বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনে আয়বৈষম্য যেভাবে দায়ী

জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসের সবচেয়ে বড় উৎস কার্বন ডাই–অক্সাইড। কার্বন নিঃসরণ বেড়ে যাওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি হলো আয়বৈষম্য, যা তুলনামূলক কম আলোচিত। বাংলাদেশে এ দুইয়ের সম্পর্ক নিয়ে লিখেছেন খলিলউল্লাহ্

গবেষণা বলছে, ধনীদের আয় বাড়লে কার্বন নিঃসরণও বাড়েছবি: ফ্রিপিক

বাংলাদেশে আয়বৈষম্য বাড়ছে, এটা আর নতুন খবর নয়। অন্যদিকে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তেমন উল্লেখযোগ্য না হলেও নিঃসরণের হার ক্রমেই বাড়ছে। এই বৃদ্ধির পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো আয়বৈষম্য। বৈষম্য বাড়ার ফলে স্বল্প কিছু মানুষের হাতে অতিমাত্রায় ধনসম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে। আর সেই অতি ধনিক শ্রেণি নানা রকম বিলাসী দ্রব্যের প্রতি ঝুঁকছে, যা তৈরিতে অতিমাত্রায় জ্বালানি প্রয়োজন।

অন্যদিকে আয়বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের কর্মঘণ্টা বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এটিও কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ।

পরিহাসের বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে রাষ্ট্র যেসব আইন প্রণয়ন করতে চায়, আয়বৈষম্যের মাধ্যমে সৃষ্ট ধনিক শ্রেণি সে প্রক্রিয়াতেও প্রভাব বিস্তার করে থাকে। বিদ্যমান আইনকানুন ভঙ্গ করা ও এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তো আছেই, যথাযথ জবাবদিহি না থাকা এবং ধনিক শ্রেণির প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্বও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। বড় করপোরেশনগুলো তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা জানার পরও মুনাফার কথা চিন্তা করে ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে প্রমাণ রয়েছে।

আরও পড়ুন

বাড়ছে কার্বন নিঃসরণ

বিগত ছয় দশকে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ অতিমাত্রায় বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী নানা মাত্রায় তোড়জোড় থাকলেও এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। সাধারণত বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনগুলো উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন ছাড়াই শেষ হয়ে থাকে।

এদিকে উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কার্বন নিঃসরণ বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। এর ফলে জ্বালানির চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটা বড় বিপদ। কারণ, আমাদের মতো দেশে আর্থিক সক্ষমতা, কারিগরি জ্ঞান ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির মতো পদ্ধতি বেছে নেওয়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। অন্যদিকে শিল্পায়নের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি অর্জনের সঙ্গে আয়বৈষম্যও বাড়ছে।

উল্লেখিত দুটো বিষয়ই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসডিজির ১০ ও ১৩ নম্বর লক্ষ্যে আয়বৈষম্য কমানো ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা দুটো লক্ষ্যেই ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকির মুখে রয়েছি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রমাগত উচ্চমাত্রার দূষিত দেশ হিসেবে বিশ্ব তালিকায় উঠে আসছে। ‘আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটা’ নামক অনলাইন প্রকাশনার ২০২৩ সালের হিসাবে দেখা যায়, ১৯৮০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ প্রতিবছর গড়ে ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহনের ক্রমাগত উচ্চ ব্যবহার এবং উচ্চ কার্বন পণ্যের কারণে এই বৃদ্ধি ঘটছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়।

অন্যদিকে জলবায়ু উদ্বাস্তুসহ বিভিন্ন আর্থসামাজিক কারণে শহরগুলোতে জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটছে ব্যাপক হারে। ফলে শহরাঞ্চলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে ক্রমাগত। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশের নগরাঞ্চলে দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ১৫০ শতাংশ বেশি।

আয়বৈষম্যের সঙ্গে কার্বন নিঃসরণের সম্পর্ক

বিশ্বব্যাপী সাধারণত গিনি কোইফিশিয়েন্ট বা সহগ দিয়ে আয়বৈষম্য পরিমাপ করা হয়। বাংলাদেশে আয় বণ্টনের গিনি সহগ ১৯৮৪ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৩৬, ২০২২ সালে যা বেড়ে হয়েছে শূন্য দশমিক ৪৯৯।

