চট্টগ্রাম থেকেও কেন রোগী নিয়ে ঢাকায় দৌড়াতে হয়

চট্টগ্রাম শহরটি এক বিস্তৃত অঞ্চলের মানুষের নানা কাজকর্মের কেন্দ্রস্থল। অথচ এই শহরের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দিকে চোখ রাখলে অদ্ভুত শূন্যতার মুখোমুখি হতে হয়। এখানে কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই।

পটিয়া থানার মনসা গ্রামের কিবরিয়ার চার বছরের ছেলে রাফসান যেন সেই শূন্যতারই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। একসময় যে শিশু ছিল প্রাণবন্ত, ছুটে বেড়াত, হাসত, আজ সে হাঁটে না, খেলে না, খায় না। ধীরে ধীরে নিভে যেতে থাকা এক শৈশবের দিকে তাকিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তার মা–বাবা। প্রথমে স্থানীয় চিকিৎসা, তারপর চোখের চিকিৎসক, শেষে ব্রেনের চিকিৎসক—একেক ধাপে বেড়েছে শঙ্কা। শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ল ব্রেন টিউমার। কিন্তু প্রকৃত বিপর্যয় তখনো বাকি ছিল।

চট্টগ্রামের চিকিৎসকেরা জানান, এই অপারেশন এখানে সম্ভব নয়। এক সপ্তাহের মধ্যে জরুরি অস্ত্রোপচার দরকার, কিন্তু শহরটিতে সেই সক্ষমতা নেই। শুরু হলো ঢাকামুখী দৌড়। শিডিউল না পেয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে অবশেষে অপারেশন। তারপর আবার দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার।

ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত কিবরিয়ার পরিবার ঢাকায় কার্যত এক পরবাসজীবন কাটাচ্ছে—অচেনা শহর, অচেনা মানুষ আর সীমাহীন আর্থিক চাপের মধ্যে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল কিবরিয়া এক সওদাগরি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পুত্রের চিকিৎসা খরচ চালাতে গিয়ে এখন সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। ধারাদেনা করেও পুত্রের জীবন নিয়ে এখনো তাঁর শঙ্কা কাটেনি।

এই দীর্ঘ যন্ত্রণার মধ্যে কিবরিয়ার সরল প্রশ্ন, ‘চিটাগাঙে এইল্লা অপারেশন নয় ক্যায়া?’ (চট্টগ্রামে এই অপারেশন হয় না কেন?) এ প্রশ্ন শুধু একজন পিতার নয়; এটি চট্টগ্রামের লাখো মানুষের প্রশ্ন।

বাস্তবতা হলো, চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য খাত এখনো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। প্রায় চার কোটি মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যার শয্যাসংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি জনবল বা সুযোগ-সুবিধা। ফলে ওয়ার্ডের ভেতরে জায়গা না পেয়ে রোগীদের মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে উপচে পড়া রোগীদের দৃশ্য দেখলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার করুণ বাস্তবতাকে নগ্ন করে তুলে ধরে।

আরও পড়ুন

সরকারি পর্যায়ে বিকল্প বলতে আছে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল এবং বিআইটিআইডি হাসপাতাল। কিন্তু জেনারেল হাসপাতালে রয়েছে যন্ত্রপাতি ও বিশেষায়িত সেবার ঘাটতি, আর বিআইটিআইডি শহরের বাইরে হওয়ায় অনেক রোগী সেখানে যেতে চান না। ফলে চাপ গিয়ে পড়ে চমেক হাসপাতালের ওপরই।

অন্যদিকে বেসরকারি খাতে কিছু হাসপাতাল গড়ে উঠলেও সেগুলোর ব্যয় এত বেশি যে সাধারণ মানুষ সেখানে চিকিৎসার কথা ভাবতেও পারেন না। আবার কিছু বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট রয়েছে। এমনকি উন্নত রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে আছে চট্টগ্রাম—ক্যানসার শনাক্তে প্রয়োজনীয় মলিকুলার ল্যাব না থাকায় নমুনা পাঠাতে হয় ঢাকায় বা বিদেশে, যার ফলে সময় নষ্ট হয়, অনিশ্চয়তা বাড়ে।

তবে সবকিছুর মধ্যেও কিছু আশার আলো আছে। বিশেষায়িত বার্ন হাসপাতাল নির্মাণাধীন, ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ ও কিডনি চিকিৎসার জন্য বহুতল ভবনের কাজ এগোচ্ছে। পেট-সিটি স্ক্যানের মতো আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ এখনো বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে অপেক্ষার তালিকায়।

চট্টগ্রামকে আমরা দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী বলি। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে এই শহরের অবস্থান সেই পরিচয়ের সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জনসংখ্যা বেড়েছে, রোগীর চাপ বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি অবকাঠামো। ফলে বাধ্য হয়ে রোগীরা ছুটছেন ঢাকায়, আর যাদের সামর্থ্য আছে, তারা দেশ ছাড়িয়ে ভারত, সিঙ্গাপুর কিংবা থাইল্যান্ডে। এ বাস্তবতায় কিবরিয়ার প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে ওঠে—কেন চট্টগ্রামে বিশেষায়িত চিকিৎসা নেই?

চট্টগ্রামের মতো এত বড় একটি নগর, যার ওপর আশপাশের সব জেলার মানুষ নির্ভরশীল, সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ, আধুনিক, বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মৌলিক প্রয়োজন। এখানকার স্বাস্থ্য খাতকে উন্নত করা শুধু একটি শহরের দাবি নয়, এটি একটি অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন। তবে সিআরবির মতো প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যময় এলাকায় যেন এমন হাসপাতাল না হয়, সেটিও মাথায় রাখতে হবে।

চট্টগ্রামে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই দরকার সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি ‘টারশিয়ারি কেয়ার সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে, যেখানে নিউরোসার্জারি, ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ, কিডনি ও শিশুস্বাস্থ্য—এই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো এক ছাদের নিচে থাকবে। শুধু অবকাঠামো নয়, সমান গুরুত্ব দিতে হবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে। এ জন্য দেশের শীর্ষ মেডিকেল কলেজগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বিশেষায়িত চিকিৎসকদের চট্টগ্রামে নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেল কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে প্রকল্পগুলো কাগজে আটকে না থাকে।

ডায়াগনস্টিক সক্ষমতা বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ল্যাব, বিশেষ করে ক্যানসার শনাক্তকরণের জন্য মলিকুলার ল্যাব স্থাপন করতে হবে, যাতে রোগ নির্ণয়ে দেরি না হয়।

সবশেষে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, শুধু হাসপাতাল নির্মাণ নয়, মানসম্মত, সুলভ ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। চট্টগ্রামে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে উঠলে সবচেয়ে বড় লাভ হবে মানুষের সময়, অর্থ ও মানসিক কষ্ট কমে যাওয়া।

গুরুতর রোগীদের আর ঢাকায় ছুটতে হবে না; দ্রুত চিকিৎসা পেলে মৃত্যুহারও কমবে। ঢাকার ওপর চাপও কমবে। স্থানীয়ভাবে উন্নত চিকিৎসা পাওয়া গেলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা হবে আরও সহজলভ্য। একই সঙ্গে শহরের ওপর আস্থা বাড়বে, বিদেশমুখী চিকিৎসাপ্রবণতা কমবে। দক্ষ চিকিৎসক ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি হবে, যা পুরো অঞ্চলের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

  • ওমর কায়সার প্রথম আলোর চট্টগ্রাম অফিসের বার্তা সম্পাদক