতঃস্ফূর্ততার কারণে বর্তমান সময়ের আন্দোলনগুলো রাজপথে অপ্রতিরোধ্য গতি পায়, ঠিক সেই কারণেই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অর্জন ধরে রাখা কঠিন হয় এবং ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে যাঁরা নানাবিধ ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দিয়ে অভ্যুত্থানকে ব্যাখ্যা করতে চান, তাঁরা আসলে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততাকে অস্বীকার করতে চান। অন্যদিকে যাঁরা কেবল সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে অভ্যুত্থানকে বুঝতে চান, তাঁরাও ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় জনগণের অংশগ্রহণের বিচিত্রতা ও ব্যাপকতাকে আড়াল করে ফেলেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেও ভালোভাবে বোঝার জন্য আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি জনগণের বিচিত্র কায়দায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণের ইতিহাসও তুলে আনতে হবে। এখন পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের ভাষ্য উঠে এলেও, এই ‘নীরব দর্শক’দের সক্রিয়তা এখনো অনালোচিতই থেকে গেছে।
● সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
