তাপপ্রবাহের সংজ্ঞা কী

কোনো স্থানের ভূপৃষ্ঠের উপরিস্থ (সাধারণ ভূমি থেকে ২ মিটার উচ্চতায়) বায়ুর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা (সাধারণত রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা) কমপক্ষে পরপর দিন দিন ওই স্থানের বছরের ওই একই সময়ের বায়ুর সর্বনিম্ন তাপমাত্রার শীর্ষস্থানীয় ১৫ শতাংশ তাপমাত্রার মধ্যে পড়ে, তবে তাপমাত্রার সেই অবস্থাকে তাপপ্রবাহ বলে গণ্য করা হয়। তাপপ্রবাহের সংজ্ঞা নির্ধারণে রাতের তাপমাত্রাকে বেছে নেওয়ার কারণ হলো গ্রীষ্মকালে রাতে মানুষ যখন ঘুমায়, তখন শরীর তাপ ত্যাগ করে শীতল হয় এবং মানবদেহ পরবর্তী দিনের কাজের জন্য শক্তি সঞ্চয় করে। তাপপ্রবাহের সময় যেহেতু রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিক সময়ের তাপমাত্রা অপেক্ষা অনেক বেশি থাকে, তাই মানবদেহ তাপ ত্যাগ করে যথেষ্ট পরিমাণে শীতল হতে পারে না; পারলেও মানুষের হৃৎপিণ্ডকে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয় শরীর হতে তাপ বের করে দিতে। ওই একই কথা প্রযোজ্য দিনের বেলাতেও। তাপপ্রবাহের সময় যেহেতু বায়ুর তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে তাই মানুষের শরীর থেকে তাপ বের করে দিতে মানুষের হৃৎপিণ্ডকে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। কোনো কোনো সময় মানুষের হিট স্ট্রোক হয়ে যায় অতিরিক্ত গরমের কারণে।

তাপপ্রবাহ কীভাবে সৃষ্টি হলো

উত্তর গোলার্ধে বিষুবরেখা থেকে প্রায় ২৫ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে বায়ু প্রবাহিত হয়ে থাকে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে। পক্ষান্তরে ৩০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৬০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে বায়ু প্রবাহিত হয়ে থাকে পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে। ৩০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৬০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে (এই স্থানকে আবহাওয়াবিজ্ঞানের ভাষায় এক্সট্রা-ট্রপিক্যাল স্থান বলা হয়ে থাকে) ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার উচ্চতায় জেট স্ট্রিম (জেট তরঙ্গ) নামক বায়ু প্রবাহিত হতো। জেট স্ট্রিম সাধারণত স্থানভেদে ঘণ্টায় ২০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার বেগে প্রবাহিত হয় এ কারণে এ বায়ুকে জেট স্ট্রিম (যুদ্ধ বিমানের) নামে অভিহিত করা হয়। এই জেট স্ট্রিমের মাধ্যমেই মেরু থেকে ঠান্ডা বাতাস দক্ষিণ দিকে ক্রান্তীয় রেখার দিকে ও ক্রান্তীয় রেখা থেকে অপেক্ষাকৃত গরম বাতাস মেরুর দিকে নিয়ে পৃথিবীর তাপমাত্রার সাম্য অবস্থা নিশ্চিত করে।

আমরা প্রাইমারি স্কুলেই শিখেছি শক্তি ও ভরের নিত্যতার সূত্র। পৃথিবীর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে শক্তি (তাপ) ও ভর (জলীয় বাষ্প) প্রবাহিত হয় বায়ুমণ্ডলীয় তরঙ্গের (ঢেউ) মাধ্যমে। একটি পূর্ণাঙ্গ তরঙ্গ (ঢেউ) একটি তরঙ্গ শীর্ষ (ঊর্ধ্ব অংশ) ও তরঙ্গ পাদ (নিম্ন অংশ) নিয়ে গঠিত। ওপরে উল্লেখিত জেট তরঙ্গ সাপের চালার মতো আঁকাবাঁকাভাবে চলে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়। চলার পথে এই জেট তরঙ্গের শীর্ষ যদি অনেক বেশি উত্তর মেরুর দিকে অগ্রসর হয় ও কোনো স্থানে দীর্ঘ সময় ধরে থেমে থাকে, তবে জেট তরঙ্গের দক্ষিণ দিকের আকাশে বায়ুর নিম্নচাপ এবং ওই স্থানের আকাশের ঠিক নিচে অবস্থিত ভূমিতে বায়ুর উচ্চচাপ অবস্থা বিরাজ করে।

