তরুণদের রাজনীতি যে কারণে ভোটের মাঠে পিছিয়ে

জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যেই প্রচারণা শুরু করেছে। এখন ভোটের রাজনীতি কেবল শহরের টক শো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানী থেকে মফস্‌সল, সবখানেই এখন ভোটের আলাপ চলছে।

তবে দেশের প্রান্তিক ও স্থানীয় পর্যায়ে ভোটের রাজনীতির ধরন শহরের রাজনৈতিক আলোচনার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। অনেক প্রবীণ রাজনৈতিক দল ও নেতা দীর্ঘদিনের নিপীড়ন, ত্যাগ এবং কিছু অর্জনের কথা তুলে ধরে জনগণের সহমর্মিতা প্রত্যাশা করে চাইছেন দোয়া ও ভোট। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত তরুণ রাজনীতিবিদেরা নিজেদের ব্যক্তিগত পরিচয় তুলে ধরছেন এবং একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন।

খুলনা, রংপুর, গাজীপুর কিংবা সাতক্ষীরার উপকূলীয় গ্রামাঞ্চলে ভোট মানে কেবল দলীয় প্রতীক নয়; এখানে ভোট নির্ধারিত হয় আত্মীয়তা, পারস্পরিক বিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং পারিবারিক প্রভাবের সমন্বয়ে। এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, সাধারণ মানুষ এই নতুন ও পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল ও প্রচারণাকে কীভাবে গ্রহণ করছে? নবীন রাজনৈতিক দল ও তরুণ নেতৃত্ব সম্পর্কে তাদের ধারণাই বা কী?

ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে? এই লক্ষ্যে বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় মানুষের ভোট-আচরণ, চিন্তাধারা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক গবেষণা পরিচালনা করছে, যাতে বোঝা যায় মানুষ কেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে নির্দিষ্ট দল বা প্রার্থীকে ভোট দেয়?

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা ও ভাবনা নিয়ে বিআইজিডি পরিচালিত জুন, ২০২৫–এর একটি জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১২ শতাংশ বিএনপি, ১০ দশমিক ৪ শতাংশ জামায়াতে ইসলামী, ৭ দশমিক ৪ শতাংশ আওয়ামী লীগ এবং মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ এনসিপির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এখানে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, জনপ্রিয়তার দৌড়ে প্রবীণ রাজনৈতিক দলগুলোই তুলনামূলকভাবে এগিয়ে আছে।

তবে উল্লেখ্য, এ জরিপটি এনসিপির বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে জোট গঠনের আগে পরিচালিত। জোট গঠনের পর দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী ও পুরুষ নেতা পদত্যাগ করেন, এবং তাঁদের কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এই বাস্তবতা দলটি সম্পর্কে মানুষের পূর্বের ধারণার সঙ্গে নতুন করে কিছু প্রশ্ন যুক্ত করেছে। বিশেষ করে দলের ভেতরে আস্থার সংকট ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। নেতা–কর্মীদের ধারাবাহিক পদত্যাগ এবং মাঠ পর্যায়ে দলটির সীমিত উপস্থিতি এ সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়।

ফলে মানুষের মনে দলটির জুলাই আন্দোলন ও আদর্শিক প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হলো—এনসিপিসহ অন্য তরুণদের রাজনৈতিক দলগুলো শহরে আলোচিত ও সামাজিক মাধ্যমে দৃশ্যমান হলেও ভোটের মাঠে, অর্থাৎ মানুষের জীবনে, তাদের উপস্থিতি প্রায় নেই।

তরুণদের রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিই বিকল্প শক্তি হয়ে উঠতে চায়, তবে শহরের আলো ছেড়ে গ্রামের উঠানে, বাজারের চায়ের দোকানে, মানুষের জীবনের ভেতরে যেতে হবে। তখনই তারা ভোটের মাঠে টিকে থাকতে পারবে এবং মানুষের আস্থা অর্জন করে একটি বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে।

গবেষণা তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ভোটের মাঠে এখনো পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোই এগিয়ে। তবে নতুন দলের নাম দেশের প্রায় সব অঞ্চলের মানুষ জানে, এটিও একটি বড় অর্জন। সংখ্যায় কম হলেও কিছু তরুণ রাজনীতিবিদ প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পেরেছেন। তাঁরা নিজেদের সেসব এলাকার সন্তান হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন এবং পড়াশোনা বা কর্মজীবনের কারণে বাইরে থাকলেও আদর্শিকভাবে এলাকার মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার কথা বলছেন।