বিভিন্ন অর্থনীতিবিদের করা গবেষণায় দেখা যায়, আয়বৈষম্য পরিবেশের ক্ষতি করে। সমাজের ধনিক শ্রেণি সম্পদ বণ্টনে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে দরিদ্র শ্রেণিকে বঞ্চিত করে এবং পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে। একইভাবে, আয়বৈষম্যের কারণে সমাজে ধনিক শ্রেণির স্ট্যাটাস কনজাম্পশন বাড়ে, যা কার্বন নিঃসরণ বাড়ায়।

স্ট্যাটাস কনজাম্পশন মানে ভোগবিলাস, যা সাধারণত নিজেকে জাহির করতে মানুষ করে থাকে। স্ট্যাটাস কনজাম্পশনের জন্য মানুষ বেশি সময় কাজ করতেও বাধ্য হয়। এটিও কার্বন নিঃসরণ বাড়ায়।

আগে থেকেই বাংলাদেশের মানুষের কর্মঘণ্টা উন্নত দেশের তুলনায় বেশি ছিল। ‘আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটা’ কর্মঘণ্টা নিয়ে তাদের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, ১৯৮০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কানাডায় একজন কর্মীর বার্ষিক গড় কর্মঘণ্টা ছিল ১ হাজার ৭৬১। আর বাংলাদেশে ছিল ২ হাজার ৪৯৭। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু কর্মঘণ্টা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায়ও বেশি। একই সময়ে ভারতে বার্ষিক মাথাপিছু কর্মীদের কর্মঘণ্টা ছিল ২ হাজার ৯০, পাকিস্তানে ২ হাজার ১৪৭ এবং শ্রীলঙ্কায় ১ হাজার ৯২৯।

সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে পরিবেশের ওপর দুই ধরনের প্রভাব পড়ে। প্রথমত, বৈষম্যের কারণে আরও বেশি মানুষ দরিদ্র হয়। আর এই দরিদ্র হয়ে পড়া মানুষ, বিশেষ করে কৃষক ও অদক্ষ শ্রমিকেরা জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয় বন ও পরিবেশ নষ্ট করতে। নগরে এসব মানুষের অপরিকল্পিত বসবাসের মাধ্যমেও পরিবেশের ক্ষতি হয়। দ্বিতীয়ত, ধনীরা পুঁজির মালিক হিসেবে উৎপাদন ও কাঁচামাল আহরণে জীবাশ্ব জ্বালানি সবচেয়ে বেশি পোড়ায়।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সরকার কোনো পদক্ষেপ তো নেয়ইনি, বরং ২০২২ সাল থেকে পোশাক কারখানাগুলোয় কর্মীদের কাজের সময় আইনগতভাবেই বাড়িয়ে সপ্তাহে ৭২ ঘণ্টা করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত সময় কাজের ফলে অফিসগুলো বেশি মাত্রায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহার করে বাড়তি কার্বন নিঃসরণ করছে।

২০১৫ সালে ক্রিটিক্যাল পারস্পেকটিভ ইন অ্যাকাউন্টিং নামক জার্নালে আতাউর রহমান বেলাল, স্টুয়ার্ট কুপার ও নিয়াজ আহমেদ খানের একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। ‘করপোরেট এনভায়রনমেন্টাল রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি: হোয়াট চান্স ইন ভালনারেবল বাংলাদেশ’ শিরোনামের সে নিবন্ধে বাংলাদেশের ৩২টি বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আধা–কাঠামোবদ্ধ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ১৩ জন ছিলেন করপোরেট ম্যানেজার।

ফলাফলে দেখা যায়, তাঁদের বেশির ভাগই জানতেন যে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবেশদূষণ হচ্ছে। কিন্তু এটা তাঁদের বড় কোনো মাথাব্যথা নয় বলেই তাঁরা মনে করতেন। অন্যদিকে করপোরেট ম্যানেজারদের এ বিষয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাও নেই। কারণ, তা করতে গেলে তাঁদের মুনাফা কমে যাবে বলে তাঁরা মনে করেন।

অথচ সরকারের দিক থেকে নানা ধরনের নীতি নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তা বাস্তবে তেমন কোনো প্রভাব রাখতে পারছে না। কারণ, এসব নীতি বাস্তবায়নের চেয়ে এলিটদের স্বার্থ রক্ষাই বাংলাদেশে প্রাধান্য পেয়ে এসেছে।

ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট সাসটেইনেবিলিটি জার্নালে প্রকাশিত সাঈদ খান, লেনোরা ব্রাউন ও অনুপম দাশের করা গবেষণায় আয়বৈষম্যের সঙ্গে কার্বন নিঃসরণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাঁরা দেখিয়েছেন, শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর আয় বাড়লে কার্বন নিঃসরণ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ে। অন্যদিকে শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনীর আয় যদি ১ শতাংশ বাড়ে, তাহলে কার্বন নিঃসরণ বাড়ে ১ শতাংশের চার ভাগের তিন ভাগ। তাই তাঁরা আয়ের সমবণ্টনে জোর দেন। এর ফলে শুধু আয়বৈষম্যই নয়, পরিবেশেরও উপকার হবে বলে তাঁরা মনে করেন।

রুশ বংশোদ্ভূত মার্কিন অর্থনীতিবিদ সিমন কুজনেটসের নাম অনুসারে ব্যাপক আলোচিত কুজনেটস কার্ভ অনুযায়ী, উন্নয়নের শুরুর দিকে বৈষম্য বাড়ে, কারণ আরও বেশি প্রবৃদ্ধির জন্য সম্পদ পুঞ্জীভূত করা হয়। উন্নয়নের এই ধাপে উৎপাদন ও ভোগের কারণে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, নগরায়ণ ও শিল্পায়ন বৃদ্ধি পায়। তাই কার্বন নিঃসরণসহ সার্বিকভাবে পরিবেশের অবনতি ঘটে।

সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে পরিবেশের ওপর দুই ধরনের প্রভাব পড়ে। প্রথমত, বৈষম্যের কারণে আরও বেশি মানুষ দরিদ্র হয়। আর এই দরিদ্র হয়ে পড়া মানুষ, বিশেষ করে কৃষক ও অদক্ষ শ্রমিকেরা জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয় বন ও পরিবেশ নষ্ট করতে। নগরে এসব মানুষের অপরিকল্পিত বসবাসের মাধ্যমেও পরিবেশের ক্ষতি হয়।

দ্বিতীয়ত, ধনীরা পুঁজির মালিক হিসেবে উৎপাদন ও কাঁচামাল আহরণে জীবাশ্ব জ্বালানি সবচেয়ে বেশি পোড়ায়। মজার ব্যাপার হলো, উন্নত দেশগুলোয় পরিবেশবান্ধব কঠোর আইনকানুন আছে। ফলে অতিমাত্রায় কার্বন পোড়ায় বা পরিবেশের ক্ষতি করে যেসব শিল্পকারখানা, সেগুলো বাংলাদেশের মতো দেশে সরিয়ে আনা হয়। বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের দিকে তাকালেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

স্ট্যাটাস কনজাম্পশন ও ডেমোনস্ট্রেশন ইফেক্ট

২০২২ সালের ২ জানুয়ারি রাতে ঢাকার নতুন বাজার এলাকার মাদানী অ্যাভিনিউয়ে এক ব্যবসায়ী পরিবারে বিয়ের গায়েহলুদের অনুষ্ঠান হয়। সেখানে নিয়ে আসা হয় বাদশাহ নামে পরিচিত ভারতের জনপ্রিয় র‌্যাপ সংগীতশিল্পীকে। স্বাভাবিকভাবেই সেই গায়েহলুদ অনুষ্ঠানের মোট খরচ অনুমান করাও কঠিন। পুরো বিয়ের খরচের হিসাবে নাই–বা গেলাম।

এ ঘটনা তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হয়েছিল। সমস্যা হলো, এ ঘটনার প্রভাব অন্যদের ওপরও পড়বে। যার সামর্থ্য আছে তিনি চাইবেন, তার সন্তানের বিয়েতে আরও বড় কোনো সেলিব্রিটিকে নিয়ে আসতে। অথচ এটা একটা স্ট্যাটাস কনজাম্পশন, বিয়ের কোনো অপরিহার্য উপাদান নয়।