বাংলাদেশ ও ভারতের ওপর চলমান তাপপ্রবাহের ওপর জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক বৈজ্ঞানিকদের ৯০ শতাংশের বেশি একমত হয়েছেন যে তাপপ্রবাহের ওপর জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ পেয়েছেন যে আজ থেকে ৩০ বছর আগে পৃথিবীর কোনো স্থানের ওপর দিয়ে প্রতিবছর গ্রীষ্মকাল ঠিক যতটি তাপপ্রবাহ বয়ে যেত, তা অপেক্ষা অনেক বেশিসংখ্যক তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে।

আমরা টেলিভিশনে অনেক সময় শুনে থাকি বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছে, যা ঘূর্ণিঝড় আকারে উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানতে পারে। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়া মানেই মেঘের সৃষ্টি হওয়া এবং ব্যাপক পরিমাণ বৃষ্টি হওয়া। নিম্নচাপের ঠিক বিপরীত অবস্থা ঘটে যখন কোনো স্থানে বায়ুর উচ্চচাপ অবস্থা বিরাজ করে। অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠে বায়ুর উচ্চচাপ মেঘ সৃষ্টিতে বাধা দেয়। ওপরে উল্লেখিত প্রাকৃতিক নিয়মে বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর ওপর বায়ুর উচ্চচাপ সৃষ্টি হলেও দুর্ভাগ্যক্রমে সেই উচ্চচাপ প্রকৃতির ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে আটকা পড়ে একই স্থানে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে অবস্থান করে বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের তাপপ্রবাহ অবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়ে অসহ্য পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

উচ্চ আকাশে যখন নিম্নচাপ অবস্থা বিরাজ করে, তখন উচ্চ আকাশের শুষ্ক ও ভারী বায়ু নিচে পড়তে থাকে ভূপৃষ্ঠের ওপর। আমরা জানি, ভূপৃষ্ঠের দিকে সর্বোচ্চসংখ্যক বায়ুকণা থাকে (যে কারণে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি স্থানে বায়ুচাপ বেশি থাকে)। উচ্চ আকাশ থেকে যখন নতুন করে বায়ুকণা নিচে পড়তে থাকে, প্রতিনিয়ত তখন ভূপৃষ্ঠে স্বাভাবিক সময় অপেক্ষা অনেক বেশি বায়ুকণা কাছাকাছি অবস্থান করতে বাধ্য হয় এবং তাদের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়ে যায়। এই ঘর্ষণের ফলে তাপের উৎপন্ন হয় (দুই হাতের তালু ঘর্ষণ করলে যেমন করে হাত গরম হয়) এবং ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে ও তাপপ্রবাহ অবস্থার অবনতি ঘটাতে থাকে।

default-image

গ্রীষ্মকালে রাত অপেক্ষা দিন বড়। ফলে দিনের বেলা সূর্য থেকে যে পরিমাণ তাপ পৃথিবীতে আসে, তা অপেক্ষা রাতের বেলা অনেক কম তাপ আবারও মহাশূন্যে ফেরত যায়। জেট তরঙ্গের শীর্ষ যখন কোনো স্থানের আকাশে অবস্থান করে, তখন সেই স্থানের আকাশ ভেদ করে দিনের বেলা সূর্য থেকে আগত শক্তির পুরোটা আবারও মহাশূন্যে ফেরত যেতে পারে না। ফলে ভূপৃষ্ঠসংলগ্ন বায়ুর তাপমাত্রা বেড়ে যায়।

আরও সহজভাবে বোঝাতে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উচ্চ আকাশে নিম্নচাপ ও ভূপৃষ্ঠের ওপরে উচ্চচাপ অবস্থার মধ্যবর্তী বায়ুমণ্ডলকে তুলনা করা যেতে পারে রান্নার প্রেশার কুকারের মধ্যকার বায়ুর সঙ্গে। প্রেশার কুকারে ঢাকনা বন্ধ করে চুলা চালু করলে যেমন করে প্রেশার কুকারের মধ্যকার তাপ বাড়তে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রেশার কুকারের ওপরে অবস্থিত পিনটি আলগা করা হয় গরম বাতাস বের করে দেওয়ার জন্য, কিংবা রান্না শেষে প্রেশার কুকারের ঢাকনাটি খুলে দেওয়া হয় তাপ বের করে দেওয়ার জন্য। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক রাজ্যের আকাশের বায়ুর তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়া শুরু করে জুলাই মাসের ৫ তারিখের পর থেকে এখন পর্যন্ত পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে আজ (১৮ জুলাই) থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের আকাশে সৃষ্ট প্রাকৃতিক প্রেশার কুকারটির ঢাকনা খুলে গিয়ে তাপমাত্রা কমতে শুরু করার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