সাধারণ মানুষ এমন কিছু তরুণ নেতাকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ ধরনের নেতার সংখ্যা খুবই সীমিত। অধিকাংশ মানুষের কাছে তরুণদের দল মানে এখনো শুধু একটি নাম; আর শুধু নাম পরিচিত হওয়া যথেষ্ট নয়।

এক বছরে আস্থার কিছুটা ক্ষয় হয়েছে, তরুণ রাজনীতি নিয়ে মানুষের আশা অনেক ক্ষেত্রে হতাশায় রূপ নিয়েছে। যাঁরা দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী, তাঁরা নতুন ভাবনা, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব, সাহস, সততা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে শক্তি হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে, যাঁরা সন্দিহান, তারা অভিজ্ঞতার অভাব, নেতৃত্বের দুর্বলতা, জনগণের আস্থাহীনতা, বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা ও জোট গঠন এবং সাংগঠনিক অক্ষমতাকে প্রধান দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

এর পাশাপাশি পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নতুনদের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপও তৈরি হয়েছে। নতুন দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ ছড়ানো হয়েছে। প্রান্তিক মানুষের দৃষ্টিতে যেখানে বয়স ও অভিজ্ঞতাকে যোগ্যতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, সেখানে তরুণেরা পিছিয়ে পড়ছেন। গাজীপুরের একজন শিক্ষক বলেন, ‘এই এলাকায় শিক্ষিত তরুণদের তেমন মূল্যায়ন করা হয় না। পড়াশোনা থাকলেও বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব তাদের ছোট করে দেখে।’ ফলে তরুণ নেতাদের পক্ষে মানুষের আস্থা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতের মতো পুরোনো দলগুলোর স্থানীয় শিকড় এখনো গভীর। এসব দলের নেতা–কর্মী দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন, খোঁজখবর নেওয়া, বিপদে পাশে থাকা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে। খুলনার এক প্রবীণ ভোটারের ভাষায়, ‘আমরা যাদের চিনি, তাদেরই ভোট দিই। নতুনদের কথা ভালো লাগলেও পরিচয় না থাকলে ভরসা আসে না।’

নতুন দলগুলো শুরুতে দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বড় আশা জাগালেও ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর মাঠে তাদের উপস্থিতি কমে যায়। সংবাদে তারা বেশি এসেছে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও অভিযোগের কারণে। অনেক এলাকায় তারা স্থানীয় মুরব্বি, জনপ্রিয় নেতা বা সমাজপতিদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেনি। সাংগঠনিক দুর্বলতাও স্পষ্ট, স্থায়ী কমিটির অভাব, দায়িত্ব বণ্টনের অস্পষ্টতা এবং মাঠপর্যায়ে বড় কর্মসূচির ঘাটতি রয়েছে। খুলনার এক স্থানীয় সাংবাদিকের ভাষায়, ‘তারা ফেসবুকে খুব সক্রিয়, কিন্তু মাঠে দেখা যায় না। রাজনীতি শুধু পোস্টে নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোতেই।’

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় সংস্কৃতি না বোঝার সমস্যা। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের সামাজিক কাঠামো আলাদা। কিন্তু তরুণ দলগুলো প্রায়ই এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। ফলে ভোটাররা তাদের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না।

পরিবর্তন আনতে হলে তরুণ রাজনৈতিক নেতাদের প্রথমেই মাঠে নামতে হবে, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে, তাদের জীবন ও সমস্যা বুঝতে হবে। স্থানীয় সংস্কৃতি ও সংকটকে গুরুত্ব দিতে হবে, খুলনায় শিল্প বন্ধ হয়ে বেকারত্ব, সাতক্ষীরায় জলবায়ুসংকটের মতো বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার করতে হবে। সংগঠন শক্ত করতে হবে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষের পাশে থাকা, শুধু নির্বাচনের সময় নয়, প্রতিদিনের জীবনে।

রাজনীতি কেবল টেলিভিশনের বিতর্ক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নয়; এটি মানুষের জীবনের অংশ। প্রান্তিক এলাকার মানুষ রাজনীতিকে বিশ্বাস, সম্পর্ক ও কাজের ভিত্তিতে বিচার করে।

তরুণদের রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিই বিকল্প শক্তি হয়ে উঠতে চায়, তবে শহরের আলো ছেড়ে গ্রামের উঠানে, বাজারের চায়ের দোকানে, মানুষের জীবনের ভেতরে যেতে হবে। তখনই তারা ভোটের মাঠে টিকে থাকতে পারবে এবং মানুষের আস্থা অর্জন করে একটি বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে।

তাসলিমা আক্তার জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

*মতামত লেখকের নিজস্ব