সচরাচর দেখা যায়, প্রয়োজনের বাইরেও অনেকে দামি কোনো রেস্টুরেন্টে খেয়েছেন বা ভ্রমণে গিয়ে দামি কোনো হোটেলে উঠেছেন। এ ধরনের স্ট্যাটাস কনজাম্পশন আবার ফেসবুকের চেকইন ও নানা রকম ছবি–ভিডিওর মাধ্যমে আরেকজনকে প্রভাবিত করছে। এটাই ডেমোনস্ট্রেশন ইফেক্ট, অর্থাৎ অপরকে অনুসরণ করে একই কাজ করা। এসব কনটেন্ট ছড়ানোর ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে স্ট্যাটাস কনজাম্পশনও বাড়ছে।

২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন গবেষক মিলে জার্নাল অব রিটেইলিং অ্যান্ড কনজ্যুমার সার্ভিসেস নামক সাময়িকীতে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। ‘স্ট্যাটাস কনজাম্পশন ইন নিউলি ইমার্জিং কান্ট্রিজ’ শিরোনামে বাংলাদেশের ২৬৯ জন রিয়েল এস্টেট ও পোশাকশিল্প মালিকের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে করা হয় সে গবেষণা। সেখানে দেখা যায়, এ দুই খাতের প্রবৃদ্ধির কারণে এসব ব্যক্তি স্ট্যাটাস কনজাম্পশনের দিকে ঝুঁকেছেন।

নিওলিবারেল অর্থনীতিতে এই স্ট্যাটাস কনজাম্পশন খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। এ ব্যবস্থা বিলাসী জিনিসকেও অপরিহার্য বানায়। মানুষ তখন বৈধ–অবৈধ যেকোনো উপায়ে টাকা আয় করতে চায়। ফলে ঘুষ–দুর্নীতি আর বিবেকে বাধে না। আমরা উঠতে–বসতে বলি, মানুষের নীতিনৈতিকতা বলে আর কিছু নেই। কিন্তু এটা তো হুট করে আসা কোনো পরিবর্তন নয়। আমাদের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই এর জন্য দায়ী। আয়বৈষম্য এখানে বাড়বেই।

এদিকে সমাজে আয়বৈষম্য যত বাড়ে, স্ট্যাটাস কনজাম্পশনও তত বাড়ে। ফলে কার্বন নিঃসরণও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে।

করণীয় কী

সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে আয়বৈষম্য কমানোর দাবি ছিল বহুদিনের। এখন পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও সরকারের উচিত আয়বৈষম্য কমিয়ে আনতে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদদের একটি অন্যতম পরামর্শ হলো পুনর্বণ্টনমূলক আর্থিক নীতি, যার মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা যাবে। প্রগতিশীল আয়কর হিসেবে পরিচিত করনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা যায়।

কার্বন নিঃসরণ কমাতে একটি বহুল পরিচিত উপায় হলো কার্বন কর আরোপ। এর মাধ্যমে একই সঙ্গে আয়বৈষম্য ও কার্বন নিঃসরণ দুটোই কমানো যাবে বলে রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন। তাঁদের মতে, কার্বন কর আরোপ করলে তা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও দরিদ্রদের আয় না কমিয়েই কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারে। উল্টো কার্বন কর থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তিতে ব্যয় করা যায়।

যদিও বহু পরিবেশবাদী এর সমালোচনা করেন। কারণ, যার সামর্থ্য আছে, সে যদি জানে তার মুনাফা আসবেই, তাহলে বাড়তি কর দিয়ে হলেও কার্বন নিঃসরণ করবে। ফলে পৃথিবী গ্রহের উপকার হবে সামান্যই।

অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন ‘অনুমতি নিলামের’ মাধ্যমে নিঃসরণের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া বেশি যুক্তিসংগত নীতি। তা ছাড়া অদক্ষ ও কম দক্ষ শ্রমিকদের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে তাঁদের দক্ষ শ্রমিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে আয়বৈষম্য কমে আসবে। গ্রামীণ অবকাঠামো, কৃষি ও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগের মাধ্যমেও আয়বৈষম্য কমানো যায়।

মোদ্দা কথা, আয়বৈষম্য কমানো শুধু সামাজিক ন্যায্যতার বিষয়ই নয়, প্রাণ–প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

  • খলিলউল্লাহ্‌ লেখক ও সাংবাদিক; প্রথম আলোর জলবায়ু প্রকল্প ব্যবস্থাপক

    মতামত লেখকের নিজস্ব