৫ জুলাই থেকে ১৭ তারিখ পর্যন্ত সিলেট বিভাগ ছাড়া বাংলাদেশের বেশির ভাগ জেলা বৃষ্টিমুক্ত থাকার আর একটি কারণ হলো দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে বায়ু প্রবাহিত হওয়া। ৩০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৬০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া জেট তরঙ্গ প্রায় ৫ ডিগ্রি উত্তর দিকে সরে গিয়েছে, যা স্থান দখল করেছে বিষুবরেখা থেকে প্রায় ২৫ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হওয়া বায়ু। জুলাই মাসে সাধারণ বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্পযুক্ত বায়ু দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে মেঘালয় পর্ব ও হিমালয় পর্বতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আকাশে উড়ে গিয়ে মেঘের সৃষ্টি করে, যে মেঘ থেকে বৃষ্টি হয় বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতে। ৫ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত বায়ু প্রবাহিত হচ্ছিল পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে যে বায়ুপ্রবাহ বঙ্গোপসাগর থেকে আগত জলীয় বাষ্পকে মেঘালয় পর্বত ও উত্তর-পূর্ব ভারতের হিমালয় পর্বতের পাদদেশে যেতে বাধা প্রদান করছিল এবং জলীয় বাষ্পকে পশ্চিম ভারতের দিকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, যার কারণে গত দুই সপ্তাহ পশ্চিম ভারতে ব্যাপক পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে।

তাপপ্রবাহের ওপর মানুষের কোনো প্রভাব আছে কি?

উত্তরটি হলো, প্রভাব রয়েছে। কোনো স্থানে তাপপ্রবাহের সৃষ্টি প্রাকৃতিক নিয়মে শুরু হলেও তাপপ্রবাহের তীব্রতা কম বা বেশি হওয়ার ওপর সেই স্থানের মানুষের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। একই তাপপ্রবাহ ঢাকা শহরের পাশে অবস্থিত আড়িয়ল বিল এলাকার কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার মানুষের জন্য যতটুকু অস্বস্তি সৃষ্টি করবে, তা অপেক্ষা অনেক বেশি অস্বস্তি সৃষ্টি করবে ঢাকা শহরের মানুষের জন্য। কারণ, সূর্য থেকে আগত তাপের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হবে আড়িয়াল বিল এলাকার জলাভূমির পানি বাষ্পয়ান করার জন্য কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রাম বনভূমির থেকে ইভাপোট্রান্সপিরেশনের জন্য। যে শহর এলাকায় খোলা জায়গা ও গাছপালা যত বেশি থাকবে, সেই এলাকায় মানুষ তাপপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব তত কম অনুভব করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আছি কি?

উত্তরটি হলো হ্যাঁ, বাংলাদেশ ও ভারতের ওপর চলমান তাপপ্রবাহের ওপর জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক বৈজ্ঞানিকদের ৯০ শতাংশের বেশি একমত হয়েছেন যে তাপপ্রবাহের ওপর জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ পেয়েছেন যে আজ থেকে ৩০ বছর আগে পৃথিবীর কোনো স্থানের ওপর দিয়ে প্রতিবছর গ্রীষ্মকাল ঠিক যতটি তাপপ্রবাহ বয়ে যেত, তা অপেক্ষা অনেক বেশিসংখ্যক তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। অধিকন্তু বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে সাম্প্রতিক কালের তাপপ্রবাহের ঘটনাগুলো অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বছরের প্রথম তাপপ্রবাহের ঘটনা ও বছরের শেষ তাপপ্রবাহের ঘটনার মধ্যবর্তী সময় বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলতে হয়, বাংলাদেশের সাধারণ বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই (মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে) তাপপ্রবাহ ঘটনা ঘটতে দেখা গেলেও ২০২২ সালে জুলাই মাসে সেটি দেখা গেল। এই ২০২২ সালে গ্রীষ্মকালে ভারত ও পাকিস্তানের ওপর দিয়ে প্রথম যে তাপপ্রবাহটি অতিক্রম করেছে, তা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক আগে হয়েছে। বিশ্বের অন্য অনেক দেশেও একইভাবে বছরের এমন সময়ে তাপপ্রবাহের ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে যে ওই সব দেশের তাপপ্রবাহ সংগঠিত হওয়ার আগের কোনো উদাহরণ নেই।

  • মোস্তফা কামাল আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক পিএইচডি গবেষক। স্কুল অব এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সাসটেইনিবিলিটি, সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা

    ইমেইল: [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন