রবিউল আউয়ালের দর্শন: নবীপ্রেম ও সুন্নতের অনুসরণ
রবিউল আউয়াল আরবি হিজরি চান্দ্রবর্ষের তৃতীয় মাস। ‘রবি’ অর্থ বসন্ত এবং ‘আউয়াল’ অর্থ প্রথম। তাই রবিউল আউয়াল অর্থ প্রথম বসন্ত। এর পরের মাস রবিউস সানি অর্থ দ্বিতীয় বসন্ত। প্রাচীন আরবে এই দুই মাস মিলিয়ে বসন্তকাল হিসেবে বিবেচিত হতো।
ইসলামের ইতিহাসে রবিউল আউয়াল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাস। কারণ, এই মাসেই পৃথিবীতে আগমন করেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)—মানবতার মুক্তির দূত ও বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত সর্বশেষ নবী।
নবী করিম (সা.)-এর আবির্ভাবের সময় পৃথিবীর অবস্থা ছিল ভয়াবহ। সেই যুগ ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অন্ধকার যুগ নামে পরিচিত। অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অন্যায়, অবিচার, পাপাচার ও নৈতিক অবক্ষয়ে সমাজ ছিল নিমজ্জিত। এমন এক সময়ে তিনি মানুষের সামনে সত্য, ন্যায় ও মুক্তির পথ নিয়ে আসেন।
রবিউল আউয়াল আমাদের সেই মহান শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ মাসে নবীজির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সর্বোত্তম উপায় হলো তাঁর জীবন ও সুন্নত সম্পর্কে জানা এবং তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত সেই জ্যোতি, যাঁর মাধ্যমে মানবজাতি পেয়েছে কোরআনের আলোকিত পথনির্দেশনা। তিনি কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ভূখণ্ডের জন্য প্রেরিত ছিলেন না; তিনি সমগ্র মানবতার নবী। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল ও সর্বশেষ নবী।’ (সুরা-৩৩ আহজাব, আয়াত: ৪০)
মহানবী (সা.) ছিলেন মানুষের সুখ-দুঃখের অকৃত্রিম সঙ্গী ও কল্যাণকামী। মানুষের বিপদ ও কষ্ট তাঁকে ব্যথিত করত। মুমিনদের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল ও দয়ালু।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছেন। তোমাদের কষ্ট তাঁকে কষ্ট দেয়। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও দয়ালু।’ (সুরা-৯ তাওবাহ, আয়াত: ১২৮-১২৯)
কোরআনে প্রিয় রাসুল (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণের গুরুত্বও বারবার তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর সাহাবিরা ছিলেন ইমান, ত্যাগ, ইবাদত, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সহমর্মিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা কেবল আবেগের বিষয় নয়; তাঁর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসার প্রমাণ হলো তাঁর শিক্ষা ও সুন্নত অনুসরণ করা। তাঁর জীবন ছিল মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, বিচার, যুদ্ধ ও শান্তি—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি মানুষের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
মহান আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে বিশ্বাস করে আর উহাই তাদের প্রতিপালক হতে প্রেরিত সত্য, তিনি তাদের মন্দ কর্মগুলো বিদূরিত করবেন এবং তাদের অবস্থা ভালো করবেন।’ (সুরা-৪৭ মুহাম্মদ, আয়াত: ২)
হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বললেন, “হে প্রিয় বৎস! যদি তোমার পক্ষে সম্ভব হয় তবে এভাবে রাতদিন অতিবাহিত করো যেন তোমার অন্তরে কারও প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ না থাকে।” রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে আরও বললেন, “হে প্রিয় বৎস! এটাই আমার সুন্নত। যারা আমার সুন্নাতকে ভালোবাসে, তারা আমাকেই ভালোবাসে আর যারা আমাকে ভালোবাসে এবং তারা জান্নাতে আমার সঙ্গেই থাকবে।”’ (মুসলিম: ২৭২৬)
এই শিক্ষার মধ্যেই রয়েছে রবিউল আউয়ালের প্রকৃত দর্শন। নবীপ্রেমের অর্থ শুধু তাঁকে স্মরণ করা, তাঁর প্রশংসা করা কিংবা বিশেষ অনুষ্ঠানে আবেগ প্রকাশ করা নয়। নবীপ্রেমের প্রকৃত অর্থ হলো তাঁর চরিত্র, নৈতিকতা, দয়া, ক্ষমা, সততা, ন্যায়বোধ ও সুন্নতকে ব্যক্তিজীবনে ধারণ করা।
আজকের সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভাজন, প্রতিহিংসা ও নৈতিক অবক্ষয় যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর শিক্ষা ছিল মানুষের প্রতি দয়া, দুর্বলের প্রতি সহমর্মিতা, শত্রুর প্রতিও ন্যায়বিচার এবং ক্ষমার মহত্ত্ব। তিনি ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমা এবং বিভেদের পরিবর্তে ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দিয়েছেন।
রবিউল আউয়াল আমাদের সেই মহান শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ মাসে নবীজির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সর্বোত্তম উপায় হলো তাঁর জীবন ও সুন্নত সম্পর্কে জানা এবং তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই নবীপ্রেম পূর্ণতা লাভ করতে পারে।
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম