সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং অপরাধ দমনে ‘পুলিশিং’ বা আইনি তদারকি রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। কিন্তু এই দায়িত্ব পালনের নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রা, চলাফেরা বা পোশাক-আশাকে খবরদারি শুরু করে, তখন তা ‘পুলিশিং’-এর গণ্ডি পেরিয়ে রূপ নেয় ‘মোরাল পুলিশিং’ বা নৈতিকতার খবরদারিতে।
২৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘটা মোরাল পুলিশিং ও হামলার ঘটনাটি দেখাচ্ছে, শৃঙ্খলা নিশ্চিতের নামে নাগরিকের নৈতিকতার ওপর খবরদারির গণ্ডি থেকে নিরাপত্তা বাহিনী এখনো বের হতে পারেনি।
মাদকবিরোধী অভিযান যখন নৈতিকতার খবরদারি
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের অধীন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ওই সন্ধ্যায় একটি ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ চলছিল। কিন্তু খুব দ্রুতই সেটি রূপ নেয় উদ্যানে চলাফেরা করা মানুষের প্রতি হয়রানিতে।
পুলিশের অযাচিত আচরণের কারণ জানতে চেয়ে উত্তর পাওয়ার বদলে হামলার শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিন। তাঁর ওপর এলোপাতাড়ি লাঠিপেটার সময় এক পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায়, ‘ছোট ভাই, আরগুমেন্ট বেশি করতেছ।’ অর্থাৎ পুলিশের অন্যায্য আচরণের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা বা যুক্তি খণ্ডন করাটাই ওই শিক্ষার্থীর ‘অপরাধ’ বলে বিবেচিত হয়েছে। একই সময়ে সেখানে দায়িত্বরত এক সাংবাদিকও পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ ধরনের স্বেচ্ছাচারী আচরণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা দায়মুক্তি এবং ওপর মহলের সমর্থন এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে বসে থাকা নীতিনির্ধারকেরা যখন এ ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রশ্রয় দেন, তখন মাঠপর্যায়ে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হওয়াটা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের বক্তব্যেও সেই মানসিকতার প্রতিফলন দেখা গেছে। কিশোরদের রাতে ঘোরাফেরা বন্ধের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, রাতে বের হলে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করবে। ‘এতে সংবিধান লঙ্ঘন হলেও পরে দেখা হবে।’
দেশের নীতিনির্ধারকেরা যদি প্রকাশ্যে সংবিধান লঙ্ঘন করাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দেন, সে দেশে পুলিশের যেকোনো ইউনিট নিজেদের আইনের চেয়ে শক্তিশালী মনে করবে, এটাই স্বাভাবিক।
বিপুল জনসমর্থন ও জন-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে নবনির্বাচিত সরকার। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনস্তত্ত্বে যদি কোনো বদল না আসে, তবে এই গণতান্ত্রিক যাত্রার অর্থ প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
কেন ‘মোরাল পুলিশিং’ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিপজ্জনক
পুলিশ বা কোনো সরকারি সংস্থার দ্বারা নাগরিকের ‘মোরাল পুলিশিং’-এর শিকার হওয়া বেশ কয়েকটি কারণে সমস্যাজনক। মোরাল পুলিশিংয়ের প্রাথমিক ভিত্তি হচ্ছে কোনো ব্যক্তির একান্ত বাছবিচার।
প্রত্যেক ব্যক্তিরই বাছবিচার আলাদা, আলাদা একেকজনের নৈতিক মানদণ্ড ও পরিধি। এ জন্যই কোনো ঘটনাকে বিচার করতে প্রয়োজন হয় আইনের। নাগরিকের জন্য আইন নির্দিষ্ট, লিখিত এবং বিচারযোগ্য। কিন্তু ‘নৈতিকতা’ আপেক্ষিক, সময়-সংস্কৃতি-পরিপ্রেক্ষিত ভেদে পরিবর্তনশীল।
যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেদের নৈতিক ধারণাকে আইনের সমতুল্য ধরে নিয়ে প্রয়োগ করতে শুরু করে, তখন ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এদিকে নৈতিকতার খবরদারির ফলে নাগরিকের মৌলিক অধিকারও ক্ষুণ্ন হয়।
আমাদের সংবিধান সব নাগরিককে ব্যক্তিস্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দেয়। মোরাল পুলিশিং সাধারণত এসব অধিকারের সীমানায় হস্তক্ষেপ করে। কেউ কোথায় বসবে, কী পরবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, কখন-কোথায় চলাচল করবে—এসব প্রশ্ন রাষ্ট্রের এখতিয়ারের বাইরে।
মোরাল পুলিশিংয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এটি সরকার ও নাগরিকের মধ্যে অশ্রদ্ধার পরিবেশ তৈরি করে। পুলিশ যদি নিরাপত্তার প্রতীক না হয়ে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের প্রতীকে পরিণত হয়, তবে মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে অনীহা বোধ করবে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি অপরাধ দমনকেও কঠিন করে তুলবে।
অপরাধ নির্মূলে চাই কাঠামোগত সমাধান
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দীর্ঘদিন ধরে মাদকের হটস্পট হিসেবে পরিচিত। নগর-পরিকল্পনা ও নীতিগত অব্যবস্থাপনার কারণে বিশাল এই উন্মুক্ত জায়গা সন্ধ্যার পর থেকে অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অনিরাপদ হয়ে থাকে। সেখানে অন্ধকারে সাইরেন বাজিয়ে লোকদেখানো ও হয়রানিমূলক আকস্মিক অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন।
কোনো এলাকায় অপরাধ কমাতে চাইলে সেখানে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক উপস্থিতি বাড়াতে হয়। পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, পরিবারকেন্দ্রিক বিনোদন ও সাংস্কৃতিক তৎপরতা থাকলে সেখানে মাদক বা অন্যান্য অপরাধের আখড়া এমনিতেই টিকতে পারে না।
সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি তিনি স্বীকার করেছেন যে গতানুগতিক বিচ্ছিন্ন অভিযান দীর্ঘ মেয়াদে কোনো সুফল আনে না। বরং তিনি আধুনিক গোয়েন্দা নজরদারি এবং কাঠামোগত সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ক্ষেত্রেও পুলিশকে সেই দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতে হবে।
গণতান্ত্রিক সরকার শুরুতেই হোঁচট না খাক
বিপুল জনসমর্থন ও জন-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে নবনির্বাচিত সরকার। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনস্তত্ত্বে যদি কোনো বদল না আসে, তবে এই গণতান্ত্রিক যাত্রার অর্থ প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
নাগরিক সুরক্ষা দেওয়ার বদলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি হঠকারী আচরণ ও গায়ে পড়ে নৈতিকতার ছড়ি ঘোরাতে শুরু করে, তবে তা নতুন সরকারের ভাবমূর্তিকে শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
নাগরিকের ব্যক্তিজীবনে পুলিশের অযাচিত নাক গলানো বা মোরাল পুলিশিং সরাসরি সংবিধানের লঙ্ঘন। নতুন সরকারের উচিত অবিলম্বে জবাবদিহির সংস্কৃতি জোরদার করা। ইতিমধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমপি। তবে সেটা হামলা করার কারণে হয়েছে, নাকি জিজ্ঞাসাবাদের নামে অযাচিত মোরাল পুলিশিংয়ের কারণে হয়েছে, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়।
সরকারের তরফ থেকে পুলিশকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব জনগণের আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের লাঠিপেটা করে ‘নৈতিকতার’ সবক শেখানো নয়।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে 'শক্তি প্রয়োগ' কখনোই নাগরিককে নিয়ন্ত্রণে রাখার হাতিয়ার হতে পারে না। পুলিশের প্রধান কাজ নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা। তা নিশ্চিত করতে না পারলে এই জবাবদিহিহীন ক্ষমতা ও মোরাল পুলিশিংয়ের মানসিকতা ফলে হিতে বিপরীত হবে। এক পর্যায়ে এটি রাষ্ট্রকেই ঠেলে দেবে দীর্ঘস্থায়ী আস্থার সংকটের দিকে।
সৈকত আমীন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
